সিলেটে আজাদ-রণজিতের দ্বন্দ্ব : লাশ পড়ে কর্মীদের

image-5393-1515642005.jpg

৪ ছাত্রলীগ নেতাকর্মী ও ১ ব্যবসায়ী খুন * খুনিরা দুই নেতার শেল্টারে
:
সিলেটের ‘কিলিং জোন’ টিলাগড়ের কিলারদের হাতে একের পর এক খুনের নেপথ্যে আলোচিত হচ্ছে দু’জন নেতার নাম। তারা হচ্ছেন- আজাদুর রহমান আজাদ ও অ্যাডভোকেট রণজিৎ সরকার। এরমধ্যে আজাদ মহানগর আওয়ামী লীগের শিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক ও সিটি কাউন্সিলর। রণজিৎ জেলা আওয়ামী লীগের যুব ও ক্রীড়াবিষয়ক সম্পাদক এবং সিলেট জেলা বারের আইনজীবী। আগামীতে আজাদ সিটি মেয়র পদে ও রণজিৎ এমপি প্রার্থী হিসেবে প্রার্থী হতে তৎপর রয়েছেন।

ছাত্ররাজনীতিতে তাদের দু’জন ঘনিষ্ঠ বন্ধু হলেও এখন আধিপত্যের লড়াইয়ে একে অন্যের ঘোর প্রতিপক্ষ। সময়ের ব্যবধানে আজাদ গ্রুপ ও রনজিৎ গ্রুপের রয়েছে একাধিক উপ-গ্রুপও। আজাদ অনুসারী হিসেবে রয়েছে চারটি গ্রুপ। আর রনজিৎ অনুসারী হিসেবে রয়েছে পাঁচটি।

এগুলোর একেকটি গ্রুপের নেতৃত্বে রয়েছেন একেকজন বিশ্বস্ত নেতা। তাদের আবার প্রত্যেকের রয়েছে বিভিন্ন উপ-গ্রুপ। এ দুই নেতার আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে এ পর্যন্ত মেধাবী শিক্ষার্থীসহ বলি হয়েছেন ৭ জন।

এরমধ্যে খুনের পাল্লাা ভারি রণজিৎ বলয়ে, খুনির সংখ্যা বেশি আজাদ বলয়ে। খুন ছাড়াও চুরি, ছিনতাই, দখল, চাঁদাবাজি, হামলা, অগ্নিসংযোগসহ এন্তার অভিযোগ রয়েছে টিলাগড় কেন্দ্রিক ছাত্ররাজনীতির ক্যাডারদের বিরুদ্ধে। উভয় বলয়ের শতাধিক নেতাকর্মী এমন অপরাধে দায়ের করা মামলার আসামি। অভিযোগ রয়েছে, বলয়ের শীর্ষ নেতাদের শেল্টারের কারণে একাধিক মামলার গ্রেফতারি পরোয়ানার আসামি হয়েও তারা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ায় নগরীতে। শুধু ঘুরে বেড়ানোই নয়, একের পর এক অপরাধ-অপকর্ম সংঘটিত করেই চলেছে। কখনও গ্রেফতার হলেও দ্রুত বেরিয়ে আসে জামিনে। ফলে ‘কিলিং জোন’ টিলাগড়কে কেন্দ্র করে জনমনে আতঙ্ক ক্রমেই বাড়ছে।

এমন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে কথা বলতে আজাদুর রহমান আজাদের ব্যক্তিগত দুটি মোবাইল নাম্বারে দফায় দফায় কল করলেও বন্ধ পাওয়া যায়। মোবাইলে ক্ষুদে বার্তা পাঠালেও তিনি সাড়া দেননি।

একই অভিযোগের ব্যাপারে কথা বলতে রণজিৎ সরকারের মোবাইলে কল করলে তিনি রিসিভ করে বলেন, ‘এ ব্যাপারে আমি কোনো বক্তব্য দিতে রাজি নই। আমি সিলেটেও নেই আমার নির্বাচনী এলাকায় আছি।’

রণজিৎ সরকারের সেকেন্ড ইন কমান্ড, বিলুপ্ত ঘোষিত জেলা ছাত্রলীগের যুগ্ম-সম্পাদক সঞ্জয় চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, আমাদের বলয়ের বিরুদ্ধে খুনের কোনো অভিযোগই নেই। অথচ ৪ মাসে আমাদের বলয়ের দু’জনসহ ৩ জনকে খুন করা হয়েছে। আমাদের প্রতিপক্ষ বলয়ের শীর্ষ নেপথ্য নায়করা এসব হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী।

