ইয়াবা-প্রলয় ঠেকাতে যা করা প্রয়োজন

yaba-tt_18.jpg

লে. কর্নেল মো. সাইফুল ইসলাম :

‘ইয়াবা’ (Yaba) একটি থাই শব্দ, যার অর্থ হচ্ছে Crayy Medicine. এটা মিথামফেটামিনের (Methamphatamine) একটি শক্তিশালী Stimulate, অর্থাৎ এটা একটি শক্তিশালী উদ্দীপক।

শুরুর দিকে এটা শুধু মানবদেহেরই উদ্দীপক ছিল বটে; কিন্তু ইয়াবা এখন সমাজ, রাষ্ট্র ছাড়িয়ে উপমহাদেশের একটি খারাপ উদ্দীপক হিসেবে কাজ করছে। বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এর প্রভাব ভাবার বিষয়।

অন্যদিকে বাংলাদেশের জন্য এটা মহাপ্রলয়ের চেয়ে কোনো অংশেই কম নয়। একটি মহাপ্রলয় আসে এবং ধ্বংসযজ্ঞ করে চলে যায়; মানুষ পরে ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে জনপদকে আবার মুখরিত করে তোলে। কিন্তু ইয়াবার মহাপ্রলয় যেন থামার নয়। এটা ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রকে প্রতিনিয়তই ধ্বংস করে যাচ্ছে। মহাপ্রলয়ের মাধ্যমে সমাজের অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে যায়; প্রাণহানি ঘটে, মানুষ আহত হয় আর ইয়াবার মহাপ্রলয়ে ব্যক্তি নিঃশেষ হয়ে ধীরে ধীরে মৃত্যুর মুখে পতিত হয়। পরিবার-পরিজনের হৃদয়ে ক্ষত সৃষ্টি করে এবং পরিবারটি সমাজের কাছে হেয় প্রতিপন্ন হয়।

সমাজে নানাবিধ অপরাধের সৃষ্টি হয় এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। নেশায় বুঁদ হওয়া বিশাল জনগোষ্ঠী নিয়ে রাষ্ট্র বিপাকে পড়ে এবং এক অনিশ্চয়তার দিকে এগোতে থাকে।

সম্প্রতি মাদকের বিরুদ্ধে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জিরো টলারেন্সের ঘোষণা দিয়েছেন। আর এই ইয়াবা হল মাদকের এক বিশাল অংশ, যা মূলত প্রতিবেশী রাষ্ট্র মিয়ানমার থেকে পাচার হয়ে আমাদের দেশে আসে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ইয়াবার বিরুদ্ধে আগের তুলনায় অনেক বেশি সোচ্চারও বটে। ইয়াবা নিয়ে লেখার আগ্রহটা তৈরি হয়েছে পত্রিকার একটি সংবাদ পড়ার পর। সংবাদটি ছিল এরকম- ‘বন্দুকযুদ্ধেও থামছে না ইয়াবা পাচার।’

অদ্ভুত ও কিছুটা হতাশার বার্তা বহন করে এ সংবাদ। অর্থাৎ মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও আমাদের সমাজের কিছু মানুষ এ ব্যবসা থেকে পিছ পা হচ্ছে না। সত্যি অবাক করা কাণ্ড! অন্যদিকে বাবা-মা, পরিবার-পরিজনের কাছে এটি একটি আতঙ্কের বার্তা- তাহলে আমাদের ছেলেমেয়েরা কতটা নিরাপদ এই ইয়াবা থেকে?

বাঙালি জাতির বহু সাফল্য রয়েছে। আমরা জাতি হিসেবে অনেক সাহসী। আমাদের সংস্কৃতি অনেক সমৃদ্ধ। আমাদের মূল্যবোধ, স্বকীয়তা, বীরত্বের খ্যাতি বিশ্বজোড়া; তাহলে কেন আমরা পারব না ইয়াবার গ্রাস থেকে দেশের জনগণ, সমাজ, সর্বোপরি রাষ্ট্রকে বাঁচাতে।

উল্লিখিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ইয়াবা ব্যবসায়ীর বাড়ি জব্দ করার প্রয়াস চালাচ্ছে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তাদের এ উদ্যোগকে স্বাগত জানাই। সঙ্গে সঙ্গে আমরা আরও অনেক পদক্ষেপের প্রত্যাশাও করি। শুনেছি, ইয়াবা নৌকায় করে নদী-খাল পার হয়ে আমাদের দেশে ঢোকে। আমরা সীমান্তে নৌকার বিকল্প দেখতে চাই, প্রয়োজনে নৌকার ওপর নির্ভরশীল স্বল্পসংখ্যক পরিবারের জীবন-জীবিকার পরিবর্তন ঘটাতে চাই। দেশ বঁাঁচাতে স্বল্পসংখ্যক মানুষের জীবন-জীবিকার পরিবর্তন ঘটানোটা সময়েরই দাবি; এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।

