প্রবাস সমাচার জাপান থেকে “যে ভাবনাগুলো রীতিমত ভাবায় ”

Sirajul.jpg

সিরাজুল কাদের :: আমি আশ্চর্য্যান্বিত হয় যখন তানযীমুল উন্মাহ হিফজ মাদ্রাসাতে ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ুয়া ছাত্র সাংবাদিক পুত্র ইয়াসিন আরাফাতের ৮৬ দিনে কুরআনে হাফেজ হওয়ার বিস্ময়কর এবং আলোড়ন সৃষ্টিকারী দৃষ্টান্ত আমাদের নব প্রজন্মের কচিকাঁচা শিশুদের মনে বিশ্ব জয়ের উদ্দাম ও অপ্রতিরোধ্য পথ চলার দিক নিদের্শনামূলক অনুপ্রেরনা ও উৎসাহ জোগায়!
আমি আরো আশ্চর্যান্বিত হয় যখন চলতি বছরে নাসার আইআরএডি কর্মসূচির আওতায় প্রযুক্তি উদ্ভাবনে অনবদ্য ভূমিকা রাখার জন্য অদম্য এবং অনন্য মেধাতে ভরপুর বাংলা মায়ের রত্ন উদীয়মান বিজ্ঞানী মাহমুদা সুলতানা ‘আইআরএডি ইনোভেটর অব দ্য ইয়ার’ পুরস্কার জিতে লাল সবুজের পতাকাকে সম্মানের উচ্চমাত্রায় পতপত করে উড়াই। তখন মাহমুদারা বিশ্বের নারী রুল মডেলে পরিণত হয় আর পাপারাজ্জিরা তাদের নিয়ে রীতিমত গবেষনায় মত্ত হয়ে নাসার কাটিং এজে লেখা প্রচ্ছদ নিয়ে রীতিমত হুমডি খেয়ে পড়ে। আর এ দেখে দেশে-বিদেশে জ্ঞানান্বেষনে ছডিয়ে পড়া আমার দেশের স্বপ্নচারী তরুন তরুনীরা নব উদ্যামে নতুন আংগিকে জ্ঞানের তাবৎ শাখায় ধরাকে জয় করার চ্যালঞ্জিং স্বপ্নগুলোকে আলিঙ্গন করতে দেখে।
আমি গৌরবান্বিত হয়:
তাল তমাল শোভিত সবুজের আস্তরনে আচ্ছাদিত অপূর্ব নৈসর্গিক প্রকৃতির নান্দনিকতায় বেড়ে উঠা বাংলার সন্তানেরা নিজ ও দেশের সমৃদ্ধির লক্ষ্যে আপন প্রিয় মাতৃভূমি ছেড়ে পৃথিবীব্যাপী ছড়িয়ে পড়া দেখে। হ্যাঁ! বলছিলাম আমার প্রিয়তম রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের কথা। বিশ্বব্যাপী বর্তমানে এক কোটি দশ লক্ষ আমার বাংলাদেশী ভাই- বোনেরা চ্যালেন্জীং প্রবাস জীবনকে আলিঙ্গন করে বসুন্ধরাকে সিক্ত করেছে। আজ অস্তিতিশীল বিশ্ব প্রতিযোগীতামূলক অর্থনীতির বাজারে এই রেমিট্যান্স যোদ্ধারা প্রতি বছর পনের বিলিয়ন ডলারের অধিক রেমিট্যান্স পাঠিয়ে আমাদের জাতীয় অর্থনীতির চাকা স্থিতিশীলাবস্থায় সচল রেখেছে। এই রেমিট্যান্স প্রবাহের কারনে কোন ধরনের আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক বিপর্যয় আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে বিরুপ প্রভাব বিস্তার করতে পারেনা। ফলশ্রুতিতে আমরা রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ সহ অনেক মেগা প্রজেক্ট সম্বলিত জাতির লালিত স্বপ্ন কে বাস্তবে পরিণত করতে সক্ষম হচ্ছি। এক