কমিউনিটি পুলিশিং আস্থা সংকটে

community-police-20171027114445.jpg

টেকনাফ টুডে ডেস্ক:‘পুলিশই জনতা, জনতাই পুলিশ’ এই স্লোগান নিয়ে ২০১৪ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে পথ চলা শুরু করে কমিউনিটি পুলিশিং। যাত্রা শুরুর পর থেকেই কমিউনিটি পুলিশিংয়ে যুক্ত অনেকের বিরুদ্ধেই ওঠে অভিযোগ। অভিযোগ ওঠে খোদ পুলিশের বিরুদ্ধেও। এ ছাড়া রয়েছে প্রভাবশালী মহলের চাপ।
কমিউনিটি পুলিশের বিরুদ্ধে গুম, নির্যাতন, চাঁদাবাজি ও ক্ষমতার অপব্যবহারসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ আছে। কিছু সদস্যের শাস্তি হলেও ধরাছোঁয়ার বাইরে জড়িত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। কিছু অভিযোগের সুরাহা হলেও দীর্ঘ দিন ধরে ঝুলে আছে বড় বড় অর্ধশতাধিক অভিযোগ। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনেও এমন অনেক অভিযোগ জমা পড়েছে পুলিশের বিরুদ্ধে।
সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, দীর্ঘ পথচলাতেও সাংগঠনিক কাঠামোতে দাঁড় করানো যায়নি কমিউনিটি পুলিশিং উদ্যোগকে। কারণ এখনও পুলিশের ওপর পুরোপরি আস্থা নেই জনগণের। জনগণের সঙ্গে পুলিশের আচরণগত বিষয়গুলো আরও বেশি পেশাদারি হওয়া উচিত।
কমিউনিটি পুলিশিং নিয়ে কাজ করা পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, কমিউনিটি পুলিশিং সম্পর্কে পুলিশ ও জনগণের মধ্যেও সঠিক ধারণা নেই। কিছু পুলিশ সদস্য ও স্বেচ্ছা শ্রমে উদ্যোগী ব্যক্তিদের অংশগ্রহণে কমিউনিটি পুলিশিং কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছেন। কমিউনিটি পুলিশিংয়ে যুক্ত সদস্যদের নিয়েও রয়েছে সমাজে নেতিবাচক ভাবমূর্তি। এ সব প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে কমিউনিটি পুলিশিং প্রচারণা বাড়ানো গেলে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি লাভবান হবে পুলিশও।
পুলিশ সদর দফতর সূত্র জানা গেছে, কমিউনিটি পুলিশিংয়ের চলমান কার্যক্রমকে বাস্তবায়ন করতে দেশব্যাপী কমিটি হয়েছে ৪০ হাজার ৯০৮টি। কমিটির সদস্য সংখ্যা এখন ৯ লাখ ৫৮ হাজার ৪৬ জন। দেশের সব জেলাতেই কমিউনিটি পুলিশিং সেল রয়েছে। প্রতি থানায় রয়েছে কমিউনিটি পুলিশিং অফিসার। এছাড়া স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সুশীল সমাজ, সরকারি ও বেসরকারি কর্মকর্তাসহ সমাজের সব স্তরের জনগণের অংশগ্রহণে ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, উপজেলা-জেলা ও পরিবহন সেক্টরেও কমিউনিটি পুলিশিং কমিটি কার্যকর রয়েছে। সামনে এ সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
পুলিশ সদর দফতরের তথ্যানুযায়ী, ২০১৫ সাল থেকে ২০১৭ সালের এপ্রিল পর্যন্ত জমিজমা নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তি করা হয়েছে ৩৭ হাজার ৭২৩টি। টাকা-পয়সা সংক্রান্ত বিরোধ ২২ হাজার ২১৫টি, স্বামী-স্ত্রীর বিরোধ ২৪ হাজার ৫৯৬টি, মারামারি সংক্রান্ত ৩৬ হাজার ৫৮টি, পারিবারিক ২৩ হাজার ৯৭৪টি ও অন্যান্য বিষয়ে ৪৪ হাজার ৪৭৯টি।
পুলিশ সদর দফতরের ডিআইজি’র (অপারেশন্স) অধীনে একজন এআইজি’র তত্ত্বাবধানে পাবলিক সেফটি অ্যান্ড ক্রাইম প্রিভেনশন (পিএস অ্যান্ড সিপি) শাখার কার্যক্রম শুরু হয় ২০১৪ সালে। ওই উদ্যোগই বর্তমানে কমিউনিটি পুলিশিং নামে পরিচিত।
কোনো ভৌগলিক এলাকার বসবাসরত জনগোষ্ঠীকে সাধারণ অর্থে কমিউনিটি বলে। বৃহৎ অর্থে কোনো বিধিবদ্ধ সংস্থা, সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান কমিউনিটির অন্তর্ভুক্ত। কমিউনিটি কর্তৃক পরিচালিত পুলিশি ব্যবস্থাই কমিউনিটি পুলিশিং।