দেশের বৃহত্তর স্বার্থে ইলিশ ধরা বন্ধ করতে সরকার যদি জেলেদের চাল দিতে পারে, অর্থ দিতে পারে, দেশের মানুষের জন্য সুস্বাদু মাছ সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারে; তবে অবশ্যই সরকার সীমান্তে এসব নৌকার ওপর নির্ভরশীল গুটিকয়েক মানুষের জীবিকার বিকল্পও ভেবে দেখতে পারে। সীমান্তে জনগণের চলাচলের জন্য বিশেষ নৌকার ব্যবস্থা করা যেতে পারে ও অন্যান্য নৌকা চলাচল বন্ধ করা যেতে পারে। পাশাপাশি নদী-খাল দিয়ে চলাচলের একটা নির্দিষ্ট সময়সীমাও দেয়া যেতে পারে। নৌকা চলাচলের এ পদক্ষেপ স্বল্প বা দীর্ঘ সময়ের জন্য হতে পারে।

ইয়াবা চোরাচালানের কম-বেশি মাত্রার ওপর নির্ভর করে এ অঞ্চলের নৌকা চলাচলে আরোপিত নিষেধাজ্ঞা দীর্ঘ বা স্বল্পমেয়াদের হবে কি না, তা নির্ধারণ করা যেতে পারে। ১ লাখ ৪৭ হাজার ৫৭০ বর্গকিলোমিটার জনপদকে নিশ্চিত ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষার জন্য কয়েকশ’ বর্গকিলোমিটারের অল্প কিছু মানুষের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য কিছুটা কম থাকলেও চলবে এবং এতে ওই এলাকার জনগণ স্বাচ্ছন্দ্যই বোধ করবে বলে আমার মনে হয়।

লোকমুখে শুনেছিলাম, টেকনাফের ১৫ বছর আগের স্যাটেলাইটের ছবিতে গ্রামগুলোয় যে পরিমাণ দালানকোঠা ছিল; তার সংখ্যা নাকি এখন ১০ গুণ বা তার চেয়েও বেশি। তাহলে প্রশ্ন হল, টেকনাফবাসী এমন কি আলাদিনের চেরাগ পেল, যে মাত্র ১৫ বছরে নিজেদের গ্রামে বড় বড় ইমারত বানিয়ে ফেলল?

কর্তৃপক্ষের উচিত, টেকনাফের ইমারতসহ আলিশান বাড়িগুলোর খোঁজ-খবর নেয়া। শুধু তাই নয়, টেকনাফের বাইরে অন্য শহরেও যদি তাদের (ইয়াবা ব্যবসায়ী) সম্পদ থাকে, তার হিসাব নেয়াও জরুরি। ইয়াবা ব্যবসায়ীদের নিজ পরিবারের সদস্যদের নামে-বেনামে পরিচালিত সব ধরনের ব্যাংক হিসাবের অনুসন্ধান হওয়া প্রয়োজন এবং অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসা সব ধরনের ব্যাংক হিসাব জব্দ করাও এখন সময়ের দাবি।

ইয়াবার টাকায় তৈরি বাড়ি জব্দ ও বাড়ির সামনে বড় বড় সাইনবোর্ডে ‘ইয়াবা বাড়ি জব্দ’, ‘ইয়াবার টাকায় তৈরি বাড়ি জব্দ’ অথবা এরকম বিশেষণ যোগ করা যেতে পারে। অনেকেই হয়তো ভাববেন, একটু বেশি বাড়াবাড়ি হয়ে গেল না? আমার দৃষ্টিতে যারা দেশের যুবসমাজকে ধ্বংস করে আলিশান বাড়ি বানায়, সে বাড়ির সামনে শুধু সামান্য সাইনবোর্ড নয়; সেটা ধুলার সঙ্গে মিশে গেলেও বাংলাদেশের জনগণ কিছু মনে করবে না।

অনুমতি না নিয়ে বাড়ি বানানো যদি আইন অমান্য করার অপরাধে ভাঙা যায়; তবে মরণ নেশা ইয়াবা, সমাজ ধ্বংসের ইয়াবা, পরিবার ধ্বংসের ইয়াবা বিক্রির টাকায় নির্মিত বাড়ি ধুলায় মিশিয়ে দেয়াটাই তো যৌক্তিক।

আমরা দেশের আর একজন টগবগে যুবককেও হারাতে চাই না। ইয়াবার কারণে আমরা কোনো সুখী পরিবারকে দুঃখী ও নিঃস্ব হতে দেখতে চাই না। ইয়াবার কারণে আমরা আমাদের সমাজ ধ্বংস হয়ে যাক, তা চাই না। আমরা রাষ্ট্রের পাশে থাকতে চাই, মাদকের বিরুদ্ধে প্রচলিত সব অভিযানের পাশে থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মনোবল বাড়াতে চাই। টেকনাফকে আমরা মাদকের জনপদ নয়; সুখ-শান্তির জনপদ হিসেবে দেখতে চাই।