সময় জনসংখ্যাধিখ্যাতার কারনে বাংলাদেশ নিয়ে পৃথিবী ব্যাপী এক উদ্বিগ্নতা বিরাজ করেছিল এই ক্ষুদ্রায়তনের দেশ কিভাবে চলমান জনসংখ্যার বিস্ফোরণ মোকাবিলা করবে। আল্লাহ তা’আলার কি অশেষ কৃপা আজ ধরনীর এমন কোন দেশ নেয় যেখানে বাংলাদেশী রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের পদচারণা নেয়। মহাদেশীয় দৃষ্টিকোন থেকে এশিয়া, ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া/ ওশেনিয়া ও আফ্রিকাতে থরথর করে বেড়ে উঠা অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সমৃদ্ধিতে আমার দেশের দামাল ছেলেদের শিক্ষা, পরিশ্রম ও দক্ষতার সমন্বয় এক তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে যা পৃথিবী ব্যাপী স্বীকৃত। আমি জাপানের এখানে প্রত্যক্ষ করেছি স্টুডেন্ট ভিসায় আসা ছাত্রদের দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রম। সকাল সাত ঘটিকা থেকে বিকাল পাঁচ ঘটিকা পর্য্যন্ত স্কুল বা কলেজের ক্লাস সেরে এক ঘন্টা বা দু’ঘন্টা বিরতি এর পরক্ষনেই রাত এগারোটা বা বারোটা অবদি পার্ট টাইম জব । এরপর নিজের খাবার তৈরী সহ আনুষঙ্গিক অনেক কাজের চাপে জীবনের পথ চলা যেন রোবট তুল্য যাণ্ত্রিকতায় রূপ ধারন করেছে। উল্লেখ্য এখানে কঠিন সময়ানুবর্তিতা মেনে চলতে হয় এর বাত্যয় ঘটলে সমুহ অনেক অপ্রত্যাশিত সমস্যার সম্মূখীন হতে হয় যা প্রবাস জীবনের বন্ধুর যাত্রাকে আরো দুর্বিষহ করে তোলে। এ রকম এবং এর চেয়ে ঝুঁকিপূর্ন আরো কত অগনিত জীবনধর্মী গল্পের মূল চরিত্রের ভূমিকায় প্রবাসী ভাই বোনেরা অবতীর্ণ হয়েছে তার ইয়ত্তা নাই। তবে সরজমিনে দেখা এবং বিভিন্ন মিডিয়া থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী দৃষ্টান্তমূলক এবং অনুপ্রেরনাদায়ক বিষয় হচ্ছে আমার প্রবাসী ভাই বোনেরা যে কোন ধরনের বিরূপ পরিস্থিতিতে ইস্পাত কঠিন ধৈর্য্য এবং যুদ্ধ জয়ী বীরদের মত সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে নিজের অবস্থান সমৃদ্ধ করে তোলে।
আমার আস্থার পারদ উর্ধ্বমূখী হয়:
যখন বিশ্বব্যপী “মেইড ইন বাংলাদেশ” ব্রান্ড এর অভিযাত্রিক সেনানী বংগ ললনাদের সুদক্ষ হস্তের সুনিপুণ বুননে তৈরী পোষাক বিভিন্ন বিখ্যাত কোম্পানীর শোরুমে দেখি। বুকটা গর্বে উপর দিকে ফুলে উঠে, কেমন জানি ভিতর থেকে অদৃশ্য শিহরন জানান দেয় প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে আমার মাতৃসম স্বভূমি ক্রীডনকের ভূমিকায় অবতীর্ণ! যখন থেকে আধো আধো ধরার পরিবেশকে দেখতে ও জানতে