নতুন বছরে প্রকৃতি-পরিবেশ রক্ষাই হোক ব্রত

images-17-5.jpg

সাধন সরকার: অস্ট্রেলিয়ায় ভয়াবহ দাবানল, ইন্দোনেশিয়ায় বন্যা, বিখ্যাত শহরগুলোয় দূষণের ছড়াছড়ি ও ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা বৃদ্ধির মধ্যেই পুরোনোকে পেছনে ফেলে নতুন আরও একটি বছর আমাদের সামনে শুভ বার্তা নিয়ে হাজির হয়েছে। নতুন বছর নতুনভাবে আবির্ভূত হলেও প্রকৃতি ও পরিবেশের সেই পুরোনো সমস্যা রয়েই গেছে। জলবায়ুর নেতিবাচক প্রভাব ঠেকাতে মাত্রাতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণ ধারাবাহিকভাবে কমাতে এখনও একমত হতে পারেনি উন্নত দেশগুলো। ফলে মাদ্রিদের ‘কপ-২৫’ জলবায়ু সম্মেলন ব্যর্থতায় রূপ নিয়েছে! নতুন বছরে প্রত্যেকেরই পরিকল্পনা থাকে নিজেকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার, গত বছর থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার। পেশাগত জীবনে উন্নত করা, চাকরি পাওয়া, বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়া, সন্তানদের মানুষের মতো মানুষ করে তোলার পরিকল্পনাসহ নতুন বছরে কত কিছুরই পরিকল্পনা এসে হাজির হয় প্রত্যেকের জীবনে! কত-শত পরিকল্পনার মধ্যে আমরা আমাদের জীবনে সবচেয়ে প্রভাব বিস্তারকারী প্রকৃতি-পরিবেশের উপাদানগুলো রক্ষার কথা বেমালুম ভুলে যায়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, প্রকৃতি-পরিবেশ ভালো না থাকলে অর্থাৎ বিভিন্ন ধরনের পরিবেশগত দূষণ ও সমস্যা বাড়তে থাকলে, জলবায়ুর বিশৃঙ্খল আচরণে দাবানলসহ বিভিন্ন দুর্যোগ দেখা দিলে তা কোনো না কোনোভাবে মানুষের জীবনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার বদলে পিছিয়ে দেয়! নতুন বছরে যত স্বপ্ন দেখা বা ভালো পরিকল্পনাই করা হোক না কেন, তা আমাদের চারপাশের প্রকৃতি ও পরিবেশ বলয়ের বাইরে নয়! জলবায়ুগত দুর্যোগ উপকূলীয় মানুষের জীবনে ইতিমধ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। মানুষের স্বাভাবিক জীবনকে ওলটপালট করে দিচ্ছে বায়ুদূষণসহ বিভিন্ন ধরনের দূষণ। আচমকা দুর্যোগ ফসলসহ চারপাশের পরিবেশকে বদলে দিচ্ছে। তবুও আমরা কার্বন নিঃসরণ কমানোসহ প্রকৃতি-পরিবেশ রক্ষার প্রতি কেন জানি উদাসীনতার পরিচয় দিয়েই চলেছি।

যতই দিন যাচ্ছে ততই মানুষের তৈরি অবকাঠামো বাড়ছে আর প্রকৃতি-পরিবেশ যেন কমে যাচ্ছে। নদীমাতৃক বাংলাদেশের নদ-নদী আজ অনেকটাই অবহেলিত। একসময় নদীকেন্দ্রিক ছিল এদেশের মানুষের জীবন-জীবিকা। কিন্তু গত তিন দশকে দখল-দূষণ আর ভরাট হয়ে অনেক নদ-নদী হারিয়ে গেছে। অনেক নদ-নদী দখল-দূষণ আর ভরাটের কবলে পড়ে ধুঁকছে। যদিও নদী দখলকারীদের তালিকা এখন সরকারের কাছে রয়েছে। তাই দেশের স্বার্থে নদী দখল-দূষণ আর ভরাটের সঙ্গে জড়িতদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। কেননা নদ-নদী এখন জীবন্ত সত্তা। নদ-নদীগুলো এদেশের সম্পদ, মাটি আর মানুষের সঙ্গে নদ-নদীর রয়েছে নিবিড় সম্পর্ক। নদ-নদী রক্ষা করা না গেলে বাংলাদেশের অস্তিত্ব রক্ষা করা কঠিন হবে। বিশ্বব্যাপী প্লাস্টিক-পলিথিন দূষণ তো আছেই! এখন বিশ্বজুড়ে বায়ুদূষণ আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সতর্ক, সচেতনতা আর পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহার ও আইনের প্রয়োগ বাড়াতে পারলে দূষণ রোধ করা মোটেও কঠিন ব্যাপার নয়। দূষণের দিক দিয়ে শীর্ষ শহরগুলোর মধ্যে ঢাকা শহরের অবস্থান প্রথম দিকে। প্রতিবছর হাজার লোক দূষণে মারা যাচ্ছে। নদী দখলদারদের তালিকার মতো দূষণকারীদের তালিকা প্রকাশ করা এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া সময়ের দাবি বললেও অত্যুক্তি হবে না।

