মিয়ানমার সীমান্ত চৌকিতে সন্ত্রাসী হামলার দুই বছর : আশ্রয় নেওয়া দেশে অমানবিক আচরণে ক্ষুদ্ধ বাসিন্দারা!!

Ref.jpg

হুমায়ূন রশিদ : সেনা শাসিত প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারে ২০১৭ সালের ২৫ আগষ্ট ২৪টি সীমান্ত চৌকিতে রোহিঙ্গা নামধারী উগ্রপন্থী স্বশস্ত্র সন্ত্রাসীদের হামলার জেরধরে নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হয়ে বাংলাদেশের ৩১টি ক্যাম্পে মানবিক আশ্রয় নেওয়ার ১১লক্ষাধিক রোহিঙ্গা নাগরিকদের দুই বছর পূর্ণ হয়েছে। এরা যেদেশে মানবিক আশ্রয় নিয়েছে এখন সেদেশের কিছু চিহ্নিত অপরাধীদের সংগঠিত করে পুরো পাহাড়ী জনপদে সন্ত্রাসী, ডাকাত, অপহরণ ও মুক্তিপণ এবং মাদক চোরাচালানের নিরাপদ আস্তানা বানিয়ে স্থানীয় জনসাধারণের প্রতি অমানবিক আচরণ শুরু করেছে। যার ফলে স্থানীয় বাসিন্দারা রোহিঙ্গাদের কৃতকর্মে ক্রমশ ফুঁসে উঠছে।
২০১৭ সালের ২৫আগষ্ট রাতের প্রথম প্রহরে মিয়ানমারের উত্তর-পশ্চিম রাজ্যের পাহাড়ের পূর্ব পাশে রাশিদং রাজারবিল, বড়ছড়া, আন্দাম, ধুপমাইল, কুল্লুং, শীতাইক্যা, মন্ডুর মেরুল্লা, হাসছুরাতা, বাগঘোনা, তালাসখ, রাবাইল্যা, ঝিমংখালী, কুয়াংছিপং, তুমব্রæ, ক্যাংবং, বুচিদংস্থ টংবাজার, মিংনিশি, পীরখালী, মগডিল, বলী বাজার, ফৈরা বাজার, কুয়ারবিল, মন্ডুর হাইন্ডার পাড়াসহ ২৪টি এলাকার সীমান্ত চৌকিতে রোহিঙ্গা উগ্রপন্থী সংগঠন “ আরসার ” ব্যানারে স্বশস্ত্র সন্ত্রাসীরা হামলা চালালে সীমান্ত ও নিরাপত্তা বাহিনীর অনেক সদস্য নিহত হয়। মিয়ানমারে এই সংঘাতের জেরধরে উখিয়া-টেকনাফ উপজেলার বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে দফায় দফায় হাজার হাজার নারী, পুরুষ ও শিশু বাংলাদেশ সীমান্তে অনুপ্রবেশ করে মানবিক আশ্রয় নেয়। যার পরিসংখ্যান ৩১টি শরণার্থী ক্যাম্পে ১১ লক্ষাধিক।
উল্লেখ্য,২০১৬ সালের ৯অক্টোবর মিয়ানমারের সীমান্ত চৌকিতে সন্ত্রাসী হামলায় সেদেশের কয়েকজন পুলিশ নিহত হওয়ার পর হতে রোহিঙ্গাদের উপর নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে যায়। এরই জেরধরে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঘটে।
রোহিঙ্গাদের ধর্মের দোহাই দিয়ে আলাদা রাষ্ট্র গঠন এবং বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার লোভ দেখিয়ে উগ্রপন্থী সংগঠনের নেতারা আরাম-আয়েশীতে মগ্ন থেকে নিজেদের আখের গোছালেও সাধারণ রোহিঙ্গাদের ভাগ্য,জীবনমান উন্নয়ন ঘটেনি। বরং বড় রোহিঙ্গা নেতারা বিদেশে অবস্থান করলেও আরএসও, আরসা, আল ইয়াকিনসহ বিভিন্ন সংগঠনের নামে পেশাদার সন্ত্রাসী, মাদক ব্যবসায়ী, আন্তর্জাতিক হুন্ডি ব্যবসায়ী মিলে কতিপয় এনজিও কর্মকর্তাদের বশে নিয়ে সাধারণ রোহিঙ্গাদের জিম্মি করে বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত করেছে। যাদের অস্ত্রবাজি,খুন-খারাবী আর কঠোর নিয়ন্ত্রণে সাধারণ রোহিঙ্গারা অসহায়। এসব সাধারণ রোহিঙ্গারা স্বেচ্ছায় নিজ মাতৃভূমিতে ফিরতে উদগ্রীব হলেও উগ্রপন্থী সংগঠনের স্বশস্ত্র সন্ত্রাসীদের কাছে তারা নিরুপায়। যার ফলে বাংলাদেশ সরকার তাদের স্বদেশে ফেরত পাঠানোর যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করলেও কতিপয় আন্তর্জাতিক এনজিও এবং রোহিঙ্গা উগ্রপন্থী নেতাদের রোহিঙ্গা বাণিজ্য বন্ধ হওয়ার ভয়ে তাদের স্বদেশ প্রত্যাবাসন ব্যাহত করে আসছে।
