porno porn
izmir rus escortlar
porno izle sex hikaye
corum surucu kursu malatya reklam

তিতুমীরে দিনগুলি মোর….

60205215_2254281334826800_2764530642954747904_n.jpg

বাংলাদেশ নৌ বাহিনীর ফ্রিগেট আলী হায়দার থেকে বদলী হয়ে আন্টি পাইরেটস অপারেশনে একজন কমিউনিকেটর হিসেবে খুলনায় নৌ বাহিনীর ঘাঁটি তিতুমীরে বদলী হলাম। পরিবার অসুস্থ তার উপর অসময়ে বদলীটা আমার খুব খারাপ লেগেছিলো। চিটাগাং জোনেই থাকতে চেয়েছিলাম, যাহোক ৪ বছর পর আবার তিতুমীরে এলাম। প্রথম প্রথম মন বসতে চাইছিলো না, ইচ্ছে করছিলো চাকুরীটা ছেড়ে দেই। পরে আস্তে আস্তে ধাতস্ত হলাম, পরবর্তীতে তিতুমীরের দিনগুলো আমার ভালোই কেটেছিল। অনেকেই আমার পূর্ব পরিচিত ছিলো ।

আমার স্পেশাল ডিউটি, খুলনা-মংলা-বরিশাল-পটুয়াখালী-ঝালকাঠি-খেপুপাড়া-হিরণ পয়েন্ট এই সব জায়গায় নৌ বাহিনীর কন্টিনজেন্ট মোতায়েন ছিল, সে সব জায়গায় মাঝে মাঝে অপারেশনে যাওয়া, দৈনন্দিন অপারেশনের আপডেট নেওয়া এবং নৌ সদরকে জানানো এই ছিল আমাদের কাজ। তখনকার সময় দেশের দঃ অঞ্চলে ডাকাতদের এতই উপদ্রপ ছিল যে, তৎকালীন সরকার বাধ্য হয়ে নৌ বাহিনীর মাধ্যমে এই অপারেশন পরিচালনা করেছিল। যতটুকু মনে পরে তিতুমীরে নির্বাহী কর্মকর্তা লেঃ কমান্ডার শহীদূর রহমান, মংলায় কমান্ডার এম ও জে আলী তালুকদার, বরিশালে অনারারি সা:লেঃ: আবু তাহের, হিরণ পয়েন্টে সাঃ লেঃ মাহবুব, খেপুপাড়ায় চিফ পেটি অফিসার শহিদুল ইসলাম এবং এই গুরুত্তপূর্ণ অপারেশন এর সার্বিক দায়িত্বে ছিলেন। তৎকালীন এনওআইসি(কে) ক্যাপ্টেন পরবর্তীতে নৌ প্রধান নুরুল ইসলাম, তিনি ফ্রিগেট আলী হায়দারে আমার অধিনায়ক ছিলেন ।

খুলনায় দৈনন্দিন কাজের পর একাকিত্ব জীবনে সময় কাটানো এবং আনন্দের উৎস ছিলো খুলনা নিউ মার্কেটের হুগলি বেকারির ফালুদা, বড় বাজারের হোটেল নিরিবিলিতে গরম পরোটা আলু ভাজি, বৈকালির মোড়ের ঘোষ ডেইরির গরম দুধ আর মিষ্টি , প্রেমকাননের নৈসর্গিক দৃশ্য, হাদিস পার্কে সবুজ ঘাষে বসে বাদাম খেতে খেতে আড্ডা দেওয়া, রূপসা নদীতে নৌকা নিয়ে ঘুরে বেড়ানো, রেল ক্রসিংয়ের মোল্লার হোটেলের ফ্রেশ খাওয়া এইগুলাই ছিলো আমাদের ইনলিভিং কমুনিকেটরদের উইক এন্ডে রুটিন। বিশেষ করে মোল্লার হোটেলের রূপসা নদীর তাজা মাছ, নানান প্রকার ভর্তা, মুরগির গোস্ত এবং সাদা ভাত ছিল বিখ্যাত। সেই সময়ে তিতুমীরে আমাদের একটি ইয়ং কমুনিকেটর গ্রুপ ছিল, বর্তমান লেঃ শাহজাহান, নোয়াখালীর ইসমাইল, কুমিল্লার ওহিদ আখন্দ, চাঁদপুরের লেঃ শাহজাহান (দুষ্টামি করে ডাকতাম), ব্রাম্মণবাড়িয়ার যুবরাজ, আমার বাল্য বন্ধু এবং বেচমেট শহীদ আক্তারুদ্দিন জাহাজের মোসলেহউদ্দিন তুহিনসহ আরো কয়েকজন ছিল।

বিটিভিতে অনির্বাণে অনেক অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিলাম, একক গান গেয়ে মোটামুটি নেভিতে পরিচিতি লাভ করেছিলাম, আর এটার পুরু ক্রেডিট নৌ পরিক্রমার সম্পাদক ই: লেঃ কমান্ডার খান মোস্তফা কামাল স্যারের। তিনিই আমাকে তৎকালীন বিটিভির মহাপরিচালক মোস্তফা মনোয়ারের মাধ্যমে সুযোগ করে দিয়েছিলেন । বিটিভিতে অনির্বাণে গান গাইতাম আমি আর সিনিয়ররা প্রশংসা করতো আমার ব্যাচমেট দিনাজপুরের এলআরওজি তারেকের, ওর চেহারা ছিল অনেকটা আমার মত, আমি ভেবে তাকে সবাই মিষ্টি মুখ করাতো তার প্রশংসা করতো, সে এমন ভাব নিতো যেন সেইই শামীম, আমি শুধু চেয়ে চেয়ে দেখতাম আর হাসতাম ।

একদিন আমি বাহির থেকে রাত ১০টায় একা ঘাঁটিতে প্রবেশ করছিলাম, দেখলাম গার্ড রুমের সামনে অধিনায়ক ক্যাপ্টেন নুরুল ইসলাম দাঁড়িয়ে আছেন সাথে নির্বাহী কর্মকর্তা লেঃ কমান্ডার শহিদূর রহমান এবং সাব লেঃ মুসলেহ উদ্দিন, সবাই উনিফর্মে, সবার মুখ খুব গম্ভীর, আমি তাদের স্যালুট দিয়ে গার্ডরুমে নাম ইন করে উটকো ঝামেলা এড়াতে বেরাকের পথ ধরলাম, “শামীম এদিকে এসো” হঠাৎ পরিচিত কণ্ঠস্বর শুনে থমকে দাঁড়ালাম, এই কণ্ঠ আমার চেনা..,ক্যাপ্টেন স্যারের। বললেন কমসেনে (সিগন্যাল অফিস) কাজ আছে আমার সাথে এসো । স্যারেরা সামনে হাঁটছেন আমি একটু পিছে, বুঝলাম কোনো একটা বিষয়ে উনারা খুব টেনশন এ আছেন, আমি সিভিল ড্রেসে খুব সংকোচ বোধ করছিলাম, আমি উনাদের পিছনে পিছনে কমসেনের বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম, অফিসারা কমসেনে প্রবেশ করলো আমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে রইলাম, জানালা দিয়ে দেখলাম ক্যাপ্টেন লেন্ড লাইনে নানান জায়গায় উত্তেজিত হয়ে ফোন করছেন। তখন মোবাইল ছিলোনা, কখনযে রাত ১টা বেজে গেলো টেরও পেলাম না, আমার খুব ঘুম পাচ্ছিলো, আমি এমএসওতে প্রবেশ করে দেখলাম কাপ্টেন স্যার সাউন্ডপ্রুফ গ্লাস দিয়ে মোড়া আরসিও (রেডিও কমিউনিকেশন অফিস) এর মধ্যে ঢুকে অস্থিরভাবে পায়চারি করছেন। হটাৎ তিনি আরসিও থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে নরসিংদীর টোনে বললেন “শহীদ আমি জানিনা কিভাবে তুমি ম্যানেজ করবা। মিনিস্ট্রার সকাল ৯ টায় বরিশাল রওনা করবো, বিষখালীর সিওর কাছে বার্তা যাওয়া চাই, আমাকে দেখিয়ে বললেন শামীমরে কাজে লাগাও, এই কথা বলে তিনি কমসেন থেকে বেরিয়ে গেলেন, রাত তখন দুটা প্রায় ।

ক্যাপ্টেন বেরিয়ে যাবার কিছুক্ষন পর লেঃ কমান্ডার শহীদূর রহমান স্যার আমাকে হাতের ইশারায় কাছে ডাকলেন, অত্যান্ত শান্ত কণ্ঠে বললেন “শামীম….শুনলেতো কমান্ডিং অফিসার তোমার কথা বলে গেলো। শোন..বিষখালী জাহাজ বরিশাল বিএডিসি ঘাটে আছে, রাট ৮ টার পর থেকে তাদের সাথে কোন যোগাযোগ নেই, তাদের সব কমিউনিকেশন সেট অফ করা, অনেক ইমিডিয়েট বার্তা পেন্ডিং পড়ে আছে।

আগামীকাল সকাল ৯ টায় একজন মিনিস্টার বিষখালী জাহাজে করে হিরণ পয়েন্ট ভিজিট করবে, তুমি আরসিওতে থাকো, এলার্ট থাকো, যেভাবে পারো রাত ৩টার মধ্যে এই বার্তা বিষখালিতে পাঠাতে হবে। সিভিল ড্রেস পরেই কাজ করো, এটা ইমার্জেন্সি” আমি অবাক হয়ে স্যারের দিকে তাকিয়ে রইলাম, নৌ বাহিনীতে প্রায় সবাই জানত, স্যার অত্যান্ত রাশভারী, স্টাইলিস্ট এবং মুডি ছিলেন । সংস্কৃতিমনা শহীদূর রহমান ডিসিপ্লিনে অত্যান্ত কঠোর ছিলেন, স্যার সবার টেনশন আমার ঘাড়ে চাপিয়ে দিলো মনে হলো, আমার গলা শুকিয়ে গেলো, স্যার আমার মনের অবস্থা বুঝতে পারলেন, তিনি আমাকে আগে থেকেই চিনতেন এবং খুবই ভালো বাসতেন আমাকে, তিনি হেসে বললেন “টেনশন করোনা তুমি, আমি জানি তুমি পারবে …ওদের হেল্প করো….তোমার চেষ্টা তুমি করো, বাকিটা আমি দেখব।

কিছুক্ষন পর সাব লেঃ মোসলেহ উদ্দিনকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়ে শাহিদুর রহমান স্যারও চলে গেলেন, সাব লেঃ মুসলেহ উদ্দিন যশোরের ভাষায় আমাকে বললেন “বিটা আরসিওতে যা….দেখ কি অবস্থা” । আমি আরসিওতে গেলাম, এয়ার কন্ডিশনের ঠান্ডা বাতাস গায়ে এসে লাগলো, দেখলাম আরওজি ওহীদ আখন্দ দাঁড়িয়ে এবং পিওআরএস আব্দুল গফুর মুখটা কালো করে রেডিও সেটের সামনে বসে আছেন। তিনি তার বার্তার ফাইলটা আমার হাতে দিয়ে আরসিও থেকে বেরিয়ে গেলেন। উনার চেহারায় টেনশনের ছাপ স্পষ্ট, আরসিওতে আমি ও আমার জুনিয়র ওহিদ আখন্দ।