শেখলাম বিভিন্ন শখের মধ্যে নতুন, রুচিসম্মত এবং পরিচ্ছন্ন কাপড়ের প্রতি দুর্বলতা একটি শখে পরিণত হয় যা আমার সমসাময়িক স্বজন ও পারিবারিকভাবে ওয়াকিফহাল, এর সূত্র ধরে যেহেতু কর্ম ক্ষেত্র জাপান সে হিসেবে জাপানের বিভিন্ন ব্রান্ডের গার্মেন্টস ওয়্যার শপে যাওয়ার সুযোগ হয়েছে, উল্লেখ্য দুনিয়ার সকল নামীদামী ব্রান্ডের শপ গুলোর সরব উপস্থিতি এখানে লক্ষ্যনীয়। যেখানেই গেছি সবব্রান্ডের গার্মেন্টস ওয়্যার শপ যেমন: জারা, এইচ এন্ড এম, গুচ্চি, গ্যাপ, ডিজেল ইত্যাদিসহ জাপানের সর্বাধিক জনপ্রিয় এবং বিক্রীত গার্মেন্টস ওয়্যার শপ ইউনিক্লো এবং জি ইউ তে “মেইড ইন বাংলাদেশ” ব্রান্ডের এক রমরমা অবস্থা এখানে মজার ব্যাপার হচ্ছে একই শপে কিন্তু চাইনা, ইন্দোনশিয়া, ভিয়েতনাম এবং কাম্বোডিয়া মেইড তৈরী পোশাক ও বিক্রীত হয় কিন্তু গুনগত মান ও কারিগরি দক্ষতা আমার মা বোনদের হস্তে তৈরী পোশাকের প্রতি জাপানীদের আকর্ষন দুনির্বার যে কারনে এ ক্ষেত্রে আমার দেশ অন্য সব দেশকে ছাপিয়ে গেছে! আমার পর্যবেক্ষনে মনে হয় এবং যা দৃশ্যত: ইউরোপ আমেরিকার মত জাপানেও এমন কোন ঘর অবশিষ্ট নেয় যেখানে “মেইড ইন বাংলাদেশ” পৌঁছায়নি। আজ তৈরি পোশাক শিল্প সাড়ে ২২ লাখ নারী শ্রমিকের জীবনযাত্রার লক্ষণীয় পরিবর্তন সাধন করেছে এবং তারা অর্থনীতিতে অবদান রাখছে। শ্রমজীবী নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন পরিবারে তাদের অবস্থানের পরিবর্তন আনয়নে সক্ষম হয়েছে, আর্থিক সক্ষমতা অর্জনের কারণে এসব নারী শ্রমিকের সামাজিক মর্যাদাও বৃদ্ধি পেয়েছে। যে নারীর জীবন ছিল মূল্যহীন, গার্মেন্টস শিল্প তাদের বেঁচে থাকার পথে আশার সঞ্চার করে চলেছে। চাকরির সুবিধাদি ভোগকারী বাবা, ভাই এবং স্বামীর ঐতিহ্যগত পিতৃতান্ত্রিক কর্তৃত্বের ক্ষেত্রে পরিবর্তন সাধন করেছে। অধিকাংশ শ্রমজীবী নারী এখন বিয়ে এবং সন্তান ধারণের ক্ষেত্রে নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী সিদ্ধান্তের কথা বলতে পারে। তারা পরিবারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও অংশগ্রহণ করতে পারছে। সমাজে বাল্যবিবাহের সংখ্যা কমেছে, সেই সাথে হ্রাস পেয়েছে জন্মহার। শ্রমজীবী মেয়েরা তাদের ছোট ছোট ভাইবোনদের যত্ন নিচ্ছে এবং স্কুলে পাঠাচ্ছে। ফলে দেশে স্বাক্ষরতার হার বৃদ্ধি পাচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, তৈরি পোশাক শিল্পখাতের সম্প্রসারণ নতুন উদ্যোক্তাদল সৃষ্টি করছে যারা উৎপাদনের ক্ষেত্রে শক্তিশালী