এসএসসির পর স্কুলের সহপাঠি বন্ধুদের জন্য বার্থ ডে ট্রিট দেয়ার স্বপ্ন বুনেছিলেন এমশাদ!

Chakaria-Picture-Aminul-Hossain-Amshad-16-07-2018.jpg

এম.জিয়াবুল হক, চকরিয়া :
চকরিয়া গ্রামার স্কুলের দশম শ্রেণীর ছাত্র আমিনুল হোসেন এমশাদ (১৬)। এসএসসি পরীক্ষা শেষেই স্কুলের সহপাঠি বন্ধুদের জন্য বার্থ ডে পাটি দেয়ার স্বপ্ন বুনেছিলেন তিনি। স্বপ্নের অজানা কথাটি তিনি রেখেছিলেন হৃদয়ের মনিকোটায়। তবে এখনই বন্ধুমহলে ইচ্ছেটা প্রকাশ না করলেও ঠিকই লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন ব্যক্তিগত ডায়েরীতে। কিন্তু রাক্ষুসে মাতামুহুরী নদী কেড়ে নিলো তার সেই স্বপ্ন। থমকে গেছে জীবনের পথচলা। ১৩ জুলাই শনিবার বিকালে মাতামুহুরী নদীর চোরাবালিতে আটকে মারা যাওয়া অন্য পাঁচ বন্ধুর মধ্যে ছিলো এমশাদ।
গতকাল সোমবার সকালে পরিবার সদস্যরা মেধাবী এমশাদের শোভারঘরে বইয়ের টেবিল গুছাতে গিয়ে হঠাৎ দেখতে পায় একটি ডায়েরী। পরে ডায়েরীর পাতা উল্টোতেই চোখে পড়ে এমশাদের হাতের লেখা একটি চিঠি। সেই চিঠিটি ছিলো মুলত স্কুলের সহপাঠি বন্ধুদের উদ্যোশে। হইতো এমশাদের মনে জানা হয়ে গিয়েছিলো সুন্দর পৃথিবীতে সে আর বেশি দিন বেঁেচ থাকবেনা। পরিবার সদস্যদের হাতঘুরে এমশাদের লেখা সেই চিঠিটি গতকাল দিনভর ফেসবুকে ভাইরাল হয়ে পড়ে। চিঠি পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন এমশাদের চাচা জমির হোসেন। কি ছিলো সেই চিঠিতে…
ব্যক্তিগত ডায়েরীতে এমশাদ বন্ধুদের উদ্যোশে লিখেছেন…‘জানিনা আর কত দিন আছে। হয়ত আর আজ আছি কাল নেই। তবু যতদিন বাঁচব তোদের সবাইকে সাথে নিয়ে বাঁচব। জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ১২টি বছর তোদের সাথে আছি। হয়ত আর দেখা হবেনা। কিন্তু আমি তোদের কোন দিন ভুলব না। এসএসসি’র পরও তোদের সাথে যোগাযোগ থাকবে। তোরাও আমার সাথে যোগাযোগ রাখিস। তা না হলে খুব একা হয়ে যাবো।
ছেলেদের মধ্যে প্রথম বেঞ্চর চারজন আমার ইড়ু ভৎরবহফ, আর এরৎষ ভৎরবহফ এর মধ্যে রিতু। কোথাও চলে গেলে যাই হোক না কেন যোগাযোগ বন্ধ রাখিস না। ১২ বছর তোদের সাথে অনেক ঝগড়া করেছি। খুব মজা পাইছি। ১২ বছর তোদের সাথে খুব সুন্দর ভাবে কাটিয়েছি। এই সুন্দর মুহুত্বগুলো আমার জীবনে আর আসবে না। আমি নিয়মিত নামাজ ও কুরান পড়ি। আর চেষ্টা করব ধরে রাখার জন্য। ং.ং.প পর তোদের জন্য একটা ইরৎঃযফধু ঃৎরঃব থাকবে চিন্তা করিস না’।
জানা গেছে, চকরিয়া শহরের অভিজাত মার্কেট আনোয়ার শপিং কমপ্লেক্সের মালিক আলহাজ্ব আনোয়ার হোসেন। তাঁর সংসারে দুই ছেলে-এক মেয়ে সন্তন ছিলো। দুই ছেলেই লেখাপড়ায় ভাল হওয়াই তাদেরকে নিয়ে স্বপ্œও ছিলো বেশি। দুই ছেলে খুবই মেধাবী। বড় ছেলে এমশাদ পিএসসি ও জেএসসিতে বৃত্তি পেয়েছিলো। ছোট ছেলে মেহেরাবও পিএসসিতে বৃত্তি পেয়েছে।
চলতি বছরের এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে বড় মেয়ে। পরীক্ষাই পাস হলেই উচ্চ শিক্ষার জন্য চট্টগ্রাম শহরে থেকে লেখাপড়া চালিয়ে যেতে ফ্ল্যাটও কিনেছেন তিনি। আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহে ওই ফ্ল্যাটে উঠার কথা ছিলো আনোয়ার হোসেনের পরিবারের। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস তার সে স্বপ্ন স্বপ্নই রয়ে গেলো। ফ্ল্যাটে উঠার আগেই পৃথিবী থেকে বিদায় নিলো তার দুই আদরের সন্তান মেধাবী ছাত্র এমশাদ ও মেহেরাব।
এদিকে, চকরিয়া গ্রামার স্কুলের ৫ জন মেধাবী শিক্ষার্থীর অকাল মৃত্যুতে স্কুলের পক্ষ থেকে চারদিনের কর্মসূচী ঘোষণা করা হয়েছে। স্কুল পরিচালনা কমিটি ও শিক্ষকদের সমন্বয়ে কমিটির সভাপতি অধ্যাপক রুহুল আমিন ও সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক হারুনুর রশিদ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। কর্মসূচীর মধ্যে রয়েছে- সোমবার ১৬ জুলাই পূর্ণদিবস বিদ্যালয় বন্ধ। ১৭,১৮ ও ১৯ জুলাই পবিত্র কোরআনখানী, কালো পতাকা উত্তোলন, বিদ্যালয়ের পতাকা অর্ধনমিত করণ, কালো ব্যাজ ধারণ, ১ম ক্লাসের পর দ্বিতীয় ও তৃতীয় ক্লাসে ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে পৃথকভাবে দোয়া ও মোনাজাত অনুষ্ঠিত হবে।
অপরদিকে, গতকাল সোমবার চকরিয়া উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে উপজেলা পরিষদ মিলনায়তন মোহনায় পাঁচ স্কুল ছাত্রের অকাল মৃত্যুতে খতমে কোরআন, মিলাদ ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করেছে। আয়োজনে সার্বিক তত্তাবধানে ছিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নুরউদ্দিন মুহাম্মদ শিবলী নোমান।
শনিবার বিকাল ৩টার দিকে মাতামুহুরীর নদীর চোরাবালিতে আটকে চকরিয়া গ্রামার স্কুলের দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থী সাঈদ জাওয়াদ অরভি (১৫), দুই ভাই দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থী আমিরুল হোসেন এমশাদ (১৮) ও অস্টম শ্রেণীতে পড়ুয়া আফতাব হোসেন মেহরাব (১৪) , দশম শ্রেণীতে পড়ুয়া তূর্ণ ভট্টাচার্য্য ও একই শ্রেণীর শিক্ষার্থী ফারহান বিন শওকত (১৫) পাঁচ ছাত্র নিখোঁজ হয়। ওইদিন উপজেলা প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস, ডুবুরীদল ও স্থানীয় লোকজন বিকাল সাড়ে ৩টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে মাতামুহুরী নদীর তলদেশ থেকে তাদের মরদেহ উদ্ধার করে।