নয়া জমানার হেয়ার স্টাইল

ssss.jpg

সাইফুল ইসলামঃ অজপাড়াগাঁয়ের ছেলে আনিস (ছদ্মনাম) । বয়স বারো অথবা তেরো হবে। পঞ্চম শ্রেণি পড়ুয়া ছাত্র। বাবা দরিদ্র কৃষক পেঠান আলী (ছদ্মনাম) । মা সাইরা বানু গৃহিণী। পরিবারে সাতজন সদস্য। আনিসরা দুই ভাই ও তিন বোন। আনিসের অবস্থান চতুর্থ। ঈদ উল আযহা উপলক্ষে আনিসদের স্কুল আট দিন বন্ধ থাকবে। এই সুযোগে দরিদ্র বাবাকে সহযোগিতা করার কথা। কিন্তু আনিস বাবাকে সহযোগিতা করা তো দুরের কথা উল্টো গ্রামের কিছু বখাটে ছেলেদের খপ্পরে পড়ে সারাদিন মোবাইলে লুডু খেলা ও বিভিন্ন গেমস খেলায় মহা ব্যস্ত থাকে। বন্ধের আগের দিন স্কুল থেকে এসে ব্যাগ যে মাচায় রেখেছে সেটা সে অবস্থায় পড়ে আছে। ব্যাগ খোলার সময় তার নাই। এর মাঝে সোমবার ঈদ উল আযহা। চুল কাঁটতে হবে। নতুন কাপড় কিনতে হবে। আনিস যথারীতি বাবার কাছে গেল চুল কাঁটা ও নতুন কাপড় কেনার টাকার জন্য। দরিদ্র বাবা চুল কাঁটার জন্য টাকা দিতে রাজি হলেও কাপড় কেনার জন্য টাকা দিতে পারলেন না। অগত্যা আনিস বাবা থেকে চুল কাঁটার জন্য একশত টাকা চাইল। তবে বাবা চুল কাঁটার জন্য একশত টাকা দিতে রাজি হলেন না। পরে ছেলের চোখের জল দেখে দরিদ্র বাবা না করতে পারলেন না। আনিস বাবার কাছ থেকে টাকা নিয়ে যথারীতি সেলুনে গেল। সেলুনে ভিষণ জ্যাম। কারণ ঈদে সেলুনে শীল সম্প্রদায়ের নাপিতগুলো ব্যস্ততার মধ্য দিয়ে সময় কাটায়। চুল কাঁটতে সিরিয়াল নিতে হয়। আনিসও সিরিয়াল নিয়ে লাইনে দাঁড়ানোর পর তার সুযোগ আসল। এবার আনিস চুল কাঁটার জন্য সিটে বসল। আনিসকে নাপিত একটি বই দিয়ে বলল,কোন স্টাইলের চুল কাঁটবে বল। পাড়ার কিছু বখাটে ছেলেদের মতো চুল কাঁটার একটি স্টাইল আনিস বইয়ে খুঁজে পেল এবং সে স্টাইলে চুল কাঁটতে নাপিতকে বলল। যথারীতি চুল কাঁটা শেষে নাপিত আনিস থেকে দুইশত টাকা চাইল। আনিস নাপিতকে জিজ্ঞেস করল,এত টাকা কেন? নাপিত বলল,যেহেতু ঈদ সেজন্য আমাদেরকে একটু খুশি করে দিতে হয়। আনিস বলল,আমার কাছে দুইশত টাকা নাই।একশত টাকা আছে। আমি তা দিতে পারব যে। নাপিত আনিসকে বলল,আগে জানলে তোমার চুল কাঁটতাম না। ধমক দিয়ে বলল,দাও একশত টাকা হলে একশত টাকা। চুল কেঁটে আনিস বাসায় গেল। বাবা আনিসকে দেখে বলল,এটা কোন ধরনের চুল কাঁটা। তখন আনিস বলল,এটা নয়া জমানার চুল কাঁটা বাবা । আরো বলল,পাড়ার সকল ছেলেরা ও স্কুলের আমাদের বন্ধুরা অনেকে এখন এই ধরনের চুল কাঁটে। বাবা আনিসকে বলল,এভাবে চুল কেঁটে স্কুল গেলে স্যারেরা তোমাদেরকে বকা দেবে না। আনিস বলল,না দেবেনা। কারণ স্যাররাও এখন অনেক আধুনিক। ছেলের কথা শুনে আনিসের বাবা মনে মনে বড় দুঃখ পেলেন। আনিসকে বলল,এভাবে আর চুল কাঁটবি না। আর আমি চুল কাঁটার জন্য তোমাকে একশত টাকা দিতে পারব না। পঞ্চাশ টাকা দিতে পারব। না হয় আমার সাথে চুল কাঁটতে যাবি। আনিসদের পাশের বাড়িতে এক শিক্ষক থাকেন। ঈদের নামাজ শেষে আনিসের বাবার সাথে সে শিক্ষকের দেখা হল। আনিসের বাবা সেই শিক্ষককে সালাম দিলেন ও কোলাকুলিও করলেন। শিক্ষককে বললেন,স্যার আপনার সাথে একটা কথা আছে। শিক্ষক বললেন,কী কথা আছে বলেন? আনিসের বাবা পেঠান আলী বললেন,আপনাদের স্কুলে ছেলে মেয়েদের শারীরিক বিষয় ও নীতি নৈতিকতার উপর শিক্ষা দেওয়া হয় না। তিনি আরো বললেন, চুল কাঁটা, নখ কাঁটা,দাঁত মাজা,বড়দের সম্মান করা, সালাম দেওয়া ইত্যাদি বিষয় নিয়ে। শিক্ষক বললেন, কেন হবে না? সব বিষয়ে শিক্ষা ও নৈতিকতার শিক্ষা দেওয়া হয়। আনিসের বাবা প্রতি উত্তরে বলে উঠলেন, তাহলে আমার ছেলে কেন বিকৃতভাবে চুল কাঁটল? আমি দরিদ্র মানুষ। আমার সবকিছু দেখার সময় হয় না। আমি আমার ছেলেকে স্কুলে পাঠাই শুধু বই পড়ার জন্য নয়,নীতি নৈতিকতা শিখার জন্যও পাঠাই। আপনারা যদি একটু আন্তরিক হোন তাহলে আমাদের ছেলে মেয়েরা অপসংস্কৃতির চর্চা থেকে দূরে থাকবে। স্যার মনে কিছু আনবেন না। আপনারা আমাদের আলো ও সঠিক পথের দিশারী। আপনারা চাইলে পুরো সমাজকে বদলিয়ে দিতে পারেন। স্কুল যখন খোলবে তখন পারলে স্যার স্কুলে বিকৃত চুল কাঁটা নিয়ে দৈনিক সমাবেশে একটু আলোকপাত করবেন। আসি স্যার। এ বলে আনিসের বাবা পেঠান আলী চলে গেলেন। আনিসের শিক্ষকও ভাবুক ভাবুক মনে বাড়ির পথে পা বাড়ালেন।

লেখক- সাইফুল ইসলাম।