টেকনাফে ভ্রাম্যমান আদালতে সাজা বাড়লেও ইয়াবা পাচার এবং রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ কমেনি – শাহপরীরদ্বীপে শীর্ষ মানব পাচারকারীরা অধরা

-পাচারকারী.jpg

মোঃ আশেক উল্লাহ ফারুকী : রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশে সহায়তা ও প্ররোচনা, মানবপাচারকারী দালাল, মাদকসেবী ও বিক্রয়ের অভিযোগে টেকনাফ উপজেলা প্রশাসন গত ৪ মাসে উপজেলার বিভিন্ন স্থানে ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা করে ৪০১ টি মামলার বিপরীতে ৭’শ ২৬ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা প্রদান করেছে। এছাড়া অর্থদন্ড ও যানবাহনের জরিমানা দিয়ে আদায় করেছেন ৪ লক্ষ ৫৬ হাজার ৯’শ টাকা। এদের মধ্যে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশে সহায়তা ও প্ররোচনা, মানবপাচারকারী দালাল, মাদকসেবী ও বিক্রেতা রয়েছে।
তবে সাত শতাধিক জনকে ভ্রাম্যমান আদালতে সাজা প্রদান করা হলেও মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ও ইয়াবা পাচার অব্যাহত রয়েছে। এর বিপরীতে ইয়াবা পাচার ও রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঠেকাতে নাফ নদীতে মাছ শিকার গত তিন মাস যাবৎ বন্ধ রাখা হয়েছে। কিন্তু ফলাফল শুণ্য বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। জানা যায়, টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট ও নির্বাহী অফিসার জাহিদ হোসেন ছিদ্দিক চলতি বছরের গত ১৫ আগষ্ট হতে উপজেলার বিভিন্ন স্থানে ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা করে। ১৯৯০ সনের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ, ১৮৬০ সনের দন্ডবিধি ও ১৯৮৩ সনের মোটরযান আইন অনুসারে রোহিঙ্গা পারাপারের দালাল, বাসা ভাড়া ও বাণিজ্যে লিপ্ত থাকায় ৭’শ ২৬ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা প্রদান করেছে। এর মধ্যে আগষ্ট মাসে ১৯ জন, সেপ্টেম্বরে ২৯৩ জন, অক্টোবরে ২৫৬ জন, নভেম্বরে ৭৮ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা প্রদান ও বাকীদের অর্থদন্ড দেওয়া হয়েছে। টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারি কমিশনার (ভুমি) প্রণয় চাকমা পৃথকভাবে ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে তাদের সাজা ও অর্থ দন্ড প্রদান করেন। তাদেরকে ৪০১টি মামলার বিপরীতে ৭শ ২৬ জন দালাল ও মাদকসেবীকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা প্রদান করে কারাগারে প্রেরণের জন্য টেকনাফ মডেল থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। বেপরোয়া ও লাইসেন্সবিহীন যানবাহন চলাচলের কারণে ৪ লক্ষ ৫৬হাজার ৯শ টাকা নগদ টাকা জরিমানা করা হয়। এব্যাপারে টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জাহিদ হোসেন ছিদ্দিক জানান, সীমান্তে অপরাধ প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করে আইন শৃংখলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ভ্রাম্যমান আদালতের অভিযান অব্যাহত থাকবে। এদিকে টেকনাফ উপজেলা প্রশাসন যাবতীয় অপরাধ দমন করে শান্তি-শৃংখলা বজায় রাখার জন্য চেষ্টা চালিয়ে আসলেও মাদক চোরাকারবারীদের অপতৎপরতা বন্ধ না হওয়ায় টেকনাফের আইন-শৃংখলা পরিস্থিতি ক্রমশ অবনতির দিকে যাচ্ছে।
