শ্রীলঙ্কায় মুসলিম বিরোধী দাঙ্গায় কারফিউ জারি : গ্রেপ্তার-৬০জন

srilanka_carfew.jpg

টেকনাফ টুডে ডেস্ক : শ্রীলঙ্কায় মসজিদ ও মুসলিম মালিকানাধীন দোকানপাটে হামলার ঘটনায় দেশজুড়ে কারফিউ জারি করে প্রশাসন। দ্বিতীয় দিনের মতো দেশব্যাপী রাত্রিকালীন কারফিউতে এখন পর্যন্ত ৬০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এদের মধ্যে চরম ডানপন্থী বৌদ্ধ গোষ্ঠীর এক নেতাও রয়েছেন।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির খবরে বলা হয়েছে, গত মাসে দেশটিতে ইস্টার সানডে উদযাপনের সময় কয়েকটি গির্জা ও অভিজাত হোটেলসহ আট স্থানে একযোগে ভয়াবহ সিরিজ বোমা হামলা চালানো হয়। ওই হামলায় ২৫০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়।

হামলার পর থেকেই দেশটিতে উত্তেজনা বিরাজ করছে। শুরু হয়েছে মুসলিমবিরোধী সহিংসতা। গির্জায় আইএস জঙ্গিদের হামলার বিষয়টি সামনে আসার পর থেকেই বিভিন্ন স্থানে মুসলিমদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও মসজিদকে আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। এ পর্যন্ত সহিংসতায় একজন মারা গেছে বলে স্থানীয় পুলিশ নিশ্চিত করেছে।

গতকাল শ্রীলঙ্কার বিভিন্ন শহরে দাঙ্গাকারীদেরকে ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও ফাঁকা গুলি ছুড়েছে। দেশটির এমন পরিস্থিতি শান্ত থাকতে এবং ঘৃণা প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ।

মঙ্গলবার থেকে দেশটিতে রাত্রিকালীন কারফিউ জারি রয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে,উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ যেখানে সহিংসতা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে সেখানে কারফিউ আরও দীর্ঘ সময় ধরে জারি থাকবে।

গত সোমবার শ্রীলঙ্কার উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত শহর কিনিয়ামায় একটি মসজিদের দরজা-জানালা ভাঙচুর করেছে আক্রমণকারীরা। এ ছাড়া মুসলিমদের ধর্মগ্রন্থ কোরআনের কয়েকটি কপিও মাটিতে পড়ে থাকতে দেখা গেছে। মসজিদের ভবনে তল্লাশির দাবি জানিয়ে জনতা সেখানে পুলিশি অভিযানের দাবি জানালে এক পর্যায়ে সেখানে হামলার ঘটনা ঘটে।

পুলিশ জানিয়েছে,ফেসবুকে এক ব্যক্তির দেওয়া বিতর্কিত একটি পোস্টের পর খ্রিষ্টান-প্রধান শহর চিলৌতে মুসলিমদের কিছু দোকান ও মসজিদে আক্রমণের ঘটনা ঘটে। পরবর্তীতে ফেসবুকে পোস্ট দেওয়া ৩৮ বছর বয়সী সেই মুসলিম ব্যবসায়ীকে খুঁজে বের করে গ্রেপ্তার করা হয়।

এক মুসলিম ব্যবসায়ী বিবিসিকে বলেন,মুসলিম সম্প্রদায়ের লোকজন এখন আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। সোমবার কলম্বোর উত্তরাঞ্চলের একটি শহরতলীতে অবস্থিত তার একটি ফ্যাক্টরিতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।

বিবিসি জানিয়েছে, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের মুসলিম অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে কারফিউ জারি রয়েছে। সেখানে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত কারফিউ চলবে। এদিকে সহিংস উত্তেজিত জনতাকে থামাতে পুলিশ টিয়ারগ্যাস ও লাঠিচার্জ করেছে।

টেলিভিশনে এক বক্তৃতায় লংকান পুলিশপ্রধান চন্দনা বিক্রমারান্তে সবাইকে সতর্ক করে বলেন,দাঙ্গা থামাতে সর্বোচ্চ পুলিশি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমাসিংহে সবাইকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন,পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলে গত মাসে সন্ত্রাসী হামলার তদন্ত ব্যাহত হবে। উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশের মারাউয়িলি হাসপাতাল থেকে এক পুলিশ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ছুরিকাহত ৪২ বছর বয়সী এক ব্যক্তিকে হাসপাতালে ভর্তি করার পর তার মৃত্যু হয়। স্থানীয় এক বাসিন্দা, যিনি ছুরিকাহত ওই ব্যক্তিকে হাসপাতালে নিতে সাহায্য করেছেন, নিহতের নাম মোহাম্মদ আমির মোহাম্মদ সালি বলে জানিয়েছেন।

উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশের মুসলিম অধ্যুষিত অংশগুলোর বাসিন্দারা জানিয়েছেন, ক্ষুব্ধ জনতা দ্বিতীয় দিনের মতো মসজিদগুলোয় হামলা চালিয়েছে। তাদের দোকান ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো তছনছ করেছে। সহিংসতাপূর্ণ এলাকার এক বাসিন্দা টেলিফোনে রয়টার্সকে বলেছেন, কয়েকশ দাঙ্গাকারী ছিল। পুলিশ ও সেনাবাহিনী শুধু দেখছিল। তারা আমাদের মসজিদগুলো পুড়িয়ে দিয়েছে এবং মুসলিমদের মালিকানাধীন বহু দোকান গুঁড়িয়ে দিয়েছে।

দেশটির অন্য একটি এলাকায় ফেসবুকে সৃষ্ট বিরোধকে কেন্দ্র করে দাঙ্গা হওয়ার পর কর্তৃপক্ষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও হোয়াটসঅ্যাপের মতো মেসেজিং অ্যাপগুলোর ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞাও জারি করেছে।

উল্লেখ্য, বৌদ্ধপ্রধান শ্রীলংকার ২ কোটি ২০ লাখ লোকের মধ্যে মুসলিমদের সংখ্যা প্রায় ১০ শতাংশ। তিন সপ্তাহ আগে স্টার সানডের দিন গির্জা ও বিলাসবহুল হোটেলে আত্মঘাতী হামলার ঘটনায় ২৫৩ জন নিহত হয়। আহত হয় ৫ শতাধিক। মুসলিম জঙ্গিরা ওই হামলা চালিয়েছে বলে লংকান পুলিশের তদন্তে বেরিয়ে এসেছে।