বেসরকারি খাত গড়ে তুলেছে। এই উদ্যোক্তাদের একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী। বর্তমানে তৈরি পোশাক কারখানায় অনেক নারী ঊর্ধ্বতন নির্বাহী পদে অধিষ্ঠিত। স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তিতে পোশাক রফতানি থেকে ৫০ বিলিয়ন ডলার আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে বিজিএমইএ। আশা রাখি এবং বিশ্বাস করি আমরা লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সক্ষম হব।
সম্মানিত পাঠকবৃন্দ লেখার পরিসর বড় হওয়ার উপক্রম দেখে লেখা সংক্ষিপ্ত করার চেষ্টা করছি।
আমি উদ্বেলিত হয়ে উপলদ্ধি করি :
লেখার শুরুতে আমি একজন মেধাবী ছাত্র এবং কৃতিত্বতায় ভরপুর, বাংলার রত্নাগর্ভা জননীর এক উদীয়মান বিজ্ঞানীর বর্ণনা দিয়ে শুরু করেছিলাম এখন এই পর্যায়ে এসে যা উপলব্ধি করি, এখন ও কি আমার সমাজ- দেশ আরো বিক্ষিপ্তভাবে ছডিয়ে থাকা অগনিত ইয়াসিন এবং মাহমুদাদের পরিচর্যা করতে সক্ষম হয়েছে কিনা? সরল উত্তর না! কিন্তু এদেশটাকে উচ্চমার্গীয় মার্যাদায় অধিষ্ঠিত করতে গেলে ইয়াসিন, মাহমুদাদের পরিচর্যার বিকল্প নেই, প্রশ্ন আসতে পারে রাষ্ট্র, সরকার এবং সংশ্লিষ্টরা না করলে আমাদের করার কি আছে ইত্যাদি ইত্যাদি… ভাবনা যা দেশকে নিয়ে হতাশার এক মহাকাব্য রচনা করতে সচেষ্ট করে। যখন এই অনিন্দ্য সুন্দর ধরাকে নিয়ে ভাবী, দৃশ্যত: তিলে তিলে গড়া এ পৃথিবী নামক প্লানেটটি আপন সৌর্য্যবীর্যে সুন্দরের বাতাবরণে বিদ্যমান। পৃথিবী তার আপন স্বরুপে আজোবদি সভ্যতার বহুমাত্রিক উন্নয়নের সিঁড়ির যেখানে এসে পৌঁছেছে তার একটি কণা ও কিন্তু হতাশা থেকে তৈরী হয়নি সর্বৈব যেন অগনিত আশার সৌরভ ছড়ানো মাল্ণছ। তাই নববর্ষের সূচনালগ্নে অংগীকার করি যে যে যার যার অবস্থান থেকে মাহমুদা এবং ইয়াছিনদের খুঁজে বের করে পরিচর্যা করি, নিজে না পারলে সক্ষম সুধীজনদের দিয়ে হলেও পরিচর্যার উদ্যোগ নিই, ছোট ছোট এই উদ্যোগ একদিকে যেমন আমাদের সামাজিক বন্ধনকে দৃঢ করবে অন্যদিকে অনাগত ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে আমাদের ইয়াসিন, মাহমুদাদের পদচারনায় দেশ এবং পৃথিবী তার গতিপথ নির্ধারণ করবে। সর্বোপরি, আমরা এখন থেকে যদি সজাগ হয় আমার দেশ ও আগামী প্রজন্মও বসুন্ধরার উন্নয়নে দিকপালের আসনে আসীন হবে। কেননা বাংলা জননীর সন্তান সন্ততিরা চলমান বিশ্বউন্নয়নের মহি সোপানে সর্বব্যপী দাবড়িয়ে বেড়ানো শুরু করে দিয়েছে যার সংখ্যা ডেমোগ্রাফিক ফিগারে ক্রমান্বয়ে উর্ধ্বমূখী..
ব্যক্তি ও সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা যা তাড়া করে:
বলছিলাম রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের কথা যাদের জন্য হাল আমলে নতুন প্রবাদ বাক্যের প্রচলন হয়েছে” যে দেশে যায় সে দেশের বিদেশী আর নিজ দেশের প্রবাসী” গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় এরা হচ্ছে ভংগুর অনিশ্চিত অস্তিত্ব সংকটের ভেঁডাজালে দন্ডায়মান এক জনগোষ্ঠী যাদের সর্বকূলই শ্বাপদ সংকুল। দেশে কর্মক্ষেত্রের অপ্রতুলতা অথবা বর্তমানের চেয়ে অধিক অর্থনৈতিক স্বাবলম্বীতার কথা ভেবে দেশমাতৃকার সেবার মানসে প্রবাসীরা প্রথমে বিদেশে পাডি জমায়। বিদেশের মাটিতে হাডভাংগা পরিশ্রম করে জীবন এবং যৌবনের মোক্ষম সময় গুলে কেটে দেয় যার ফলস্বরুপ দেশ তার রিজার্ভ ফান্ড যথাযথ রাখতে সক্ষম হয় সংগত কারনে দেশীয় অর্থনীতির চাকা সচল হয় যা প্রবাসী ভাই বোনেরাও একান্তভাবে চায়। সমস্যা এখানে হয় যখন আমার প্রবাসী ভাই নির্মাণ শ্রমিকের কাজ করতে গিয়ে ২৫তলা বা আরো অধিক তলা থেকে পড়ে গিয়ে আপাদমস্তক এক বীভৎস রুপ ধারন করে সলিল সমাধি হয় তখন আমার দেশের দূতাবাসের কর্মকর্তাদের ভূমিকা দেখে মনে হয় আমরা যেন আরেক নব্য রোহিংগা জনগোষ্টী, বিপদ আপদে উনাদের ঐখানে গেলে শুরু হয় আমলাতাণ্ত্রিক দীর্ঘসূত্রিতার এক জঘন্যতম অধ্যায়। প্রবাসী ভাইদের জিজ্ঞেস করলে আমার চেয়ে সাবলীল এবং সুনিপুণ বর্ণনা পারংগম করতে সক্ষম হবেন বলে আশা রাখি। প্রবাসীভাইদের এক রাতের স্বজন থেকে দূরে থাকার আহাজারী যেন আরব্যরজনীর হাজার বছরের এক একটি রাত। এদিকে প্রবাসীদের সরলতা নিয়ে শুরু হয় হরদম বহুমূখী প্রতারনা, দেখা গেল টাকা পয়সা কামিয়ে চাচা, ভাই, ভাতিজাও স্ত্রীদের নামে প্রবাসী গো বেচারা টাকা পাঠাতেই থাকল।স্বজনদের দেয়া প্রলোভন যেখানে অনেক কিছু থাকে: যেমন তোমার নামে এত শতাংশ জমি কিনেছি, সুন্দর লোকেশনে দোকান কিনেছি, আয় ইনকামের জন্য গাড়ি কিনেছি ইত্যাদি ইত্যাদি… শেষে বুকভরা আশা নিয়ে দেশে আসার পর দেখে সব কিনেছে এবং সুন্দরভাবে কিনেছে কিন্তু প্রবাসীর নামে নয় নিজের নামে! এরপরের পরিস্থিতি আশারাখি পাঠকদের কাছে অনূমেয়। আরেক প্রবাসী দেখা গেল সে তার জীবনের সমস্ত পুঁজির একত্র করে কোন এক স্পটে জায়গা কিনল বাড়ি বা অন্য চাহিদামাফিক অবকাঠামো তৈরীর জন্য; লেনদেন সব সম্পন্ন করে অবকাঠামো তৈরীর জন্য মিলাদ, দোয়া সম্পন্ন করে কাজ শুরু করে দিল, বিনামেঘে বজ্রপাতের মত বলা নেই কওয়া নেই ফিল্ম স্টাইলে একটা গ্যাংস্স্টার টাইপের ৮-১০ জনের দল এসেমিস্ত্রী ও নির্মাণ কাজে নিযুক্ত দিন মজুরদের উপর অকাট্য গালিগালাজ সহ মৃত্যুর হুমকি দিয়ে বলল সব কর্মকান্ড বন্ধ কর এবং কালকের ভিতর অমুক জায়গায় এই পরিমান টাকা পৌছেঁ দিতে বলবা, আরো উল্লেখ করে গেল বেশী চালাকির চেষ্টা করলে সমূহ জীবন ঝুঁকির সম্ভবনা সহ ইত্যাদি ইত্যাদি পরের ঘটনা প্রবাহ কোন দিকে মোড় নেয় আশা রাখি সম্মানিত পাঠক আমার চেয়ে বেশী ওয়াকিফহাল। এই অপ্রত্যাশিত হুমকি এবং বড় অংকের টাকার ফরমায়েশ পেয়ে তো প্রবাসী গো বেচারার চক্ষু তো চড়ক গাছ; রীতিমত চোখে শর্ষে ফুল ছাড়া গত্যন্তর নেই। এরপর বিভিন্ন ঘটনা চক্রে এ অসহায় প্রবাসীর স্বপ্ন হতাশার বালিয়াডিতে হাতরাতে হাতরাতে অক্কা পায়। দোষ কার? ব্যক্তি, সমাজ না রাষ্ট্র?
