এবার ২০ কোটি টাকা থোক বরাদ্দ এমপিদের

020004022309azb5kv4n.jpg

কালের কন্ঠ অনলাইন :

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী সংসদ সদস্যরা তাঁদের নিজ নিজ এলাকার রাস্তাঘাট, সেতু, কালভার্ট নির্মাণে তাঁদের প্রতিশ্রুত পুরো ২০ কোটি টাকা এখনো না পেলেও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী এমপিদের ২০ কোটি টাকা করে বরাদ্দ দেওয়ার তোড়জোড় শুরু হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের টানা তৃতীয় মেয়াদে এসে সংসদ সদস্যরা তাঁদের নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকার রাস্তাঘাট, সেতু, কালভার্ট নির্মাণে বড় অঙ্কের টাকা পেতে যাচ্ছেন। ৩০০ জনের মধ্যে ২৮০ জন সংসদ সদস্য প্রত্যেকে তাঁদের নির্বাচনী এলাকার অবকাঠামো উন্নয়নে ২০ কোটি টাকা করে পাচ্ছেন। আগামী চার বছরে প্রতিবছর পাঁচ কোটি টাকা করে মোট ২০ কোটি টাকা পাবেন এমপিরা। তবে ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা ও বরিশাল সিটি করপোরেশনের আওতায় ২০টি আসনের এমপিরা এই সুবিধা পাবেন না। সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্যরা এই সুবিধার বাইরে থাকবেন। ‘অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ পল্লী অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প’ (৩) এর আওতায় এমপিরা এই টাকা পাবেন। এর আগে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ প্রথম সরকার গঠনের পর প্রত্যেক এমপি নিজ আসনের অবকাঠামো উন্নয়নে ১৫ কোটি টাকা করে পেয়েছিলেন। আওয়ামী লীগ সরকারের দ্বিতীয় মেয়াদে এমপিদের ২০ কোটি টাকা করে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। যদিও ওই প্রকল্পটি এখনো শেষ হয়নি। আগামী জুনে প্রকল্পটি শেষ হওয়ার কথা। এমনকি প্রকল্পটি যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হয়েছে কি না কিংবা কোনো ত্রুটি ছিল কি না—এসংক্রান্ত কোনো মূল্যায়নই হয়নি। চলমান প্রকল্প শেষ না করে, প্রকল্পের মূল্যায়ন না করে তৃতীয় মেয়াদে এমপিদের ফের ২০ কোটি টাকা করে দেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। যদিও সংসদ সদস্যরা তাঁদের নির্বাচনী এলাকার উন্নয়নে ৩০ কোটি টাকা করে চেয়েছিলেন। কিন্তু স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়েছে, প্রত্যেক এমপির নির্বাচনী আসনে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অনেক প্রকল্প চলমান আছে। তা ছাড়া ১০ বছরে রাস্তাঘাট নির্মাণে অনেক প্রকল্প বাস্তবায়নও হয়েছে। তাই এত টাকা বরাদ্দ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বরাবরই বলে আসছেন—এই প্রকল্পের আওতায় এমপিরা সরাসরি টাকা পাবেন না। এমপিরা শুধু তাঁদের নির্বাচনী আসনে পছন্দ মোতাবেক প্রকল্পের নাম দেবেন। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর।

স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞরা বরাবরই এভাবে এমপিদের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাস্তবায়নের সম্পৃক্ততার কঠোর সমালোচনা করে আসছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এমপিদের কাজ হলো আইন প্রণয়ন করা। উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন নয়। তা ছাড়া সংবিধানের ৬৫ অনুচ্ছেদে বলা আছে, সংসদ সদস্যদের দায়িত্ব আইন প্রণয়ন করা। আবার ৫৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, স্থানীয় উন্নয়ন স্থানীয় সরকারের দায়িত্ব। এমপিরা উন্নয়ন প্রকল্পে তদারকি করলে উপজেলা চেয়ারম্যানদের সঙ্গে এমপিদের চলমান দ্বন্দ্ব আরো বেড়ে যেতে পারে বলেও আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের। সরকারের এই সিদ্ধান্ত দুর্বল উপজেলা পরিষদকে আরো দুর্বল করবে বলেও মত বিশেষজ্ঞদের। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, জনপ্রতিনিধিদের মূল কাজ হলো আইন প্রণয়ন করা। তাঁদের বর্তমান অবস্থানের সঙ্গে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ভূমিকা সাংঘর্ষিক। তা ছাড়া আগের দুইবারের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, ওই দুটি প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। তা ছাড়া যাঁরা প্রভাবশালী তাঁরা ঠিকই তাঁদের টাকা পেয়েছেন। কিন্তু অনেকে তাঁদের টাকা সঠিকভাবে পাননি। ইফতেখারুজ্জামান বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছেন। আগের দুটি প্রকল্পে কী হয়েছিল, সেটি মূল্যায়ন করেই যাতে তৃতীয় দফায় টাকা দেওয়া হয়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। আগের দুটি প্রকল্পের মূল্যায়ন হওয়া উচিত। তারপর তৃতীয় মেয়াদে টাকা বরাদ্দ দেওয়া যেতে পারে।

