শীত ও বৃষ্টিতে রোহিঙ্গাদের দূর্ভোগ

FB_IMG_1505671026490.jpg

কায়সার হামিদ মানিক,উখিয়া : দুইদিন ধরে মেঘাচ্ছন্ন আকাশ। শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে বৃষ্টি ও ঠান্ডা হাওয়ায় কাঁপছে রোহিঙ্গারা। মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন ক্যাম্পে বেশিরভাগ রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের সহযোগিতায় বিদেশী দাতা সংস্থা গুলো খাদ্য সামগ্রী পেলেও এখনো অনেকের জোটেনি প্রয়োজনীয় শীতবস্ত্র। তাই প্রতিরাতে শীত যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে অসহায় মানুষগুলো। ফলে ক্যাম্পগুলোতে বাড়ছে ঠান্ডাজনিত নানা রোগ-ব্যাধি। গত কয়েকদিনে বালুখালী-১ ক্যাম্পে অজানা রোগে আক্রান্ত হয় ৫জন শিশু মারা গেছে বলে জানিয়েছেন দায়িত্বশীল সুত্র।
কনকনে শীতে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছে অনেকে। শীত তাই দিনের বেলায় কুড়ানো লাকড়ির পরিত্যক্ত অংশ জ্বালিয়ে কোন রকমে শীত থেকে বাঁচার উপায় খোঁজার চেষ্টা মানুষগুলোর। শীতবস্ত্রের বদলে আগুনই উষ্ণতার একমাত্র ভরসা যেন তাদের। ত্রাণ পেলেও বৃষ্টির কারণে জ্বলছে না চুলা।
শৈত্য প্রবাহ ও বৃষ্টির কারণে আশ্রয়হীন মানুষ গুলোর কষ্টের সীমা ছাড়িয়েছে। অধিকাংশের ঘরেই নেই শীতবস্ত্র বা কম্বল। আবার অনেকের অতিরিক্ত হওয়ায় উখিয়ার হাটবাজার গুলোতে বিক্রি করতে দেখা যাচ্ছে প্রতিদিন সন্ধ্যায়। কারণ শীত মৌসুম শুরুর আগে থেকে রোহিঙ্গাদের মাঝে শীতের কম্বলসহ বিভিন্ন রকম শীতবস্ত্র বিতরণ করছে বিভিন্ন সংস্থা। এ কারণে অনেক পরিবার চাহিদার বেশি কম্বলসহ শীতবস্ত্র পেয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সুত্রে জানা গেছে।
খেয়ে-না খেয়ে থাকা এসব রোহিঙ্গারা প্রতিটিমুহুর্ত পার করছে বিপদসংকুল পরিবেশে। ডায়রিয়া, হাম, পোলিও, যক্ষ্মা, রক্ত ও পানিশূন্যতার মতো ঝুঁকিপূর্ণ রোগে আক্রান্ত হচ্ছে বিভিন্ন ক্যাম্পে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা। প্রয়োজনীয় খাদ্য গ্রহণ, নিয়মিত ঘুম এবং বিশ্রাম নিতে পারছে না বলেই এসব রোগে আক্রান্তের সংখ্যা দিন দিন বেড়ে চলেছে বলে জানালেন ক্যাম্পে নিয়োজিত চিকিৎসকরা।
কুতুপালং রেজি: ক্যাম্পে বুচিদং এর হরিণমোরা এলাকার মো: আয়াজের স্ত্রী সাবেকু ন্নাহার (২৪) তিন বৎসরের হারেজ ও নয় মাসের শাহেনাজকে নিয়ে পড়েছে বেকায়দায়। পরিত্যক্ত শেডে গাদাগাদি করে থাকলেও বৃষ্টি কারণে সারারাত ঘুমাতে পারেনি কাল।