এরপরে মরার ঊপর খাড়ার ঘা’র মত ঐ প্রবাসীর স্ত্রীর প্রতি সমাজের উচ্ছৃঙ্খল যুবক বা কিশোরদের ক্রমাগত উত্যক্ততা, চোখ রাংগানী সহ চরিত্র হননের শর্তমূলক বিভিন্ন হুমকি । অন্যদিকে প্রবাসী স্বামীর সাথে ফোনের কথোপকথনে ঘটে যাওয়া মান অভিমানকে মেনে না নিয়ে অ প্রাসঙ্গিক যুক্তি রচনা করে পরকীয়ায লিপ্ত হয়ে দু’ তিন সন্তানের জননীর পলায়ন যেন খবরের কাগজের নিত্যনৈমত্তিক শিরোনামে পরিণত হয়েছে এছাড়া ও আরো কত বিচিত্র ঘটনার শিকার প্রবাসীরা…! যদিও নিজেই প্রবাস জীবন করতেছি। উল্লেখ্য ইত্যকার পরিস্থিতি চলমান থাকলে তরল সোনা উৎপাদনকারী এই সরল জনগোষ্ঠী বিদেশের প্রতি আগ্রহ হারাবে যা আমার দেশের জন্য এক ধরনের এ্যালার্মিং! উপরোল্লেখিত বিষয়গুলো হয়ত আমরা জ্ঞাতসারে বা অজ্ঞাতসারে এড়িয়ে চলি কিন্তু সবাই উপলদ্ধি করি যখন দৈনিকের বহুল আলোচিত সংবাদে পরিনত হয়।
এমনিভাবে তৈরী পোশাক শিল্পে নিয়োজিত মা বোনদের প্রতি ও সামাজিকভাবে এবং গার্মেন্টস শিল্প মালিক কর্তৃক কিছু বৈষম্যমূলক আচরণ পরিলক্ষিত হয়; যদিও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বহুজাতিক কোম্পানীগুলো গার্মেন্টস শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার নিয়ে কাজ করছে যা এই জনগোষ্ঠীর জন্য সুখবরই বলা চলে। এরপরও সামাজিকভাবে কিছু ব্যক্তি বিশেষের তাদের প্রতি ডিগ্রডেশন মেন্টালিটি এখন অসহনীয় মাত্রায় পৌঁছেছে এবং এক ধরনের সামাজিক ব্যধিতে পরিণত হয়েছে। কথায় কথায় গার্মেন্টস এ চাকরি করে এদের আবার চরিত্র? এই জাতীয় আত্ম মার্যাদা হননকারী বিভিন্ন শ্রুতি কটু অশ্রাব্য উক্তি বা কথামালা।
তবু ও পেরে উঠব বলে আশা রাখি প্রেরণা, স্বপ্ন ও বিশ্বাস দিয়ে:
আর কতকাল এভাবে এডিয়ে চলা সামাজিক এই অসংগতি, সৃষ্টির সেরা সামাজিক জীবদের মনুষ্যত্বের একি এক অকাল অধ:পতন! প্রকৃতির ইকো-সিস্টেমের সাইকেল যদি একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় চলতে পারে; আমরাওতো এ প্রকৃতির এক মৌলিক অংশ আমরা পারবনা কেন? হতাশার কিছু নেই, সবই সম্ভব শুধুমাত্র সামাজিক এই অসংগতি, সমস্যা সংক্রান্ত উপসর্গ গুলোকে চিহ্নিত করে ইতিবাচক চিন্তার ফ্রেমে নিয়ে এসে সমস্যার প্রকৃতিনুযায়ী অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কৌশলগত পরিকল্পনার ভিত্তিতে সংশিষ্ট ব্যক্তি এবং সমাজকে ইন্টার এ্যাকশনের মাধ্যমে উজ্জিবীত করলে পর্য়ায়ক্রমে আবশ্যিক সুফল এবং চলমান সমাজিক দৃষ্টিভংগির উল্লেখযোগ্য নাটকীয় পরিবর্তন আসবে বলে আশা রাখি ।