অপরদিকে নাফনদীতে জেলেদের মাছ শিকার বন্ধ রাখা হলেও মাদক চোরাকারবারীদের অপতৎপরতা বন্ধ না হওয়ায় শিগগিরই উখিয়া-টেকনাফ মাদকসেবী ও চোরাকারবারীদের নিরাপদ আস্তানা হিসেবে গড়ে উঠবে বলে আশংকা করছেন অনেকে। তবে সাত শতাধিক জনকে ভ্রাম্যমান আদালতে সাজা প্রদান করা হলেও মিয়ানমার থেকে প্রতিদিন রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ও ইয়াবা পাচার অব্যাহত থাকায় জনমনে ক্ষুদ্ধ প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ও ইয়াবা পাচার বন্ধের অজুহাতে গত তিন মাস ধরে নাফ নদীতে মাছ ধরা বন্ধ রাখা হয়েছে। এতে নাফ নদী নির্ভর হাজার হাজার জেলে ও পরিবার মানবেতর জীবন যাপন করছে। রোহিঙ্গাদের কারণে শ্রম বাজার তাদের দখলে চলে গেছে। বিভিন্ন এনজিও সংস্থায় স্থানীয়দের চাকুরীতে নিতে গড়িমসি করছে। ফলে এক প্রকার নিরব চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে টেকনাফ- উখিয়ার জনগনের মাঝে। শাহপরীরদ্বীপে যে ক’জন শীর্ষ মানবপাচারকারী এবং রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকারী দালাল রয়েছে, তার মধ্যে কবির আহমদ প্রকাশ লম্বা কবিরা অন্যতম। সাগর পথে মালয়েশিয়া মানবপাচারের ট্রানজিট পয়েন্ট শাহপরীরদ্বীপের অন্যতম হোতা এই লম্বা কবিরা। এমনকি মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের উদ্দ্যোগতা এবং পৃষ্ঠপোষকতাকারীর প্রধান নায়ক এই কবিরা। শাহপরীরদ্বীপের বিজিবি ক্যাম্প থেকে অর্ধকিলোমিটার দক্ষিণে নাফ নদীর মোহনায় বদর মোকামের পাশ্বে ঘোলার পাড়া আদমঘাট তারই সৃষ্টি। তার নেতৃত্বে ৮/৯ জন মানবপাচারকারী দালাল ও ইয়াবা কারবারী সংশ্লিষ্টদের ম্যানেইজ করে এ অঘোশিত ঘাট পরিচালনা করতো। এ নির্ভরযোগ্য সূত্র মতে কবিরা এর পাশাপাশি মিয়ানমারের বর্ডার গার্ড পুলিশ (বিজিপির) সোর্স হিসাবে কাজ করে। সম্প্রতি শাহপরীরদ্বীপের দায়িত্বে নিয়োজিত টেকনাফ মডেল থানার পুলিশ অফিসার সাইদুলের নেতৃত্বে একদল পুলিশ মিস্ত্রিপাড়ায় কবিরার বাড়ীতে অভিযান চালিয়ে তাকে আটক করে। পরে তাকে স্থানীয় প্রভাবশালী মহল কবিরাকে ছড়িয়ে নিতে পুলিশকে ম্যানেজ করে এবং পুলিশ মোটা অংকের মাধ্যমে ভূল তথ্য দিয়ে স্থানীয় ভ্রাম্য মান আদালত ১২ হাজার টাকা জরিমানা দিয়ে ছাড় পেয়ে যান। পরে তার দুসরেরা মোটর সাইকেল র‌্যালী সহকারে ফুলের মালা দিয়ে তাকে বরণ করেন। এ নিয়ে গণমাধ্যমে এবং সুশীল সমাজের পক্ষ থেকে জোরালো দাবী উঠেছে। এলাকার একজন শীর্ষ মানব পাচারকারী ও ইয়াবা ব্যবসায়ী কিভাবে ছাড় পেলো। খোদ প্রশাসন এ নিয়ে ক্ষোব্দ। এদিকে গত ৮ ডিসেম্বর শাহপরীরদ্বীপের ঘোলার পাড়া দুপুরে সহকারী কমিশনার নেতৃত্বে একদল পুলিশ ভ্রাম্যমান আদালত শীর্ষ মানব পাচারকারী কবির আহমদ প্রকাশ লম্বা কবিরাকে ফের আটক করতে তার বাড়ীতে ভ্রাম্যমান আদালত অভিযান চালালে, সে ঘরের পেছন দরজা দিয়ে পালিয়ে যায়। এসময় তার বাড়ী থেকে ৫ লাখ টাকার মূল্যে নিষিদ্ধ কারেন্টজ্বাল ও জামাতা কালামিয়ার পুত্র মোনা আলীকে আটক করে। পরে তাকে ভ্রাম্যমান আদালত ৬ মাস সাজা প্রদান করেন। এছাড়া ও শাহপরীরদ্বীপে শীর্ষ পর্যায়ে আরো যে ক’জন মানবপাচারকারী অধরা অবস্থার মধ্যে রয়েছে, তাদের মধ্যে মিস্ত্রি পাড়ার মোঃ ছলিম প্রকাশ লম্বা ছলিম, এনায়েত উল্লাহ, উত্তর পাড়ার জিয়াবুল, মোঃ ছৈয়দ, জিয়াউর রহমান, জালিয়াপাড়ার শাকের আহমদ, আলী জোহার, মোঃ আলম প্রকাশ মাদ আলম। দক্ষি পাড়ার মোঃ ইসলাম, ও ডাংগার পাড়ার আজগর আলী। তাই এ থেকে উত্তোরনে প্রকৃত অপরাধীদের দমনে কঠোর প্রদেক্ষেপ নেওয়ার জন্য সচেতন মহল দাবী করেছেন।