এদিকে রোহিঙ্গাদের মানবিক সেবা দেওয়ার জন্য আন্তর্জাতিক সংস্থা, বাংলাদেশ সরকার এবং বিশ^ নেতাদের মানবিক সেবার সুযোগে উগ্রপন্থী সংগঠনের নেতারা সুকৌশলে সংগঠিত হয়ে পাশর্^বর্তী পাহাড়ে অবস্থান নিয়ে আস্তানা তৈরী করে। এরা এতই সুকৌশলে সাংগঠনিক বৈঠক এবং অস্ত্র প্রশিক্ষণ নিতো যে, রোহিঙ্গা ক্যাম্প পার হয়ে প্রশাসনের কোন ব্যক্তি বা স্থানীয় লোক তাদের গতিবিধি সন্দেহ করলে ঐ ক্যাম্পের লোকজনকে ধরে নিয়ে সাইজ করে মৃত্যুর দুয়ারে নিয়ে যায়। তুই কি মরবী না আমাদের খবর দিবি বল? পরে অপহৃত রোহিঙ্গা নিজের জীবন রক্ষা এবং স্ত্রী, সন্তান ও পরিজনের কথা ভেবে উগ্রপন্থী সংগঠনের নেতাদের কথা মেনে চলতে বাধ্য হয়।
এই সুযোগে বিদেশী থাকা রোহিঙ্গা নেতা, বাংলাদেশে থাকা কথিত রোহিঙ্গা প্রেমীরা সাগরপথে মাছধরার ট্রলারে করে সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, খুলনা, মহেশখালীসহ বিভিন্ন অঞ্চল হতে ভারী অস্ত্রের চালান সংগ্রহ করে সাগরে মাছ শিকারে যাওয়া রোহিঙ্গাদের মাধ্যমে কিনারায় নিয়ে আসে। পরে এসব মাছ শিকারী ট্রলার সমুহ উখিয়া-টেকনাফের বঙ্গোপসাগর উপকূলে এনে মেরামতের নামে অস্ত্রের চালান পৌঁছে দেওয়ার অপেক্ষায় থাকে। এরা যে এলাকা দিয়ে অন্ত্রের চালান খালাস করবে সেই এলাকার ১০/১৫ কিঃ মিটার দূরে ডাকাত দল হানা দিচ্ছে বলে গুজব ছড়িয়ে প্রশাসন এবং জনসাধারণকে ঐদিকে ব্যস্থ রেখে অস্ত্রের চালান খালাস করে পাহাড়ে নিয়ে যায়। আর শালবন, নয়াপাড়া, রঙ্গিখালীর পশ্চিমে গহীন পাহাড়ে মহেশখালী থেকে অস্ত্র তৈরীর কারিগর এতে দেশীয় অস্ত্র তৈরীর মুখরোচক খবর দীর্ঘদিনের। বিভিন্ন ক্যাম্পে এই সংগঠন সমুহের নেতৃত্ব আর মাদক বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মতবিরোধ হলে গোলাগুলি, খুন, অপহরণ, মুক্তিপণ, ভাড়াটে খুনীসহ বিভিন্ন অপকর্মের খবর বিগত দুই বছরে উখিয়া-টেকনাফবাসীসহ পুরো বিশ^বাসী অবগত রয়েছেন।
জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ১৯৭১ সালে দুই লক্ষাধিক মা-বোনের ইজ্জত আর অসংখ্য শহীদের বিনিময়ে এই সোনার বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। এদেশের মানুষ সুশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে দেশ ও জাতির সেবা করার জন্য। কিন্তু রোহিঙ্গাদের মাদকের চালানে আর কোন যুব সমাজ নষ্ট যেন না হয় আর কোন বাংলাদেশী যেন তাদের খেলনার পুতুল হয়ে মা-বাবার বুক খালী করে পৃথিবী ছেড়ে চলে না যায়। আর উখিয়া-টেকনাফের পাহাড় হতে সব সন্ত্রাসের আস্তানা চিহ্নিত করে বিশেষ কমান্ডো অভিযানের মাধ্যমে নিশ্চিহ্ন করে হোক এটাই সরকারের উর্ধ্বতন মহলে স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবী।
সম্প্রতি চলতি বছরে উখিয়া-টেকনাফের শরণার্থী ক্যাম্প নিয়ন্ত্রণ রেখা পার হয়ে অপরাধে সম্পৃক্ত রোহিঙ্গারা ক্যাম্প সংলগ্ন এলাকার স্থানীয় জনসাধারণকে অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়, মাদক চোরাচালান নিয়ন্ত্রণ, কথায় কথায় অবৈধ অস্ত্র দিয়ে মানুষের প্রাণহানিসহ নানাবিধ অমানবিক আচরণ করে অমানবিক হয়ে উঠছে। এতে স্থানীয় জনসাধারণ ক্রমশ ফুঁসে উঠায় বিশাল রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে অদূর ভবিষ্যতে বড় ধরনের সংঘাত আসন্ন বলে সচেতন মহল শংকায় রয়েছে।
তাই ধূর্ত, অকৃতজ্ঞ এবং মোনাফেক এই রোহিঙ্গা জাতিকে অবিলম্বে মিয়ানমারে যেকোন মূল্যে প্রত্যাবাসন করা হোক। অন্যথায় নির্দিষ্ট স্থানে তাদের আবদ্ধ করে রাখা হোক এটাই এখন ভূক্তভোগী কক্সবাজারবাসীর প্রাণের দাবী।