পরিশেষ একটি বাস্তব ওঐতিহাসিক পট পরিবর্তনকারী গ্রীসের ঘটনার উল্লেখ করে লেখার ইতি টানব: আজকের এই সময় পর্য্যন্ত পৃথিবীতে আঠারোটি সভ্যতা এসেছে। তার মধ্যে সে সভ্যতাটি সবচাইতে আলোচিত এবং যার মাধ্যমে জ্ঞান-বিজ্ঞান, রাষ্ট্র, দর্শন, অর্থনীতি ও অন্যান্য নীতি শাস্ত্র পরিপূর্ণতা পেয়েছে সেটি হচ্ছে গ্রীক সভ্যতা। যাদের মাধ্যমে এই সভ্যতা উৎকর্ষতা ও বহুমাত্রিকতার সর্বোচ্চ জায়গায় পৌঁছেছিল এবং সম্পূর্নতা পেয়েছিল তারা হচ্ছে এথেন্সের কিছু মানুষ। এই এথেন্সের জনসংখ্যা ছিল সাড়ে চার লক্ষ তারমধ্যে আড়াই লক্ষ ছিল ক্রীতদাস যাদের না ছিল ভোটার অধিকার না ছিল কথা বলার অধিকার। আর বাকি থাকল দু’ লক্ষ তার মধ্যে অর্ধেক ছিল নারী; মিথ অনুযায়ী গ্রীকরা বিশ্বাস করত নারীদের আত্মা নেয় তাদের কথা কথা নয়। আর বাকী রইল এক লক্ষ তার মধ্যে শিশু-কিশোর অর্ধেক আর থাকে প্ঁণ্চাশ হাজার এই লোকগুলোই ছিল এই সভ্যতার মূল চালিকাশক্তি এবং তাঁরাই এই শ্রেষ্ট সভ্যতা তৈরী করেছিল! কি দিয়ে? প্রেরণা, স্বপ্ন ও বিশ্বাস দিয়ে । তারা বিশ্বাস করত,”আমরা পারবই, আমাদের দ্বারা হবেই”। পেরিক্লিস যখন এথেন্স শাসন করতেন তখন এথেন্সের ছেলেরা আঠারো বছরে উন্নীত হলে তাদের রাষ্ট্রীয় অনুষ্টানে গিয়ে সবার সামনে হাত উঁচিয়ে প্রতিজ্ঞা করতে হত এভাবেই “ আমি জন্মের সময় যে এথেন্স কে পেয়েছি, সারা জীবন এমন কাজ করে যাব যাতে করে মৃত্যুর সময় তার চাইতে অনেক উন্নততর এথেন্স কে
পৃথিবীর বুকে রেখে দিয়ে যেতে পারি”। এটাই হচ্ছে প্রেরণা, ঐ যে একবার জ্বলে উঠল একটা মানুষ; এ জ্বলা, মশাল হয়ে ঘুরতে থাকবে এবং এক সময় অবিশ্বাস্য কান্ড করবে।
আজকের নববর্ষের প্রারম্ভে আমরাও প্রেরণা,স্বপ্ন ও বিশ্বাসের আকরে প্রতিজ্ঞা করি, ইতিবাচক পরিবর্তনের মশাল জ্বালিয়ে অসম্ভব কান্ড ঘটিয়ে জন্মের সময় যেই বাংলাদেশ পেয়েছি; সবাই মিলে সারা জীবন এমন কাজ করে যাব যাতে করে মৃত্যুর সময় বর্তমানের চেয়ে অনেক উন্নততর বাংলাদেশেকে পৃথিবীর বুকে রেখে দিয়ে যেতে পারি।
মোবাইল নং: জাপান: ০০৮১৭০২৬৬৩৫৬৬০
বাংলাদেশ: ০১৮৭১৬০৩৬০৫
E-mail: [email protected]