টেকনাফের বাজারে এখনো প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে মানহীন সেই মোল্লা লবণ, নিষিদ্ধ ৫২ পণ্য গোপনে বিক্রির অভিযোগ ভোক্তাদের

60892424_2361877417396028_2666255451850539008_n.jpg

সোমবার জীপ স্টেশন মোড়ের একটি দোকানে প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছিল মোল্লা লবণ

আহমদ শফি/সামী জাবেদ :
টেকনাফ পৌরসভা বাজারের কিছু কিছু দোকানে এখনও প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে মানহীন মোল্লা সল্ট। ভোক্তাদের অভিযোগ মোল্লা সল্ট প্রকাশ্যে বিক্রি হলেও অন্যান্য নিষিদ্ধ ৫২ পণ্যের অনেকগুলো অচেতন ক্রেতাদের অজ্ঞাতে ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে ।

এ থেকে বুঝা যাচ্ছে যে শনিবারের (১৮ মে) মধ্যে পণ্যগুলো প্রত্যাহার করার বিষয়ে হাইকোর্টের নির্দেশনা থাকলেও উৎপাদক প্রতিষ্ঠানগুলো তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করেনি।

গত ১২ মে নিম্নমানের এসব পণ্য বাজার থেকে জব্দ করে ধ্বংস করতে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ও জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে নিদের্শ দিয়েছিল হাইকোর্ট। বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) এ পর্যন্ত ৫২টি পণ্যের মধ্যে ৯টির লাইসেন্স বাতিল করেছে।

এদিকে হাইকোর্টের রায়ের সময়সীমা পার হলেও টেকনাফ বাজারের কোন কোন দোকানে এখন পর্যন্ত
সেসব পন্য বিক্রির অভিযোগ পাওয়া গেছে। এব্যাপারে উপজেলা প্রশাসনের তেমন কোনো কার্যকর ব্যবস্থা চোখে পড়েনি বলে জানিয়েছেন ভোক্তারা।

তবে হাইকোর্টের রায়ের পর অনেক ভোক্তা সচেতনও হয়েছেন। অনেকে বাজার করতে গিয়ে সঙ্গে নিয়ে গেছেন বিক্রি নিষিদ্ধ মানহীন সেই ৫২ পণ্যের তালিকা।

সোমবার ও মঙ্গলবার রাতে সরেজমিনে দেখা যায়, টেকনাফ উপরের বাজারের কয়েকটি দোকানে এসব নিষিদ্ধ পণ্যের মধ্যে মোল্লা সুপার সল্ট সহ বেশ কয়েকটি পণ্য বিক্রি হচ্ছে।

তবে অধিকাংশ দোকানে এসব পণ্য দোকানের সামনে রেখে বিক্রি করতে দেখা যায়নি। অভিযোগ পাওয়া গেছে দোকানের পেছনে রেখে বিক্রি করছেন বিক্রেতারা।

টেকনাফ বার্মিজ মার্কেটের একটি মুদি দোকানে মঙ্গলবার রাতে বিক্রি হচ্ছিল মোল্লা সল্ট নামের সেই লবণ। দোকানীর সাথে কথা বলে জানা গেছে, কোম্পানীর বিক্রয় প্রতিনিধিরা তাদেরকে উক্ত পণ্য বিক্রি করতে বলেছেন। কোন সমস্যা হলে তারা দেখবেন বলে আশ্বাস দেন দোকানীদের। এছাড়া বিএসটিআইএর গত এপ্রিল মাসের তারিখে স্বাক্ষরিত অনুমোদনের কপি ও গ্রাহকদের বরাবরে কোম্পানীর একটি পত্রে তাদের পণ্যের মান সঠিক রয়েছে বলে দাবী করেছে।

বার্মিজ মার্কেটের অপর একটি দোকানে মঙ্গলবার রাতেও প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছিল মোল্লা লবণ


আবার হাইকোর্টের রায়ের কথা স্মরণ করিয়ে দিলে সেই দোকানী এসব পণ্য বিক্রি করবেন না বলে জানান।
এছাড়া কুলাল পাড়া জীব স্টেশন মোড়ে সোমবার মোল্লা লবণ বিক্রি করতে দেখা গেছে।

ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এসব পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি অনেকেই জানেন না। আবার এমনও রয়েছেন যারা জেনেশুনেই ক্রেতাদের গছিয়ে দিচ্ছেন মানহীন পণ্যগুলো। আর এতে প্রতারিত হওয়ার পাশাপাশি ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন ভোক্তারা।

এদিকে বিএসটিআই সুত্রে জানা গেছে, আদালতের আদেশের পর বৃহস্পতিবার (১৬ মে) পর্যন্ত ৯টি পণ্যের লাইসেন্স বাতিল এবং ২৫টি পণ্য উৎপাদনের অনুমোদন স্থগিত করেছে সংস্থাটি। একই সঙ্গে মানহীন পণ্য বিক্রি ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাবার তৈরি এবং ওজন যন্ত্রের ভেরিফিকেশন সনদ গ্রহণ না করার অপরাধে ১১টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। একই দিন পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে দুই দিনের মধ্যে উক্ত পণ্যগুলো সরিয়ে নিতে বলা হয়েছে।

পণ্য প্রত্যাহার না করলে প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছে বিএসটিআই।
উল্লেখ্য, রমজান মাস উপলক্ষে খোলা বাজার থেকে ৪০৬টি খাদ্যপণ্যের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করে বিএসটিআই। প্রতিবেদন পাওয়া ৩১৩টি পণ্যের মধ্যে ৫২টি পণ্য নিম্নমানের প্রমাণিত হয়। সরিষার তেল, হলুদের গুঁড়া, কারি পাউডার, লাচ্ছা সেমাই, আয়োডিনযুক্ত লবণ, ড্রিংকিং ওয়াটার, স্পেশাল ঘিসহ এসব নিম্নমানের পণ্য দেশের নামি-দামি ব্র্যান্ডের।
ওই প্রতিবেদন যুক্ত করে রিট করে কনশাস কনজুমার সোসাইটি নামের একটি সংগঠন। পরে গত ১২ মে এই ৫২টি খাদ্যপণ্য বাজার থেকে তুলে নেয়ার নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। আদেশ বাস্তবায়ন করে ১০ দিনের মধ্য প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করতে বলা হয়েছে।

বিক্রি নিষিদ্ধ পণ্য হলো- তীর, জিবি, পুষ্টি ও রূপচাঁদা ব্র্যান্ডের সরিষার তেল, সান ব্র্যান্ডের চিপস, আরা, আল সাফি, মিজান, দিঘী, আর আর ডিউ, মর্ণ ডিউ ব্রান্ডের ড্রিংকিং ওয়াটার, ডানকানের ন্যাচারাল মিনারেল ওয়াটার, মিষ্টিমেলা, মধুবন, ওয়েল ফুডের লাচ্ছা সেমাই, ডুডলি ব্র্যান্ডের নুডলস, টেস্টি তানি তাসকিয়া ও প্রিয়া সফট ড্রিংক পাউডার, ড্যানিশ, ফ্রেশ ব্র্যান্ডের হলুদের গুঁড়া, ড্যানিশ ব্র্যান্ডের কারি পাউডার, বনলতা ব্র্যান্ডের ঘি, পিওর হাটহাজারীর মরিচের গুঁড়া, মোল্লা সল্টের আয়োডিনযুক্ত লবণ, কিং ব্র্যান্ডের ময়দা, রূপসা ব্র্যান্ডের দই, মক্কা ব্র্যান্ডের চানাচুর, মেহেদী ব্র্যান্ডের বিস্কুট, বাঘাবাড়ী স্পেশালের ঘি, নিশিতা ফুডসের সুজি, মধুবনের লাচ্ছা সেমাই, মঞ্জিল ফুডের হুলুদের গুঁড়া, মধুমতি ব্র্যান্ডের আয়োডিনযুক্ত লবণ, সান ব্র্যান্ডের হলুদের গুঁড়া, গ্রীনলেনের মধু, কিরণ ব্র্যান্ডের লাচ্ছা সেমাই, ডলফিন ব্র্যান্ডের মরিচের গুঁড়া, ডলফিন ব্র্যান্ডের হলুদের গুঁড়া, সূর্য ব্র্যান্ডের মরিচের গুঁড়া, জেদ্দা ব্র্যান্ডের লাচ্ছা সেমাই, অমৃত ব্র্যান্ডের লাচ্ছা সেমাই, দাদা সুপার, তিন তীর, মদিনা, স্টারশিপ ও তাজ ব্র্যান্ডের আয়োডিন যুক্ত লবণসহ ৫২টি ব্র্যান্ডের পণ্য।