তিনি বলেন, তাদের ক্ষমতা ও প্রভাবের কারণে পুলিশ প্রশাসন নির্বিকার। অভিভাবক সংগঠন আওয়ামী লীগের নেতারাও উদাসীন। তারা খুনের নেপথ্য নায়কদের ব্যাপারেও কিছুই বলছেন না। এমনকি খুন হওয়ার পর লাশ দেখতেও যান না। এমতাবস্থায় যেসব শিক্ষার্থী ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে জড়িত তারা জীবন নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন।

সঞ্জয়ের দাবি, প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দিনে ক্যাম্পাসে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে। সেদিন আমাদের প্রতিপক্ষ ছাত্রদলের একজন অস্ত্রধারীকে ভাড়া করে ক্যাম্পাসে নিয়ে এসেছিল। তবে তামিম খান খুনের ঘটনা পরিকল্পিত। টিলাগড় এলাকায় বাসা-বাড়ি-ভূমি দখলের কথা অস্বীকার করেন সঞ্জয়।

এ ব্যাপারে কথা বলতে আজাদ বলয়ের সেকেন্ড ইন কমান্ড ও বিলুপ্ত ঘোষিত জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক রায়হান চৌধুরীকে কল করলে তার মোবাইল বন্ধ পাওয়া যায়। একই বলয়ের অন্যতম শীর্ষ নেতা মহানগর যুবলীগের যুগ্ম-আহ্বায়ক মুশফিক জায়গীরদারকে কল করলে তার মোবাইলও বন্ধ পাওয়া যায়।

ছাত্রলীগে খুনোখুনির ব্যাপারে অভিভাবক সংগঠন আওয়ামী লীগের ভূমিকা সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি বদর উদ্দিন আহমদ কামরান যুগান্তরকে বলেন, ‘আমরা দায়িত্বহীন এমন অভিযোগ সঠিক নয়। হত্যা, খুনের মতো অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা বন্ধ নিয়ে আমরা দফায় দফায় বৈঠক করেছি। বিষয়টি কেন্দ্রকেও জানানো হয়েছে। আমরা আবার বসব।’ হত্যার দায় কে নেবে? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটা আইনের ব্যাপার, পুলিশ দায়ীদের খুঁজে বের করবে।

জেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক শফিকুর রহমান চৌধুরী বলেন, ছাত্ররাজনীতির নামে হত্যা-খুনের ঘটনা দুঃখজনক। আমরা এসব বন্ধে অতীতে বারবার উদ্যোগ নিয়েছি। শিগগির জেলা ও মহানগর নেতারা বসব। হত্যার দায় কে নেবে? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, হত্যার ঘটনায় যারা দায়ী দায়িত্ব নিতে হবে তাদেরকেই।

বলয় বৃদ্ধির পাশাপাশি আজাদ-রণজিৎ অনুসারীদের আধিপত্যের দ্বন্দ্বে খুন হয়েছেন ছাত্রলীগ কর্মী উদয়েন্দু সিংহ পলাশ, জাকারিয়া মোহাম্মদ মাসুম, ওমর আহমদ মিয়াদ ও সর্বশেষ তানিম খান প্রাণ হারিয়েছেন। এরমধ্যে পলাশ, মিয়াদ ও তানিম রণজিৎ অনুসারী। মাসুম যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আনোয়ারুজ্জামানের অনুসারী। মিয়াদ, মাসুম ও তানিম আজাদ অনুসারীদের হাতে খুন হয়েছেন। শুধু পলাশ আজাদ অনুসারীদের নিজেদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে খুন হয়েছে।

এছাড়া জিন্দাবাজারের তরুণ ব্যবসায়ী করিম বক্স মামুন হত্যাকাণ্ডে জড়িত মূল হোতা বলে চিহ্নিত সিলেট জেলা ছাত্রলীগের তৎকালীন সহ-সভাপতি সুলেমান হোসেন চৌধুরীকে ঘটনার পর পরই আজীবনের জন্য বহিষ্কার করে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ। সুলেমান হোসেনও ছিলেন আজাদ অনুসারী। এসব হত্যাকাণ্ডের ঘটনার মামলায় দলীয় প্রভাবের কারণে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি না থাকায় বারবারই রক্তে রঞ্জিত হয় পুণ্যভূমির মাটি।