এটা আজ স্পষ্ট করার সময় এসেছে- আমরা আর মিথামফেটামিন ও ক্যাফিনের মিক্সারের মধ্যে আবদ্ধ থাকতে চাই না। শুনেছি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে খুবই নগণ্য সংখ্যক হলেও কেউ কেউ ইয়াবা সেবন ও বিক্রির সঙ্গে জড়িত; তাই টেকনাফে নিয়োজিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের প্রতি ৩ মাসে একবার করে মাদকাসক্ত কি না, তা নিরূপণ করা জরুরি।

এ ছাড়াও এ বাহিনীর যেসব সদস্য ইয়াবা বেচাকেনার সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত থাকবে, তাদের অবশ্যই দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। এ ধরনের সংবাদ প্রচার মাধ্যমে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করার দাবি করছি। ইয়াবার ক্ষতিকর দিকগুলো অবশ্যই টিভি চ্যানেলগুলোতে গুরুত্বসহকারে প্রচার করা প্রয়োজন। ইয়াবা নেশাগ্রস্তদের সাক্ষাৎকার নিয়েও তা প্রচার করা যেতে পারে; এতে দেশের সব বয়সের নারী-পুরুষ ইয়াবার ক্ষতিকর দিকগুলো ভালোভাবে বুঝতে পারবেন এবং ইয়াবা থেকে সজাগ থাকবেন।

বলার অপেক্ষা রাখে না, ইয়াবা থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে রাষ্ট্র, সমাজ, পরিবার সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। পরিবারের সব সদস্যের মধ্যে একটা ভালো বোঝাপড়া ও সঙ্গতি থাকা খুব জরুরি। এগুলো মাদককে দূরে রাখতে সাহায্য করে। সন্তান কার সঙ্গে মেশে, সারা দিন কোথায় সময় কাটায়- একবার ভেবে দেখুন ও খোঁজ নিন। সারা দিনে অন্তত একবার পরিবারের সবার সঙ্গে খাবার খেতে বসুন, খাবার খান।

একে অন্যের সঙ্গে নিবিড়ভাবে মিশুন, সন্তানসহ পরিবারের সবার কথা শুনুন। পরিবারের সদস্যদের সময় দিন, না হলে হয়তো বা মাদক/ইয়াবা আপনার পরিবারের সদস্যদের সময় দেবে- যা মোটেই সুখকর নয়। সন্তানদের জন্য সুস্থ বিনোদনের ব্যবস্থা করুন আর অসুস্থ বিনোদন থেকে সন্তানদের দূরে রাখুন। পরিবারে ধর্মীয় অনুশাসন নিজে মেনে চলুন ও অন্যদের তা অনুসরণ করতে উৎসাহিত করুন।

ধর্মীয় অনুশাসন আমাদের মাদক থেকে বিরত রাখতে এক বিরাট ভূমিকা রাখে। এখনও সমাজের অধিকাংশ মানুষ ভালো ও সুস্থ বিনোদনের আশা করে। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বাঙালি সংস্কৃতির লালন-পালন ও ধারণ করুন। আমাদের এ ঐতিহ্য মাদককে ‘না’ বলতে শেখাবে।

সমাজ থেকে ইয়াবা নির্মূল করতে হলে জনসচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। ইয়াবার আস্তানাগুলো কোথায়, তা কারও অজানা নয়। তাই ইয়াবাকে রুখতে, মাদককে রুখতে জনগণ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সম্পৃক্ত করা খুবই জরুরি। সম্পৃক্তকরণের কাজটা কীভাবে করা যাবে এবং কতটা দৃঢ় ও কার্যকরভাবে করা যাবে, তা নীতিনির্ধারকরাই ঠিক করবেন।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সব সফলতাকে জোরালোভাবে উপস্থাপনের জন্য সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতি অনুরোধ রইল; আর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি অনুরোধ রইল- যেসব সাহসী সংবাদকর্মী-সাংবাদিক ইয়াবার তথ্য-উপাত্ত অনুসন্ধান করে জনগণকে সচেতন করেন, ইয়াবার বিস্তার রোধে দেশ ও জাতিকে সাহায্য করেন; তাদের নিরাপত্তা দিন। দেখবেন, ইয়াবা নিয়ন্ত্রণ সহজ হয়ে গেছে। আসুন, মাদকের বিরুদ্ধে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত জিরো টলারেন্সে সবাই যোগদান করি।

মো. সাইফুল ইসলাম : লে. কর্নেল, সেনা সদর, কিউএমজির শাখা (এসটি পরিদফতর)