ঝড়-বৃষ্টিতে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছে রোহিঙ্গারা

IMG_20171031_133428-copy-300x228.jpg

কায়সার হামিদ মানিক,উখিয়া::
উখিয়ার কুতুপালং ও বালুখালীতে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের দুর্ভোগ যেন নিত্য নতুন লেগেই আছে। গত দুই মাসে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আসা ১০ লক্ষাধিক রোহিঙ্গার নানামাত্রিক দুর্ভোগ ও সংকট যেন পিছু ছাড়ছে না। ঝড়-বৃষ্টি, খাদ্য-চিকিৎসা ও আবাসন সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। আশ্রয়হীন অনেকে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছে। একটু আশ্রয় হলেও মিলছে না খাবার হাজার হাজার রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ ও শিশুর। অনেকে কিছু ত্রাণ পেলেও বৃষ্টির কারণে জ্বলছে না চুলা। রাত থেকে শুরু হওয়া বৃষ্টির কারণে আশ্রয়হীন মানুষ গুলোর কষ্টের সীমা ছাড়িয়েছে।
খাদ্য ও বাসস্থান নিশ্চিত করতে রোহিঙ্গাদের মাঝে এক প্রকার হাহাকার শুরু হয়েছে। কারো সাথে কথা বলতে দেখলে দৌড়ে এসে ঘিরে ধরে অনেক রোহিঙ্গারা। ভাই আমার নামটা লিখুন। আসার পর থেকে এখনো কিছু পায়নি। মেলেনি বাসস্থান। অনেককে আবার কোন কোন শেডের বাই অতিরিক্ত ১/২ ফুট অতিরিক্ত ছাউনির নিচে আশ্রয় নিতেও দেখা গেছে।
অনাহারে-অর্ধাহারে থাকা এসব রোহিঙ্গা প্রতিমুহূর্ত পার করছে বিপদসংকুল পরিবেশে। ডায়রিয়া, হাম, পোলিও, যক্ষ্মা, রক্ত ও পানিশূন্যতার মতো ঝুঁকিপূর্ণ রোগে আক্রান্ত হচ্ছে বিভিন্ন ক্যাম্পে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা। প্রয়োজনীয় খাদ্য গ্রহণ, নিয়মিত ঘুম এবং বিশ্রাম নিতে পারছে না বলেই এসব রোগে আক্রান্তের সংখ্যা দিন দিন বেড়ে চলেছে বলে জানালেন ক্যাম্পে নিয়োজিত চিকিৎসকরা। মেডিকেল ক্যাম্প গুলোতেও ঠান্ডা-জ্বরে আক্রান্ত রোহিঙ্গাদের ভিড় দেখা গেছে ।
মঙ্গলবার সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, ভিন্ন ভিন্ন পরিবারের চারজন এক প্লেটে খাবার খাচ্ছে। তাদের একজন রাচিদং এলাকার বদিউর রহমানের মো: কালু (৬৫)। স্ত্রী-পুত্র কোথায় জানে না। তুমব্রু সীমান্ত দিয়ে সোমবার অনুপ্রবেশ করেছে। তার সাথে আরও ৪ পরিবার এসেছে। মিলেমিশে এক প্লেট ভাত খেয়ে কোন রকম বেঁচে থাকার চেষ্টা।
বুচিদং এর হরিণমোরা এলাকা থাকা আসা ক্ষুধার্ত সাবেকুন নাহার (২৩) স্বামী- মো: আয়াজ, তিন বৎসরের হারেজ ও নয় মাসের শাহেনাজকে নিয়ে পড়েছে বেকায়দায়। ঘুমাতে পারেনি কত রাত। গতকাল থেকে রেজি: ক্যাম্পে একটি পরিত্যক্ত শেডে গাদাগাদি করে থাকলেও বৃষ্টি কারণে সারারাত ঘুমাতে পারিনি। জুটেনি খাবার। নিজে না খেলেও ২ সন্তানের খাবারের জন্য অসহায় সাবেকুন।
নামাজ পড়তে পড়তে কপালে দাগ হয়ে গেছে হরিণমোরা এলাকার মৃত আবু ছালামের স্ত্রী নুর জাহান (৭০) এর তিনি বলেন, এতো কষ্ট পাবো আগে জানলে এখানে আসতাম না। নিজ দেশে না খেয়ে মরে যেতাম। ঠিক মতো নামাজটাও পড়তে পারিনা। আসার পর থেকেই পানির অভাবে গোসল করতে পারিনি। চার দিকে ঘেড়া-বেড়াছাড়া পরিত্যক্ত একটি শেডের অবস্থান নিলেও শীত ও বৃষ্টির পানিতে মারা পড়বে এমনটি আশংকা করছেন তিনি।