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তৃতীয় দফায় ছয় হাজার ৯১৮ কোটি টাকা ব্যয়সংবলিত ‘অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ পল্লী অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প’ (৩) শিরোনামের প্রকল্পটি একনেক সভায় অনুমোদনের প্রক্রিয়া করতে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। প্রকল্পটি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, কিছু খাতে অস্বাভাবিক খরচ দেখানো হয়েছে। এই প্রকল্পের আওতায় ৯৬টি কম্পিউটার কেনার প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রতিটি কম্পিউটার কেনা বাবদ খরচ ধরা হয়েছে এক লাখ টাকা। ৯৬টি কম্পিউটার কেনা বাবদ ৯৬ লাখ টাকা রাখা হয়েছে। রাজধানীর আইডিবি ভবনে বর্তমানে প্রতিটি ভালো মানের কম্পিউটারের দাম গড়ে ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে। তা ছাড়া এই প্রকল্পের আওতায় কেন কম্পিউটার কেনার প্রয়োজন হলো তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন। এই প্রকল্পের আওতায় তিনটি জিপ কেনার প্রস্তাব করা হয়েছে। একেকটি জিপের দাম ধরা হয়েছে ৯৮ লাখ টাকা করে। একেকটি ল্যাপটপের দাম ধরা হয়েছে দেড় লাখ টাকা করে। এই প্রকল্পের আওতায় ৭৫টি মোটরসাইকেল কিনতে চায় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। প্রতিটি মোটরসাইকেল কেনা বাবদ খরচ ধরা হয়েছে দুই লাখ ১০ হাজার টাকা। দুটি ফটো কপিয়ারের দাম পাঁচ লাখ টাকা করে ১০ লাখ টাকা প্রস্তাব করেছে। ১২৮টি রোড রোলার কিনতে খরচ ধরা হয়েছে ১১৫ কোটি টাকা। রোড রোলার কিনতে এত টাকা খরচ দেখানো নিয়েও আপত্তি আছে কমিশনের।

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, তৃতীয় দফায় এই প্রকল্পের আওতায় নতুন করে উপজেলা সড়ক নির্মাণ করা হবে ৩০৫ কিলোমিটার। এই ৩০৫ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণে খরচ ধরা হয়েছে ২৯০ কোটি টাকা। ইউনিয়ন সড়ক নির্মাণ করা হবে ৬৬০ কিলোমিটার। এতে খরচ ধরা হয়েছে ৫২৮ কোটি টাকা। গ্রাম সড়ক উন্নয়ন হবে পাঁচ হাজার ২০০ কিলোমিটার। খরচ ধরা হয়েছে চার হাজার ১৬০ কোটি টাকা। গ্রামীণ সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ হবে এক হাজার ৯০ কিলোমিটার। খরচ ধরা হয়েছে ৩৮১ কোটি টাকা। গ্রামীণ সড়কে ১০০ মিটারের নিচের দৈর্ঘ্যের সেতু ও কালভার্ট নির্মাণ করা হবে সাত হাজার ৯৯২ মিটার। আগের দুটি প্রকল্পের সঙ্গে প্রস্তাবিত প্রকল্পের দ্বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন।

গতকাল সন্ধ্যায় কথা হয় পঞ্চগড়ের সংসদ সদস্য মজাহারুল হক প্রধানের সঙ্গে। তিনি বলেন, অনুন্নত এলাকার এমপিরা ৩০ কোটি টাকা করে চেয়েছেন। কিন্তু আমাদের বলা হয়েছে ২০ কোটি টাকা করে দেওয়া হবে।

পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, আগের দুই দফায় নেওয়া প্রকল্পটিতে মাঠ পর্যায়ে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) সরেজমিন প্রতিবেদনেও আগের দুই দফায় প্রকল্পের বেশ অনিয়ম ধরা পড়েছিল। আগের দুই দফার প্রকল্প নিয়ে সংসদে ও সংসদের বাইরে অনেক সমালোচনা ও বিতর্ক হয়েছে। সংসদে অনেক এমপি অভিযোগ করেছেন, পাঁচ বছরে ১৫ কোটি ও ২০ কোটি টাকা পাওয়ার কথা থাকলেও তাঁরা তা পাননি। এ নিয়ে সংসদে সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিতকে অনেকে তুলাধোনা করেছেন। গত পাঁচ বছরে বিরোধী দলের এমপিদের জন্য বরাদ্দ টাকায় সরকারি দলের এমপিরা ভাগ বসিয়েছেন—এমন অভিযোগও উঠেছে। এসব দিক বিবেচনা করে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন করেই তৃতীয় দফায় প্রকল্পটি নেওয়া যেতে পারে বলে জানিয়েছেন কমিশনের একাধিক কর্মকর্তা। তবে এমপিদের যেহেতু চাপ আছে টাকা বরাদ্দের জন্য, তাই হয়তো দ্রুতই প্রস্তাবিত প্রকল্পটি একনেক সভায় অনুমোদন পেয়ে যেতে পারে।