‘কমিউনিটি পুলিশ কি এবং কেন’ শিরোনামে লেখা বইয়ে কমিউনিটি পুলিশিংয়ে বেশ কিছু প্রতিবন্ধকতার উল্লেখ করা হয়েছে। আস্থা কম থাকায় পুলিশের কোনও আহ্বানে সহজে সাড়া দিতে চায় না জনগণ। পুলিশ ও জনগণ উভয়ের রয়েছে সনাতনী ধ্যান-ধারণা। তাছাড়া কমিউনিটি পুলিশিং নিয়ে স্বচ্ছ ধারণাও নেই অনেকের। জনগণের পক্ষ থেকে স্বতঃস্ফূর্ত সহযোগিতা করা হয় না পুলিশকে। পুলিশ ইচ্ছা করলে সবই পারে, এমন ধারণাও কমিউনিটি পুলিশিংয়ে বড় বাধা।
এর চেয়েও বড় বাধা হচ্ছে, পুলিশের ওপর এখনও জনগণের আস্থা কম থাকা, পুলিশেরও জনগণের উপর আধিপত্য বিস্তারের প্রবণতা আছে। এ রকম ১০টি প্রতিবন্ধকতার বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। এর বিপরীতে সমাধানে ৮টি কৌশলের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ব্যাপারে পুলিশ সদর দফতরের এআইজি (মিডিয়া) সহেলী ফেরদৌস জাগো নিউজকে বলেন, কমিউনিটি পুলিশিং এর কাজই হচ্ছে প্রতিরোধমূলক ও সমস্যা সমাধান ভিত্তিক পুলিশিং ব্যবস্থা। সমাজের সালিসি ব্যবস্থা কমিউনিটি পুলিশিং ব্যবস্থারই একটি অংশ। সালিসি বৈঠকের মাধ্যমে হত্যা, ধর্ষণ, চুরি ও ডাকাতিসহ আমলযোগ্য অপরাধ ছাড়া আমল অযোগ্য সব ঘটনাই সামাজিকভাবে মীমাংসা করার সুযোগ রয়েছে। এর আইনগত ভিত্তিও রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাদেকা হালিম জাগো নিউজকে বলেন, জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে বলেই পুলিশ জঙ্গিবাদকে মোকাবেলা করতে পারছে। পুলিশের কর্মপরিধি বেড়ে যাওয়ায় জনগণের সঙ্গে যোগাযোগ হচ্ছে। কিন্তু পুলিশের অনেকের অপরাধ, আধিপত্যবাদী ও সামন্ত মানসিকতার কারণে পুলিশের ওপর জনগণের আস্থা কম। যে কারণে যে উদ্দেশ্য নিয়ে কমিউনিটি পুলিশিং চালু হয়েছে তা সফল হচ্ছে না। আশা করছি পুলিশ তাদের সীমাবদ্ধতাগুলো বুঝতে পারছে।
গতকাল পুলিশ সদর দফতরে ‘কমিউনিটি পুলিশিং ডে’ উপলক্ষে এক সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হক বলেন, কমিউনিটি পুলিশ একটি ব্যাপক বিষয় হলেও আলোচনা হয় ক্ষুদ্র পরিসরে। এ উদ্যোগের জন্য প্রচার ও স্বেচ্ছাশ্রম জরুরি। পুলিশ সদস্যরা এগিয়ে আসছে। জনগণও এগিয়ে আসছে। আগামীতে কমিউনিটি পুলিশিং আরও সফলতা পাবে আশা করছি। এতে করে পুলিশ ও জনগণের মধ্যে পারস্পারিক সহযোগিতা ও অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে অপরাধ দমন ও এলাকার সমস্যা সমাধানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
রাজধানীর বাড্ডা এলাকার কমিউনিটি পুলিশের সদস্য শফিকুল ইসলাম বলেন, কমিউনিটি পুলিশিংয়ে স্বেচ্ছাশ্রমের মানসিকতা নিয়ে এগিয়ে আসতে হয়। কর্মজীবনের ব্যস্ততার বাইরে শ্রমমূল্য ছাড়া অনেকেই সময় দিতে চান না। অনেকের এ বিষয়ে কোনো ধারণাও নেই। যে কারণে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারেনি কমিউনিটি পুলিশিং উদ্যোগ।
উল্লেখ্য, প্রতি বছরের অক্টোবর মাসের শেষ শনিবার আনুষ্ঠানিকভাবে ‘কমিউনিটি পুলিশিং ডে’ হিসেবে উদযাপন করে আসছে পুলিশ। এবারও ২৮ অক্টোবর (শনিবার) ‘কমিউনিটি পুলিশিং ডে’ উদযাপন করা হবে। এবারের স্লোগান ‘জঙ্গি, সন্ত্রাস, মাদক প্রতিকারে, জনতা পুলিশ এক কাতারে’। দিবসটি উপলক্ষে ব্যাপক কর্মসূচি পালনের পরিকল্পনা নিয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ।