যুক্তরাষ্ট্র যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী, জাতিসংঘে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে রোহিঙ্গা ইস্যু

Rohingha-camp4567890.jpg

যুগান্তর |
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের এবারের অধিবেশনেও রোহিঙ্গা ইস্যু বিশেষ গুরুত্ব পাবে। বিশ্বনেতাদের সামনে বিষয়টি তুলে ধরবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

এ ছাড়াও এই ইস্যুতে চীন ও মিয়ানমারের সঙ্গে ত্রিপক্ষীয় বৈঠক, ভারতের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক এবং মুসলিম দেশগুলোর সংগঠন ওআইসির নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জাতিসংঘ অধিবেশনে যোগ দিতে কাল (শুক্রবার) যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করবেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রীর যোগদান নিয়ে প্রেসব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন বুধবার এসব কথা বলেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত এই প্রেসব্রিফিংয়ে আরও উপস্থিত ছিলেন প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম এবং পররাষ্ট্র সচিব একেএম শহীদুল হক।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কাশ্মীর ও এনআরসি ইস্যুটি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়। এ ছাড়াও মানব পাচারকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানান তিনি।

সোমবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৭৪তম অধিবেশন শুরু হয়েছে। তবে ২৪ থেকে ২৯ সেপ্টেম্বর উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হবে। এই বৈঠকে যোগ দিতে ২২ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে পৌঁছবে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে সরকারের উচ্চপর্যায়ের দল। এই দলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর বিভিন্ন উপদেষ্টা ও ব্যবসায়ীরা রয়েছেন।

ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে এবারের বিতর্কের প্রতিপাদ্য বিষয় হল- ‘দারিদ্র্যবিমোচন, মানসম্মত শিক্ষা, জলবায়ুর ঝুঁকি মোকাবেলা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নে বহুমুখী প্রচেষ্টা’। ফলে কয়েকটি কারণে এই অধিবেশনের আলাদা গুরুত্ব রয়েছে।

তিনি বলেন, এবার সাধারণ অধিবেশনের পাশাপাশি টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি) নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সভা হবে। এখানে এসডিজি বাস্তবায়নে বাংলাদেশের অগ্রগতি তুলে ধরা হবে।

মন্ত্রী বলেন, এবার রোহিঙ্গা ইস্যুটি আলোচনায় আসবে। পৃথিবীর অন্যতম বাস্তুহারা জনগোষ্ঠীর আশ্রয়দাতা হিসেবে বিভিন্ন আলোচনায় বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই ইস্যুতে আগের দুই বছরের অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেয়া প্রস্তাব এখনও প্রাসঙ্গিক। এক্ষেত্রে বিশ্বনেতাদের আগ্রহ, সার্বিক অবস্থান এবং মিয়ানমারের ওপর চাপ বাড়াতে বাংলাদেশের জোরালো অবস্থান নিতে হবে।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করে সরকার গঠনের পর এই অধিবেশনে বিগত বছরগুলোয় অর্জিত বাংলাদেশের সাফল্য, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, গণতন্ত্র ও সুশাসনের ধারা অব্যাহতের বিষয়টি বিশ্ববাসীকে অবহিত করবেন প্রধানমন্ত্রী।

মন্ত্রী বলেন, এবারের অধিবেশনে শীর্ষপর্যায়ের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সভায় সক্রিয়ভাবে প্রধানমন্ত্রী অংশ নেবেন। এর মধ্যে ২৩ সেপ্টেম্বর স্বাস্থ্যবিষয়ক সভায় যোগ দেবেন। এর মূল লক্ষ্য হল- সবার জন্য সুস্বাস্থ্য নিশ্চিতকরণে একটি ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ। এই সভায় স্বাস্থ্য খাতে বাংলাদেশের অর্জন তুলে ধরা হবে। এই আলোচনায় বাংলাদেশ ও স্পেনের প্রধানমন্ত্রী কো-চেয়ার হিসেবে থাকবেন।

এ কে আবদুল মোমেন বলেন, একই দিন জাতিসংঘ মহাসচিবের আমন্ত্রণে জলবায়ু সংক্রান্ত সম্মেলনে অংশ নেবেন শেখ হাসিনা। এখানে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলায় নানা ধরনের পদক্ষেপে বাংলাদেশের নেতৃত্বমূলক ভূমিকার বিষয়টি তুলে ধরা হবে।

টিকাদান কর্মসূচিতে বাংলাদেশের সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবে গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ভ্যাক্সিনেশন অ্যান্ড ইমিউনাইজেশন নামের একটি সংস্থা প্রধানমন্ত্রীকে ভ্যাকসিস হিরো সম্মাননা দেবে। ২৪ সেপ্টেম্বর গ্লোবাল কমিশন অন অ্যাডোপটেশনের আয়োজনে উচ্চপর্যায়ের একটি সাইট ইভেন্টে অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী।

একই দিন ওআইসির আয়োজনে রোহিঙ্গা পরিস্থিতি নিয়ে উচ্চপর্যায়ের সাইট ইভেন্টে যোগ দেবেন শেখ হাসিনা। এই ইভেন্টে রোহিঙ্গাদের দ্রুত ফেরত নিতে মুসলিম দেশগুলোর সহযোগিতা ও করণীয় সম্পর্কে আলোচনা হবে।