জুলেখা বেগম (৪৫) স্বামীর নাম জিজ্ঞেস করতেই কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। এক ছেলেকে নিয়ে পালিয়ে আসে। শুনেছে স্বামীকে কেটে ফেলেছে। ৭/৮ আগে আসা জুলেখা পায়নি ত্রাণ সহায়তা। হয়নি অন্য রোহিঙ্গাদের ন্যায় আশ্রয়স্থল। কোথায় গেলে একটা টোকেন কিংবা ত্রাণ পাবো তাও জানিনা।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মাঝি মোহাম্মদ নুর জানান, প্রাকৃতিক দুর্যোগপূর্ণ পরিবেশের কারণে কমে এসেছে ত্রাণ সহায়তা। রোহিঙ্গাদের দুর্ভোগ ও ভোগান্তি থেকে রক্ষা করতে দেশি-বিদেশি সাহায্য সংস্থাগুলোকে এগিয়ে আসার আহবান জানান তিনি।
উখিয়ার কুতুপালং, বালুখালী, পালংখালী ও থাইংখালীর বিভিন্ন পাহাড়ি বনভূমিতে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের তাঁবুগুলো ঝড়ে ভেঙে গেছে। নতুন আসা রোহিঙ্গারা আশ্রয়হীন দিনাতিপাত করছে। নতুন আসা অনেকে গতকাল পর্যন্ত তাঁবু পায়নি, পায়নি তাঁবু টাঙানোর জায়গা। অন্যের তাবু বা পরিত্যক্ত শেডে আশ্রয় নিয়ে দিন পার করছে এরা। অনেক তাঁবু কোনো রকমে দাঁড়িয়ে থাকলেও বৃষ্টির কারণে তাঁবুর মেঝেতে পানি জমে কাদা হয়ে যাওয়ায় সেখানে ঘুমানো তো দূরে থাক, বসার জায়গাটুকুও নষ্ট হয়ে গেছে।
ঝড়-বৃষ্টিতে শীতের প্রাদুর্ভাব ও খাবারের অভাবে ছটফট করছে শিশু গুলো। আবার শ্বাসকষ্টে ভুগছে অনেক বয়স্করা। তাদের যন্ত্রণাও বর্ণনাতীত। দুর্গন্ধযুক্ত পরিবেশে স্যাঁতসেঁতে ভেজা মাটি ও কাদার কারণে ঘুমানোরও জুঁ নেই।
রোহিঙ্গাদের মাঝে খাদ্য সহায়তা দিয়ে আসা এনজিও হেলপ কক্সবাজারের নির্বাহী পরিচালক আবুল কাশেম জানান, রোহিঙ্গাদের দুর্ভোগ ও সংকট কোথায় গিয়ে ঠেকবে তা কল্পনাতীত।
কুতুপালংয়ের রেজি: ক্যাম্পে বৃষ্টি মাথায় নিয়ে বসে আছে আব্দু শুক্কুর ও তার পরিবারের আরও পাঁচ সদস্য। এ সময় মো: ইউনুছ (৪২) বৃষ্টি ও বাতাসের তোড়ে কাঁপতে কাঁপতে বলেন, ঘাটে জনপ্রতি ৫০হাজার কিয়াট দিয়ে কেপ্রুদং থেকে ৩ পরিবার নিয়ে আসার সময় মনে করেছিলাম এখানে এলে তাঁবু মিলবে, থাকার জায়গা মিলবে, ত্রাণ ও মানুষের সাহায্য-সহযোগিতা মিলবে। কিন্তু ছোট ছোট ছেলে-মেয়ে নিয়ে না খেয়েই আছি দুই দিন ধরে। কোথাও জায়গা পাচ্ছি না মাথা গোঁজার। রাতেও ঘুমাতে পারছি না, দিনেও না।
এদিকে সোমবার রাত থেকে কক্সবাজার এলাকায় টানা বৃষ্টি হচ্ছে। পুরনো রোহিঙ্গা পরিবারে সঞ্চিত কিছু ত্রাণ ও খাদ্য সামগ্রী থাকলেও নতুনদের তা নেই। ত্রাণ বিতরণের কাজটি দেখাশুনা করছে মূলত: সেনাবাহিনী ও বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচী। নতুন আসা রোহিঙ্গাদের তালিকা তৈরি করে ত্রাণের আওতায় আনা হবে। তাছাড়া আঞ্জুমানপাড়া থেকে নতুন আসা ১০ হাজার পরিবারের আশ্রয় ও ত্রাণ সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন উখিয়ার কুতুপালং ক্যাম্পের ইনচার্জ মোহাম্মদ রেজাউল করিম।