বর্তমান সময়ের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো জলবায়ু পরিবর্তন। দোষারোপ পেছনে ফেলে উন্নত বিশ্বের দেশগুলোকে ‘প্যারিস চুক্তি’র শর্ত মেনে কার্বন নিঃসরণ কমাতে এখনই উদ্যোগ নিতে হবে। একটু একটু করে পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়ার পাশাপাশি জলবায়ুগত দুর্যোগে পৃথিবী বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার সব ধরনের সুযোগ কাজে লাগাতে হবে, তা না হলে মনুষ্যসৃষ্ট দুর্যোগের কাছে মানুষই হেরে যাবে! জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে হবে। বায়ু, পানি ও সৌরশক্তির ব্যবহারে সবাইকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। দূষণ আর সব ধরনের দুর্যোগ মোকাবিলা করে বিশ্বকে বাসযোগ্য করে গড়ে তোলার সবচেয়ে কার্যকর সমাধান হতে পারে বৃক্ষরোপণ। বৃক্ষরোপণের প্রতি সব পর্যায়ের শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করতে পারলে দূষণসহ জলবায়ুগত সমস্যা কিছুটা হলেও মোকাবিলা করা সম্ভব হবে। বৃক্ষসম্পদ সুরক্ষার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় বনজসম্পদ বৃদ্ধিতে শিশু-কিশোর-তরুণরাই সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখতে পারে। সহজ কথায়, বৃক্ষরোপণকে সামাজিক আন্দোলনে রূপ দিতে হবে। মনে রাখতে হবে, প্রকৃতি-পরিবেশের উপাদান যত বেশি কমতে থাকবে ততই বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠবে এই পৃথিবী! এখনকার শিক্ষার্থীরাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। আগামী প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য ও সুন্দর ধরণী রেখে যেতে হলে স্কুল-কলেজসহ সব পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের সচেতনতার পাশাপাশি সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। শিশু ও কিশোর শিক্ষার্থীদের যদি ছোটবেলা থেকেই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, জলাশয় সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তা, বৃক্ষরোপণের মতো বিষয়গুলোর সঙ্গে সম্পৃক্ত করা যায় তাহলে এই কোটি কোটি শিক্ষার্থী ছোটবেলা থেকেই নিজেদের টেকসই ভবিষ্যৎ ও স্বাস্থ্যগত নিরাপত্তা সম্পর্কেও সচেতন হবে। এভাবে ধারাবাহিকভাবে প্রকৃতি-পরিবেশ রক্ষার চর্চা থাকলে শিক্ষার্থীরাই প্রকৃতি-পরিবেশ রক্ষায় উদ্যোগী হবে। প্রকৃতি-পরিবেশপ্রেমী সচেতন নাগরিকদের দ্বারাই আগামী দশ-বারো বছরের মধ্যে দেশটা বদলে যাবে এবং এর ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ বিশ্বে প্রকৃতি-পরিবেশ সংরক্ষণে এবং পরিবেশগত সমস্যা মোকাবিলায় দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে! দরকার শুধু পরিকল্পনা আর কার্যকর উদ্যোগ।

কলাম লেখক

সদস্য, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)

[email protected]