বেদে জাত চিহ্ন মুছে যাচ্ছে!

josna_66635_1513509914.jpg

: ত্রি-ভুবনে মায়ের মতো আপন কেহ নাই, মা সব সময় নিজের শরীরের শেষ রক্ত বিন্দু দিয়ে সন্তানকে আগলে রাখেন। এমনি একজন মা হচ্ছেন বেদের মেয়ে জোসনা। এখন আর সাপ খেলা দেখান না জোসনা। বাড়ি বাড়ি গিয়ে দাঁতের পোকাও ঝাড়েন না। কোমর ব্যথা সারাতে দেন না কোনো গাছালো ওষুধ। পেটের ব্যথা আর আলগা অসুখ সারাতেও দেন না তাবিজ-কোবজ। ঝাড়-ফুঁক, দুমুঠো অন্ন যোগাতে ৬ মাসের শিশুসন্তান সোহাগীকে নিয়ে জোসনা এখন ঘুরে বেড়ায় শহরের অলিগলিতে।

রোদ-বৃষ্টির মধ্যে কখনও জোসনার দেখা মেলে ট্রাফিক সিগন্যালে, কখনও ফুটপাতে, কখনও অলিগলিতে। শহরের অলিগলিতে হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত শরীরে জোসনা যখন গাছের ছায়ায় বসে তখন মুহূর্তে তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে শৈবব, যৌবনের অনেক স্মৃতি। বাবার সঙ্গে জঙ্গলে গিয়ে সুরে সুরে বাঁশি বাজানো আর সাপ ধরার কথা। শৈববে অথৈ পানিতে দলবেঁধে সাতার কাটার কথা, বড় বাবুদের বাড়িতে সাপ খেলা দেখানোর কথা। সবই এখন অতীত। মুছে যাচ্ছে জাতচিহ্ন। আজ তাদের কোনো ঠিকানা নেই। তারা ঠিকানাহীন পথের মানুষ।

সারাদিন নিজের যতই কষ্ট হোক না কেন সোহাগীকে তিনি আগলে রাখেন পরম মমতায়। সোহাগীর গায়ে যেন এক ফোঁটা রোদও না লাগে, সেজন্য জোসানা শাড়ির আঁচল দিয়ে সোহাগীকে ছায়ায় রাখেন। শিশু সন্তানকে বড় ভালোবাসেন জোসনা। তাই নারী ছেঁড়া এই ধনের গায়ে যেন এক ফোঁটা আঁচড় না লাগে তার জন্য সবকিছু বিসর্জন দিতে প্রস্তুত এই বেদে নারী।

শত কষ্টের মাঝে সোহাগী যখন হাসে তখন হাসি ফোটে জোসনার মুখে। সন্তানের এই হাসি যেন কষ্টমাখা জীবনে পাওয়া একমাত্র সুখ।

নদী ভাঙনে জোসনা হারিয়েছে বসতভিটা। জোসনার বাবার নাম গহর বাইদ্যা আর মা হাজেরা বিবি। জোসনার মেয়ে সন্তান হওয়ায় স্বামী মজনু ওঝা দ্বিতীয় বিয়ে করে। বিয়ের পর কপাল পোড়ে জোসনার। জোসনা ও শিশু সন্তানের ভরণ-পোষণ বন্ধ করে দেয় স্বামী। বিক্রমপুরে শেকড়ের টান ছেড়ে জীবিকার সন্ধানে এসেছেন ঢাকায়। শহরের এসে প্রথমে জোসনার ঠাঁই হয় গাজীপুরের টঙ্গী ব্রিজের বস্তিতে। এখন থাকছেন নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায়। সপ্তাহে ৫ দিন জোসনা ঢাকার বিভিন্ন অলিগলিতে ঘুরে বেড়ান। নিজের কষ্টের কথা বলে মানুষের কাছে সাহায্য চান। সারাদিনের ঘোরাফেরার পর সন্ধ্যা হলে নারায়ণগঞ্জে ফিরে যান। আর যে দিন ফিরতে পারেন না, ওই দিন তেজগাঁওয়ের রেলস্টেশনে রাত কাটিয়ে দেন।