একই দিন মহাত্মা গান্ধীর আদর্শের আলোকে বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে বিশ্বের নেতাদের ভূমিকা আলোচনা হবে। এ কে আবদুল মোমেন আরও বলেন, ২৫ সেপ্টেম্বর উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক ফোরামে এসডিজিবিষয়ক সভায় অংশ নেবেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। একই দিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বনামধন্য থিংক ট্যাংক কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্সের আমন্ত্রণে একটি মতবিনিয়ম সভায় অংশ নেবেন।

২৬ সেপ্টেম্বর ইউনিসেফ আয়োজিত সম্মাননা অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন তিনি। সেখানে শেখ হাসিনাকে চ্যাম্পিয়ন অব স্কিল ডেভেলপমেন্ট ফর ইয়থ সম্মাননা দেয়া হবে। একই দিন যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ীদের সর্বোচ্চ ফোরাম ইউএস চেম্বার অব কমার্সের আয়োজনে গোলটেবিল বৈঠকে অংশ নেবেন তিনি। বৈঠকে বাংলাদেশের ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরাও অংশ নেবেন। এ সময় দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা হবে।

২৭ সেপ্টেম্বর প্রতিবন্ধীদের স্বাস্থ্যবিষয়ক আরেকটি কর্মসূচিতে যোগ দেবেন তিনি। ওইদিন মূল অধিবেশন সাধারণ পরিষদের বিতর্ক পর্বে বাংলাদেশের পক্ষে বক্তব্য দেবেন প্রধানমন্ত্রী। প্রতিবারের মতো এবারও বাংলায় বক্তৃতা দেবেন তিনি। বক্তৃতায় বাংলাদেশের সাফল্য, অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন, ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় অগ্রযাত্রা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য এবং নারী উন্নয়নের বিষয়টি তুলে ধরবেন।

এ ছাড়াও তার বক্তব্যে বিশ্বশান্তি, নিরাপদ অভিবাসন, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলা এবং ব্লু-ইকোনমির বিষয়গুলো উঠে আসবে। এছাড়া রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে সুনির্দিষ্ট কয়েকটি প্রস্তাব দেবেন তিনি।

পাশাপাশি রেসিডেন্টস কো-অর্ডিনেশন সিস্টেম পরিচালনে সহায়তার জন্য জাতিসংঘ মহাসচিবের উদ্যোগে গঠিত ট্রাস্ট ফান্ডে ১ লাখ মার্কিন ডলার অনুদান ঘোষণা করবেন শেষ হাসিনা।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এসব সভার পাশাপাশি জাতিসংঘ মহাসচিবের আয়োজনে বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধান ও রাষ্ট্রপ্রধানদের সম্মানে মধ্যাহ্নভোজ এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের অভ্যর্থনায় অংশ নেবেন তিনি।

এ ছাড়াও জাতিসংঘের মহাসচিব, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, গ্লোবাল হোপ কোয়ালিশনের সভাপতি, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের চিফ প্রসিকিউটরসহ বিভিন্ন দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানদের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় অংশ নেবেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী।

অধিবেশন চলাকালে ওয়ালস্ট্রিট জার্নালের ফ্রন্টিয়ার মার্কেট এডিটর ও ওয়াশিংটন পোস্টের ফরেন অ্যাফেয়ার্স বিষয়ক রাইটারকে সাক্ষাৎকার দেবেন তিনি।

ভারতের এনআরসি (জাতীয় নাগরিক নিবন্ধন) ব্যাপারে বাংলাদেশের অবস্থান নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, এটি ভারতের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। তবে বিষয়টি নিয়ে কারও কারও উদ্বেগ রয়েছে। এ ব্যাপারে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ভারতে সফর করবেন। দেশটির সরকারপ্রধানের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বিষয়টি আলোচনা হবে।

আরেক প্রশ্নের জবাবে এ কে আবদুল মোমেন বলেন, কাশ্মীর ইস্যুতে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমাকে ফোন করেছিলেন। আমরা তাদেরকে বাংলাদেশের অবস্থানের ব্যাপারে জানিয়েছি। আমরা পাকিস্তানকে বলেছি, কাশ্মীর নিয়ে ভারতের সংবিধানের যে ৩৭০ আর্টিকেল তৈরি করা হয়েছিল, তখন কেউ আমাদের সঙ্গে আলোচনা করেনি। আবার তারাই এটি বাতিল করেছে। ফলে বিষয়টি তাদের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। তবে বাংলাদেশ সব সময়ই দেশ, সমাজ ও মানুষের উন্নয়ন চায়।

এছাড়া অধিবেশনের সাইডলাইনে ২৬ সেপ্টেম্বর পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ বিষয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের সভায় অংশ নেবেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন। ২০১৭ সালেই পারমাণু নিরস্ত্রীকরণ সংক্রান্ত এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করে বাংলাদেশ। যুক্তরাষ্ট্রের প্রবাসী বাংলাদেশিরা প্রধানমন্ত্রীকে সংবর্ধনা দেবেন, জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী।