টেকনাফে বিভিন্ন স্থানের স্বঘোষিত রাজা-ডনেরা পাহাড়ী জনপদে : এখনো বেপরোয়া অনেক সিন্ডিকেট

H-2.jpg

হুমায়ূন রশিদ : টেকনাফে নিয়োজিত আইন-শৃংখলা বাহিনীর অব্যাহত মাদক বিরোধী অভিযানে ক্রমশ কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। বন্দুক যুদ্ধ, আটক ও ভ্রাম্যমান আদালতে সাজা প্রদান কার্যক্রম চলমান থাকার পরও অনেকে এই অপকর্মে সম্পৃক্ত রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, টেকনাফ সীমান্ত জনপদের বিভিন্ন স্থানে স্বঘোষিত কতিপয় জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক দলের পদবীধারী নেতা, মিডিয়াকর্মী পরিচয়ী অপরাধী, প্রভাবশালী ও অস্ত্রধারী এলাকা ভিত্তিক রাজা, ডন, সন্ত্রাসী ও কথিত দানবীরদের মধ্যে অনেকে বিদেশ পালিয়েছে। আবার অনেকে এলাকার বাহিরে আতœগোপনে থাকলেও আটকেপড়া বেশীরভাগ অপরাধী এখন পাহাড়ী পাদদেশের বসতি সমুহে আশ্রয় নিয়েছে। অনেকে সেখানে বসে এই অপকর্ম চালালেও কিছু কিছু পয়েন্টে মাদকের উপদ্রব কমে আসছে। বেপরোয়া মোটর বাইকের আনা-গোনা তুলনামূলক কমেছে। রাত-দিন মাদকাসক্ত হয়ে মাতাল আর মনে যা চাই তা করে বেড়ানো রাজা-ডনেরা তাদের সুখের রাজ্যে এমন দুর্দিন আসবে কখনো কল্পনাও করেনি। এখন একটু পিঠ ফেলার জায়গায় বিশ্রামের জন্য এই বাড়ি আর ওই বাড়ির দুয়ারে আশ্রয় খুঁজে বেড়াচ্ছে বলে একাধিক সুত্রের দাবী। অনেকে পাহাড়ে বাসা তৈরী করে আস্তানা গড়েছে বলে জানা গেছে। আবার অনেকে প্রাণ রক্ষার্থে আড়ালে গেলেও তাদের সিন্ডিকেট সদস্যদের অপতৎপরতা কমেনি।
এসব সিন্ডিকেট সদস্যদের চালান আনতে গিয়ে অনেকে মিয়ানমার সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর হাতে আটক হয়েছে। বিভিন্ন পয়েন্টে চালান খালাসের ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে বাক-বিতন্ডার ঘটনা ঘটছে। সেখানে বসে মোটাংকের টাকার মিশনে মাদক বিরোধী অভিযান ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার লক্ষ্যে বিভিন্ন মতলব আটলেও কোন কূল-কিনারা খুঁজে পাচ্ছেনা। তাদের এই অপতৎপরতার মধ্যেও আইন-শৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা সাম্প্রতিক সময়ে অভিযান চালিয়ে ইয়াবাসহ বেশ কয়েকজন পাচারকারীদের আটক করতে সক্ষম হয়েছে। অনেকে নিরুপায় হয়ে শেষ পর্যন্ত আইন-শৃংখলা বাহিনীর হাতে আতœসম্পর্ণের চিন্তা-ভাবনা করছে বলে একাধিক সুত্র দাবী করছে।
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, উপজেলার ১নং হোয়াইক্যং ইউনিয়নের চাকমার কূল, মনিরঘোনা, হরিখোলা, রইক্ষ্যং, পশ্চিম নয়াপাড়া, ঝিমংখালী-মিনা বাজারের পশ্চিম, পশ্চিম সাতঘরিয়া পাড়া, মহেশখালীয়া পাড়া, কম্বনিয়া পাড়া, হ্নীলা ইউনিয়নের মরিচ্যাঘোনা, বৃহত্তর পশ্চিম পানখালী, লেচুয়াপ্রাং, পশ্চিম সিকদার পাড়া, উলুচামরী, গাজীপাড়া, আলীখালী রোহিঙ্গা বস্তি, লেদা রোহিঙ্গা বস্তি ও পাহাড়, বৃহত্তর নয়াপাড়া শরণার্থী ক্যাম্প ও সংলগ্ন পাহাড়, নয়াপাড়া শালবন, জাদিমোরা বৃটিশ পাড়া, নেচার পার্ক, টেকনাফ সদরের বরইতলী, নাইট্যং পাড়া, উপজেলা পরিষদ, পুরান পল্লান পাড়া, নতুন পল্লান জাহালিয়া পাড়া, দরগাহের ছড়া, হাতিয়ার ঘোনা, মিঠা পানির ছড়া, হাবিরছড়া, রাজারছড়া, উপকূলীয় বাহারছড়া নোয়াখালী, কচ্ছপিয়া, বড় ডেইল, মাথা ভাঙ্গা, হাজম পাড়া, জাহাজপুরা, শীলখালী, শামলাপুরের পাহাড়ী জনপদে ইয়াবা চোরাচালান, অবৈধ অস্ত্রধারীরা প্রাণ রক্ষার্থে আশ্রয় নিয়েছে।
এসব স্থান হতে নির্দেশনার মাধ্যমে কৌশলে নিজস্ব টমটম, সিএনজি, মাহিন্দ্রারা, মাইক্রো, নোহা, মিনি পিকআপ, যাত্রীবাহী ও পণ্যবোঝাই যানবাহনে করে এলাকা ভিত্তিক, যানবাহনের যোগানে করে চালান সরবরাহ অব্যাহত রেখেছে। গত কয়েকদিনে টেকনাফে মাদক বিরোধী অভিযানে সংশ্লিষ্ট আইন-শৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা এখনো মাদকে তৎপর চক্রের বেশ কয়েকজন সদস্যকে হাতে-নাতে আটক করেছে।
এই ব্যাপারে শামলাপুর এলাকার এক বাসিন্দা বলেন, মাদক চোরাকারবারীদের তৎপরতা কমেছে তবে সেবনকারীদের উৎপাত কমেনি। উত্তর শীলখালীর এক সমাজসেবক বলেন, বিভিন্ন বৈধ ব্যবসার আড়ালে থাকা ইয়াবা ব্যবসায়ীরা পাহাড়ে লুকিয়ে থাকে। সেবনকারীদের অপতৎপরতার কারণে এলাকায় চুরি-ছিনতাই বাড়ছে। হাজম পাড়ার কর্মজীবি এক বাসিন্দা বলেন, কৌশল পরিবর্তন করে বাণিজ্য ও সেবন সমানতালে চলছে। গত ২/৩দিন আগে আমাদের গ্রামের সামনে হতে বিজিবি বিপূল পরিমাণ ইয়াবা ও গাড়িসহ একজনকে আটক করেছে। নোয়াখালী পাড়ার এক দোকান ব্যবসায়ী জানান, টেকনাফ পৌর এলাকা ও সদরের চিহ্নিত কতিপয় মাদক পাচারকারী পাহাড়ী বসতিতে আশ্রয় নিয়েছে। সাগর পথে মাদকের চালান আসা কমলেও বিভিন্ন যানবাহনযোগে আসছে। তা পাহাড়ী পথ ও যানবাহনের যোগানে করে পাচার হচ্ছে।
সদরের লেঙ্গুরবিলের গ্রামের এক বাসিন্দা জানান, প্রশাসনের মাদক বিরোধী অভিযানে চাপের মুখে তাদের অপতৎপরতা কমেছে। মোটর বাইকের তৎপরতা তুলনামূলক কমেছে। তবে সেবীদের কর্মকান্ড বন্ধ হয়নি। টেকনাফ পৌর এলাকার প্রশাসন সংশ্লিষ্ট এক বাসিন্দা বলেন,প্রশাসনের চাপে মাদক চোরাচালানে জড়িতরা পালিয়েছে। এখন কয়েকজন মাদকসেবীর আনা-গোনা চোখে পড়ে। জালিয়া পাড়া, কায়ুকখালী, নাইট্যং পাড়া নাফনদীর কিনারা এবং পাহাড়ের পাদদেশে হওয়া অনেক ইয়াবা চালান খালাসকারী ও বহনকারী রয়েছে। বরইতলীর লোকজন মুখ না খুললেও আলাপ চারিতায় এখনো অনেকে মাদকে সংশ্লিষ্ট রয়েছে।
হ্নীলা ইউনিয়নের দমদমিয়া-জাদিমোরা নাফনদীর বেড়িবাঁধে হওয়ায় চিহ্নিত মাদক কারবারীরা পাশর্^বর্তী পাহাড় ও রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আতœগোপনে থাকলেও চোরাচালান কার্য্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
এদিকে নয়াপাড়া, মোচনী, বৃহত্তর লেদা ও আলীখালীর মাদক চোরাচালানীরা রোহিঙ্গা বস্তিতে অবস্থান করে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে ব্যবহার করে মাদক চোরাচালান কার্য্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। রঙ্গিখালী, চৌধুরী পাড়া, নাটমোরা পাড়ায় এখনো কৌশলী মাদকের চালান খালাসকারীরা তৎপর রয়েছে। পূর্ব ফুলের ডেইল, গোদাম পাড়া, সুলিশ পাড়া ও হোয়াব্রাংয়ের চিহ্নিত গুটি কয়েক যুবকের মাদক সংশ্লিষ্ট অপতৎপরতা বন্ধ হয়নি। মৌলভী বাজারে একটি শক্তিশালী মাদক সিন্ডিকেট পুরো এলাকার পরিবেশ দূষিত করেছে বলে বিভিন্ন সুত্র থেকে অভিযোগ উঠেছে।
হোয়াইক্যং ইউনিয়নের খারাংখালী, মহেশখালীয়া পাড়া, নয়া বাজারের গ্রাম ভিত্তিক স্বশস্ত্র সিন্ডিকেট তৎপর রয়েছে। মিনা বাজার-ঝিমংখালীতে খুচরা বিক্রেতাদের তৎপরতা মাঝে মাঝে চোখে পড়ে বলে জানা গেলেও বৃহত্তর নয়া পাড়ার চিহ্নিত অপরাধীরা মৎস্য ঘেঁরের আড়ালে এখনো তৎপর বলে জানা গেছে। কাঞ্জর পাড়া, ঊনছিপ্রাং ও লম্বাবিলের মাদক সংশ্লিষ্টরা চোরাচালানের আড়ালে এখনো উঁকি মারছে। খারইংগ্যাঘোনা, উলুবনিয়া ও তুলাতলীর মাদক চোরাকারবারীরা আড়ালে থেকে শিশু-কিশোরদের ব্যবহার করছে বলে জানা গেছে।
এদিকে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও সচেতনমহলের সাথে আলাপকালে জানায়, র‌্যাব, পুলিশ, বিজিবি, কোস্টগার্ড ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অভিযানে মাদক চোরাচালান কমে আসছে। সকলের আন্তরিকতায় এই অভিযান অব্যাহত থাকলে আগামীতে মাদক বিরোধী অভিযানে আরো সাফল্য আসবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।