ওহিদ রসিকতার সাথে বললো “ও স্যার… চাকরি থাকবো?”, তার বলার ঢঙে আমি হেসে দিলাম, বললাম কেন?, সে বললো “আগে বার্তার ফাইল দেখেন, বার্তা পড়েন…..তারপর আমারে জিগাইয়েন….আমি আপনার লাইগা চা লইয়া আসি” । বার্তা ফাইল হাতে নিয়ে বার্তা পড়তে লাগলাম, প্রতিটি বার্তা খুবই জরুরী, প্রায় ৫০টি, বার্তাগুলো পড়ে এসির মধ্যেও আমি ঘামতে লাগলাম, আমি বার্তাগুলোর ইনক্রিপ্টেড কপিগুলো নিয়ে এইচ অফ রেডিও সেটের সামনে এসে বসলাম।

বিষখালী জাহাজকে রেডিওতে ডাকতে লাগলাম, এক মিনিট পর পর বিরতি দিয়ে প্রায় ১৫ মিনিট ডাকলাম কিন্তু কোন প্রতিউত্তর পেলাম না, প্রতিটি কল লগ করতে লাগলাম, চরম অস্থির লাগছিলো। এরই মধ্যে ঢাকা, চিটাগং এবং খুলনা নাবিক কলোনীর কমসেন ২, সেইন্ট মার্টিন, কক্সেস বাজারের সাথেও রেডিওর মাধ্যমে যোগযোগ হলো কিন্তু বিষখালী কই? ধর্য্য হারালাম…শালার বিষখালীর অপারেটর কে? সশব্দে নিজেকেই যেন প্রশ্ন করলাম, “তোর বেস ফেলো লুৎফর” উত্তরটা এলো আমার পিছন থেকে, দেখি সাব লেঃ মোসলেহ উদ্দিন আমার পিছনে দাঁড়িয়ে। তার অসহায় মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম কিছুক্ষন, মনে মনে লুৎফরকে বকা দিচ্ছিলাম, মাথায় কাজ করছিলোনা।

স্যারকে বললাম আপনি বাসায় চলে যান, কিছু হলে আমি ফোন দিবো, তিনি আরসিও থেকে বের হয়ে গেলেন। রাত ৩টার দিকে আমাকে চমকে দিয়ে আরসিওর লাল ফোনটা ঝনঝনিয়ে বেজে উঠলো। আমি কলটা রিসিব করতেই অপর পাশ থেকে কেউ বলে উঠলো “বিষখালীকে পেয়েছো?” যন্ত্রের মতো উত্তর দিলাম “না”। তিনি আবার বললেন “আমি কমডোর আলম”, আমি সালাম দিয়ে আমার পরিচয় দিলাম, “চেষ্টা করো বাবা”….ঢাকা থেকে সহকারী নৌ প্রধান (এম) ফোন, কিছুক্ষন পর শহিদুর রহমান স্যার ফোন করলেন, আপডেট জানতে চাইলেন। আমি বললাম এখনো পাইনি স্যার…আমি চেষ্টা করছি। শুনে ফোন রেখে দিলেন, সবাই টেনশনে আছে বুঝতে পারলাম …. শুনশান নীরবতা, চিন্তা করছিলাম-একটা রাষ্ট্রীয় প্রোগ্রাম এবং এর সাথে মিনিস্ট্রি জড়িত, পুরো ঘটনার গুরুত্ত বুঝতে পারলাম।

আমি টেনশনে অসম্ভব ঘেমে গিয়েছি, এসির ঠান্ডা বাতাসও ঘাম কমছেনা্ আমার মনের এই অনুভূতি একজন নিবেদিত রেডিও অপেরেটোর ছাড়া অন্য সাধারণ কেউ উপলব্ধি করতে পারবেনা। আরসিও থেকে বেরিয়ে এমএসওতে দেখলাম মুসলেহ উদ্দিন স্যার কম্বল মুড়িয়ে ফ্লোরে শুয়ে আছে। পাশে টেবিলে মাথা রেখে পিওআরএস আব্দুল গফুর উনিও গভীর ঘুমে। টেনশন কাটাতে কমসেনের বারান্দায় পায়চারি করতে লাগলাম…..কি যেন একটা মনে ওকি দিচ্ছে বা কিছু একটা আমার চোখ এড়িয়ে যাচ্ছে। ধরতে পারছিনা, ওহিদ এসে বললো চা নেন স্যার, চায়ে চুমুক দিতে দিতে তাকে বললাম তোর সিনিয়র কই রে….তুই ডিউটিতে একা কেন? সে আমার প্রশ্নটাকে পাত্তা দিলোনা। বললো চা খান.. মাথা খুলব, আমি তার দিকে তাকিয়ে বললাম, কি করি বলতো….সে বললো…আপনারা সিনিয়র মানুষ আমি কি কমু…তয় এই মেসেজ যদি বিষখালি না পায় কমসেনে আগুন লাগবো স্যার….বিপদে পরুম সবাই…আমনে তো বাইচা যাইবেন …গেস্ট অপারেটর…..আমার তো খাতাই নাই…….কি নির্ভার উত্তর তার। কোন টেনশন যে নাই তার এমন নয়, সে এই অল্প বয়সেও আমার চেয়ে অনেক কিছু বেশি বুঝতে পারে, পোড় খাওয়া শিক্ষা তার । আরসিওতে ফিরে চেয়ারে বসে পড়লাম, ক্লান্তিতে সমস্ত শরীর অবশ হয়ে আসছে, টেনশনে ঠোঁট শুকিয়ে যাচ্ছে। লাল এনালগ ফোনটার দিকে তাকিয়ে রইলাম, ছোট একটা তালা দিয়ে লক করা। হটাৎ মনের মাঝে একটা প্রশ্ন উঁকি দিলো…মন্ত্রীর নাম কি?.. দ্রুত বার্তার ফাইলটা হাতে নিয়ে মন্ত্রীর নামটা আবার পড়লাম….বন ও পশু সম্পদ প্রতিমন্ত্রী….। মন্ত্রীর নামটা দেখলাম …..আমি মুচকি হাসলাম….এই নামটাই মনে উঁকি দিচ্ছিলো। কিন্তু অতিরিক্ত টেনশনে আমার চোখ এড়িয়ে গেছে…জটিলতম কাজটা আমার কাছে পানির মতো সহজ হয়ে গেলো।

কর্তব্য স্থির করলাম….মাথা দ্রুত কাজ করছিল….মনে মনে একটা প্ল্যান সাজিয়ে কাজে নেমে পড়লাম। পাশে খুলনা অঞ্চলের জরুরী ফোনবুক, ফোনবুকটা টেনে নিয়ে পড়তে লাগলাম। যা খুজছিলাম পেয়ে গেলাম । বরিশালের এসপির নাম্বার…মনটা উৎফুল্ল হয়ে উঠলো। ওহিদকে জিজ্ঞাস করলাম এই ফোনের চাবি কই নিয়ে আয়, সে বললো পেটি অফিসারের ড্রয়ারে। কিন্তু এই ফোন ব্যবহার করা নিষেধ আছে স্যার। আমি গম্ভীরভাবে বললাম…চাবি এনে দে। জানিনা আমার কন্ঠস্বরে কি ছিলো, সে ভয় পেয়ে গেলো, দ্রুত চাবি নিয়ে এলো, ফোনটার তালা খুলে ঘড়ির দিকে তাকালাম-রাত সাড়ে ৩টা।

বরিশাল পুলিশের এসপির বাসার নাম্বারে ডায়াল করলাম..কেউ ধরলোনা। আবার কল দিলাম, সেই মুহূর্তে আমি ভুলে গিয়েছিলাম আমার পদবী। পদবী অনুযায়ী আমার সীমাবদ্ধতা, এসব ছাড়িয়ে আমার ভিতরে বাস করা সাহসী একজন অফিসার জেগে উঠলো। যেটা ১৯ নং আর্মি লং কোর্সের সময় অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় ঘুমিয়ে গেয়েছিল। আমার মাথায় একটাই চিন্তা কিভাবে নির্ভুলভাবে কাজটা শেষ করা যায়। অপর পাশ থেকে কেউ একজন ফোন ধরলো, হ্যালো…বাশার বলছি….আমি সালাম দিয়ে বললাম ” আমি শামীম….খুলনা নেভাল সিগন্যাল অফিস থেকে বলছি, এতো রাতে আপনাকে বিরক্ত করার জন্য দুঃখিত স্যার। খুবই ইমার্জেন্সি একটা উপকার করতে হবে, বরিশাল বিএডিসি ঘাটে নৌ বাহিনী জাহাজ বিষখালী আছে, সেই জাহাজের অধিনায়ককে আমার দরকার, খুবই জরুরী বার্তা আছে উনার জন্য। উনার সাথে যোগাযোগের কোন মাধ্যম না পেয়ে আপনাকে এতরাতে বিরক্ত করলাম। আপনি উনাকে খুব দ্রুত আপনার বাসায় আনার ব্যবস্থা করুন।

খুবই জরুরী, এসপি আমার ফোন নাম্বারটা নিলেন….আমার বলার ধরণ এবং গুরুত্ত অনুধাবন করে তিনি আমাকে আর কোন প্রশ্ন করলেননা। লাইন কেটে দিলেন…এই সেই এসপি বাশার যিনি RAB গঠনে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিলেন। ওহিদ অবাক হয়ে আমার কর্মকান্ড দেখছিলো, আমি এসপির ফোনের অপেক্ষা করছিলাম। প্রায় ২০ মিনিট পর ফোন বেজে উঠলো, আমি ছো মেরে ফোন তুলে নিলাম, অপর প্রান্তে এসপি নয়, কমান্ডিং অফিসার বিষখালী লেঃ কমান্ডার আব্দুর রাজ্জাক। বললো “আপনি কে” আমি আমার পরিচয় দিয়ে উনাকে দ্রুত কাগজ কলম নিতে বললাম। খুব সংক্ষেপে প্রত্যেকটি তার বার্তার বিষয় কমান্ডিং অফিসারকে বুঝিয়ে বললাম, তিনি অ্যাকশন নোট নিলেন…সব শুনে ওপাশ থেকে তিনি “ও মাই গড” বলে উঠলেন।

আমি তাকে অনুরোধ করলাম আপনার কমুনিকেশন সেট অন করেন স্যার, তিনি আমাকে বললেন জাহাজে জেনেরেটর প্রবলেম দিচ্ছে তাই সেট বন্ধ ছিলো। আমি কমান্ডিং অফিসারকে ঢাকা এবং খুলনার পরিস্থিতি বললাম, আমি যে তাকে ফোনে বার্তা দিয়েছি সেটা গোপন রাখতে বললাম। তার বার্তা মোতাবেক দ্রুত অ্যাকশন নিতে বললাম কমান্ডিং অফিসারকে, তিনি আমাকে ধন্যবাদ দিয়ে ফোন কেটে দিলেন। কাজটা করতে পেরে প্রশান্তিতে মনটা ভরে গেলো, প্ল্যান মোতাবেক আরেকটা কাজ বাকি আছে । ওহিদ অবিশ্বাস্য চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে, চেয়ারে শরীরটা এলিয়ে দিলাম। হটাৎ খেয়াল করলাম রেডিও সেটে বিষখালী জাহাজ আমাকে ডাকছে। ভয়েস ব্যবহার করে দ্রুত সকল জাহাজ ও স্টেশনকে ট্রান্সমিশন বন্ধ করতে বললাম, তারপর বিষখালী জাহাজের অপারেটরের নাম জিজ্ঞাস করলাম, বললো…পেটি অফিসার.. মুস্তফা…সিলেটি….আমার দেখা সবচেয়ে দক্ষ কমুনিকেটর অপারেটরদের একজন। বর্তমানে রেডিও অফিসার, ২৫ থেকে ৩০ মিনিটের মধ্যে আমি সব তারবার্তা ওয়্যারলেস টেলিগ্রাফির মাধ্যমে তাকে পাঠিয়ে দিলাম, অবিশ্বাস্য দক্ষতায় ও দ্রুততার সাথে তিনি বার্তা গ্রহণ করছিলেন, পাশে বসে ওহিদ লগ করছিলো আর অবাক বিস্ময়ে আমাকে দেখছিলো, প্রতিটি বার্তা প্রেরণ সময় লেগেছে ৩ থেকে ৪ মিনিট, যা অবিশ্বাস্য।

একটা ঘোরের মধ্যে কাজ করে যাচ্ছিলাম, একসময় বার্তা পাঠানো শেষ হলো, অল ডান, ডান হাত ব্যথা হয়ে গেল, সেমুয়েল মোর্স আমাদের দুজনের বার্তা আদান প্রদান দেখলে আমাদের নিয়ে গর্ব করতেন, যাক হাফ ছেড়ে বাঁচলাম…তবে কাজ এখনো শেষ হয়নি …..ভোর ৬টা বাজার অপেক্ষা করছিলাম….৬ টা বেজে গেলো। ফোনটা নিয়ে ডায়াল করতে শুরু করলাম, গন্তব্য ঢাকা….লেক সার্কাস রোডের একটা বাড়ীর নাম্বার….প্রতিমন্ত্রীর বাসা… তিনি আমার পূর্ব পরিচিত….আমাকে ছাত্র জীবন থেকেই চিনেন…. ব্যক্তিগতভাবে আমাদের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর ..তিনি জানেন আমি নেভিতে আছি….হ্যালো…কে?

আমি বললাম “ভাইয়া আমি শামীম”খুলনা থেকে বলছি আমি আঞ্চলিক ভাষায় মন্ত্রীর সাথে কথা বলছিলাম এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সুবাধে কুশল বিনিময়ের পর বললাম বিপদে আছি, উনাকে অনুরোধ করলাম তার খুলনা নেভির প্রোগ্রাম ব্যক্তিগত কারন দেখিয়ে তিন ঘন্টা পিঁছিয়ে দিতে। শুনলেন শুধু…..কারন জানতে চাইলেননা এবং আমিও কিছু বলিনি। বললেন তোমার উপকার হবেতো?….আমি বললাম…হাঁ…হেসে ফেলেন তিনি….পরের দিন আমাকে খুলনা সার্কিট হাউজে দেখা করতে বললেন…সালাম দিয়ে ফোন রেখে দিলাম ।

মন্ত্রীর নামটা নাইবা বললাম, এরপর আমি ওয়ার্ডরুমে ক্যাপ্টেনকে ফোন দিলাম। স্যার ইনলিভিং তিনি তখন ওয়ার্ডরুমে থাকতেন। ক্যাপটেন ফোন ধরলেন …হ্যালো.. আমি সালাম দিয়ে বললাম…”স্যার শামীম বলছি…সব বার্তা বিষখালী রিসিব করেছে। বিষখালীর কমান্ডিং অফিসারকে উনার অ্যাকশন অন ভয়েস বলে দিয়েছি….মিনিস্টার শিডিউলের তিন ঘন্টা পরে আসবে।

যতটুকু সংক্ষেপে পারা যায় সত্যটা জানালাম স্যারকে … শুনে ক্যাপ্টেন বললেন….ওয়েল ডান শামীম…গো টু স্লিপ…ফোন রেখে দিলেন ক্যাপ্টেন । শরীরটা টেনশন ছেড়ে শীতল হয়ে এলো, আমি ফোন রাখতেই, ওহিদ “গুরু” বলে পিছন থেকে আমাকে জড়িয়ে ধরলো…ক্যাপ্টেন স্যার ফ্রিগেট আলী হায়দার থেকেই জানতেন সেই প্রতিমন্ত্রীর সাথে আমার ব্যক্তিগত সম্পর্ক আছে। এটা শহিদুর রহমান স্যার জানতেন না, এজন্যই শাহিদুর রহমান স্যারকে তিনি বলেছিলেন “শামীমরে কাজে লাগাও”…পরে আমিও ক্যাপ্টেন স্যারের দূরদর্শিতা অনুধাবন করে আশ্চর্য হয়ে গেয়েছিলাম…একেই বলে অধিনায়কত্ব ।
মুসলেহ উদ্দিন স্যারের জন্য একটা রিপোর্ট নোট লিখে আখন্দের হাতে দিলাম…রেডিও রুম থেকে বের হলাম…পিছনে ওহিদ …এমএসওতে স্যাররা তখনো ঘুমাচ্ছে…ভোরের সূর্য উঠছে…ঠান্ডা শীতল বাতাস শরীরে অনুভূত হলো…..নতুন নাবিকদের কোলাহল শুনা যাচ্ছে,ওহিদের হাতে ফোনের চাবিটা দিয়ে…মেসের পথে হাটা দিলাম …..সবশেষে অসম্ভব এক ভালোলাগায় হৃদয়টা ভরে আছ…পিছনে ফিরে দেখি ওহিদ তখনও বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে…..হাসছে…. আমিও মুচকি হাসলাম…এ হাসি পরিতৃপ্তির ।

সব কিছু কোনো অঘটন ছাড়াই শেষ হলো, ঘটনার ১ দিন পর লেঃ কমান্ডার শহিদুর রহমান স্যার আমাকে তার অফিসে ডেকে পাঠালেন, স্যালুট দিয়ে স্যারের রুমে ঢুকলাম, দেখলাম কমান্ডিং অফিসার বিষখালী এবং সাব লেঃ মোসলেহউদ্দিন দাঁড়িয়ে আছেন, শহিদুর রহমান স্যার আমার দিকে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে রইলেন, অস্বস্থিবোধ করছিলাম আমি তাই চোখ নামিয়ে নিলাম। স্যার চেয়ার থেকে উঠে আমার সামনে এসে দাঁড়ালেন, কিছুই বললেন না শুধু দুবার পিঠ চাপড়ে দিয়ে মুচকি হেসে ৭ দিনের নৈমিত্তিক ছুটি মুন্জুরের একটা কাগজ হাতে দিলেন।

আমি অবাক হয়ে স্যারের দিকে তাকিয়ে ছিলাম, স্যার মিটিমিটি হাসছেন বললেন বাড়ি যাও। কৃতজ্ঞতায় চোখ জ্বালাপোড়া করতে লাগলো, অনেক কষ্টে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করলাম। ছুটিটা আমার খুবই দরকার ছিলোI এখনো আমি স্যারের কাছে কৃতজ্ঞ কারন, ২ ডিসেম্বর ১৯৯২ ছুটিতে থাকাকালে সকাল ৯ টায় বিএনএস পতেঙ্গায় আমি আমার প্রথম সন্তানের মুখ দেখেছিলাম। ৫ পাউন্ড ওজনের ছোট্ট একটা শিশু আমার পরিবারকে আনন্দের বন্যায় ভাসিয়ে দিলো, আমার মায়ের সেকি আনন্দ আর ব্যস্ততা…তিনি খুব খুশি নাতি পেয়ে, আদর করে তার নাম রেখেছিলাম “হৃদয়”….মিনহাজুল আবেদীন হৃদয় ।

লেখক
মো আলমগীর
সাবেক নৌবাহিনী কর্মকর্তা

আপনার মন্তব্য লিখুন...

Top
bedava bahis bahis siteleri
bahis siteleri