অন্যের তাবু বা পরিত্যক্ত শেডে আশ্রয় নিয়ে দিন পার করছে অনেকে। তাবু গুলোতে কোনো রকম দাঁড়িয়ে থাকলেও বৃষ্টির কারণে মেঝেতে পানি জমে কাদা হয়ে যাওয়ায় সেখানে ঘুমানো তো দূরে থাক, বসে থাকার সেই পরিবেশও নেই।
বৃষ্টি ও শীতের প্রাদুর্ভাব এবং খাবারের অভাবে ছটফট করছে শিশু গুলো। আবার শ্বাসকষ্টে ভুগছে বয়স্ক নারী-পুরুষ গুলো। এদের যন্ত্রণাও বর্ণনাতীত। দুর্গন্ধযুক্ত পরিবেশে স্যাঁতসেঁতে ভেজা মাটি ও কাদার কারণে ঘুমানোরও জুঁ নেই।
এনজিও হেলপ কক্সবাজারের নির্বাহী পরিচালক আবুল কাশেম জানান, রোহিঙ্গাদের দুর্ভোগ ও সংকট কোথায় গিয়ে ঠেকবে তা কল্পনাতীত। আগের ৫ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা ছাড়াও ২৫ আগস্টের পর থেকে নতুনভাবে কক্সবাজারে উখিয়া-টেকনাফে আশ্রয় নিয়েছে ৭ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা।
বৃষ্টি মাথায় নিয়ে বসে আছে আব্দু শুক্কুর ও তার পরিবারের আরও পাঁচ সদস্য। এ সময় মো: ইউনুছ (৪২) বৃষ্টি ও বাতাসের তোড়ে কাঁপতে কাঁপতে বলেন, মনে করেছিলাম এখানে এলে সব ধরনের সাহায্য-সহযোগিতা পাবো। এতো কষ্ট পাবো আগে জানলে আসতাম না। গতকাল বৃষ্টি ও শীতের কারণে সারা রাত ঘুমাতে পারিনি।
উখিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা: মিজবাহ উদ্দিন বলেন, ক্যাম্প গুলোতে ঠান্ডা জনিত রোগের প্রাদুর্ভাব বেড়েছে। সম্প্রতি এমএসএফ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৫ জন শিশু মারা গেছে। তবে এই রোগটি এখনো নির্ণয় করা যায়নি। রোগ নির্ণয়ের প্রক্রিয়া চলছে।
উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নিকারুজ্জামান বলেন, শীত আসার আগে থেকে রোহিঙ্গাদের মাঝে বাংলাদেশ সরকার এবং এনজিও’র পক্ষ থেকে প্রচুর পরিমাণ কম্বল বা শীতবস্ত্র বিতরণ করা হয়েছে। আগামী দুয়েক দিনের মধ্যে নতুন করে আরো ৬০ হাজার কম্বল বিতরণ করা হবে। ত্রাণসামগ্রী রোহিঙ্গারা অন্যত্র বিক্রি করছে বলে শুনেছি। খুব দ্রুত এদের বিরুদ্ধে মাঠে নামবো।
অজানা রোগে ৫ শিশু মৃত্যুর বিষয়ে তিনি বলেন, ধারণা করা হচ্ছে ডিপথেরিয়া রোগে শিশু গুলো মারা গেছে। তবে রোগের বিষয়টি এখনো নিশ্চিত নয়। রোগটি নির্ণয়ের জন্য তাদের রক্ত ঢাকায় প্রেরণ করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে সিভিল সার্জন সহ স্বাস্থ্যখাতে কর্মরত সকল এনজিও প্রতিনিধির নিয়ে বিশেষ মিটিং হয়েছে গতকাল।
রোগটি যাতে আমাদের দেশের মানুষের মাঝে ছড়িয়ে না পড়ে সে ব্যাপারে ক্যাম্পে কর্মরত সেনাবাহিনী, পুলিশ, এনজিও কর্মী সহ সংশ্লিষ্ট সকলকে সতর্কতার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।