জোসনা জানান, দেশে এখন আর সেই আগের মতো নৌকার বহর নাই। বাইদ্যার ঘাট নাই। সাপও ধরা দেয় না। ওরা চালাক হইয়া গেছে। আর ঝাড়-ফুঁক মানুষ এহন আর বিশ্বাস করে না। দেশে কোনো কাম নাই; তাই এখন না খাইয়া মরার জো। এ জন্যি চইলা আইসি। মনে করছিলাম শহরে আইসা কাম পামু কিন্তু এহানেও দেখলাম একি অবস্থা।

বাইদ্যা বলে লোকে ঘেন্না করে, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্ল করে, মাইনসে কাজ দেবার চায় না, অপমান করে, গালি দেয়। এইডা কোনো জিনদিগি না। এহন আর নিজের জন্য কোনো চিন্তা করি না; বাচ্চাডার জন্য রাস্তায় নামছি। বলতে দুচোখে ভিজে আসে জোসনার।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে জোসনা জানায়, আল্লাহ যেন মাইসারে বাইদ্যা না বানায়। কি পাপ করছিলাম আল্লাহ বাইদ্যা বানায়ছে। মরণেও মুছবো না বাইদ্যা নাম। বলতে বলতে একটু পরপর শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখ মুছে এই মমতাময়ী মা।

এই বেদে নারী আরও জানান, শিশু সন্তানকে পড়ালেখা শেখানোর খুব ইচ্ছা, কিন্তু গরিব হওয়াতে তার সামর্থ্য নাই। শুধু জোসনা না, শহরের বিভিন্ন জায়গায় এখন দেখা মেলে এই বেদে নারীদের। কখনও একা আবার কখনও তারা ঘুরে বেড়ায় দলবেঁধে। পেশাগত আর জাতগত কারণে মানুষ এদের কাজ দিতে চায় না। তাই পেটের দায়ে ভিক্ষাবৃত্তিকে তারা শ্রেয় মনে করছে। কিন্তু এই বেদে জনগোষ্ঠীরাও মানুষ। তাদের বাঁচার অধিকার আছে। কিন্তু কেউ কি নেবে তাদের দায়িত্ব?

বেদেরা সাধারণভাবে বাদিয়া বা বাইদ্যা নামে পরিচিত একটি ভ্রাম্যমাণ জনগোষ্ঠী। উইকিপিডিয়ার তথ্যমতে, ১৬৩৮ খ্রিস্টাব্দে শরণার্থী আরাকানরাজ বল্লাল রাজার সঙ্গে এরা ঢাকায় আসে। পরবর্তীকালে তারা ইসলাম ধর্মে দীক্ষা নেয়। এরা প্রথমে বিক্রমপুরে বসবাস শুরু করে এবং পরে সেখান থেকে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে, এমনকি ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও আসামেও তারা ছড়িয়ে পড়ে। বেদের আদি নাম মনতং। বেদে নামটি অবজ্ঞাসূচক বাইদ্যা (হাতুড়ে ডাক্তার), পরিমার্জিত ‘বৈদ্য’ (চিকিৎসক) থেকে উদ্ভূত। অধিকাংশ বেদেই চিকিৎসার সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে মনতংরা কালক্রমে বেদে নামে অভিহিত হয়। বেদেরা আরাকান রাজ্যের মনতং আদিবাসী গোত্রের দেশত্যাগী অংশ। তাই এরা নিজেদের মনতং বলে পরিচয় দিতে বেশি আগ্রহী। যুদ্ধ ও শিকারে অতিশয় দক্ষ বেদেরা কষ্টসহিষ্ণু ও সাহসী। এদের গাত্রবর্ণ ও আকৃতি বাঙালিদের মতোই।