রোহিঙ্গা নারীদের দুঃসহ স্মৃতি ভুলে বেচেঁ থাকার চেষ্টা

Pic-Ukjiya-06-10-2017-1.jpg

কায়সার হামিদ মানিক,উখিয়া:মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা নির্যাতিত রোহিঙ্গা নারীরা দূ:সহ স্মৃতি ভূলে থকার চেষ্টা করে যাচ্ছে। রুদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে ছোট্ট জায়গায় গাদাগাদি করে ত্রীপলের নীচে বসবাস করছে তারা। তার এখন ফেলে আসা সংসার, স্বজনের মৃতদেহ, দুঃসহ স্মৃতি আর পথের কষ্টকে পেছনে ফেলে নতুন আশ্রয়ে বেঁচে থাকার লড়াইয়ে নেমেছেন। গোছাতে শুরু করেছেন ১০ হাত বাই ১০ হাতের মধ্যে নতুন সংসার। চেষ্টা করছেন এই ঝুপড়ি ঘরে যতোটুকু ভালো থাকা যায় তার।
বালুখালীর থাইংখালি অস্থায়ী ক্যাম্পে এমনই একটি ঘর বেধেছেন ফিরোজা বেগম। পাহাড়ের পাদদেশে ঘর তৈরি করেছেন ত্রিপল আর পলিথিন দিয়ে। প্রায় মাসখানেক আগে তারা বাংলাদেশে এসেছেন মিয়ানমারের মংডুর নয়ারবিল এলাকা থেকে। পাহাড়ের লালবালির ওপর নির্মিত এই ঝুপড়ি ঘরের মেঝেটা সিমেন্টর প্রলেপ দিয়ে তিনি পাঁকা করে নিয়েছেন। ঝুপড়িতে দুটি রুম রয়েছে। প্রথম রুমে গোটা চারেক প্লাস্টিকের চেয়ার ও দুটি প্লাস্টিকের টুল রয়েছে। মাথার ওপরে সোলার চালিত এলইডি লাইট ও মোবাইল চার্জার।
অন্য রুমে এক পাশে কয়েক বস্তা ত্রাণ, গ্যাসের চুলা, এলপিজি গ্যাসের সিলিন্ডার ও সিলভারের তৈজসপত্র, বিছানা-পত্র। দেখে মনে হয় বেশ গুছিয়েই নিয়েছেন অস্থায়ী আশ্রয় কেন্দ্রকে। সদ্য আসা রোহিঙ্গাদের চেয়ে তিনি এখন কিছুটা নির্ভার বা নিশ্চিন্ত। বৃহস্পতিবারই পেয়েছেন বিশ্বখাদ্য সংস্থার রেশন কার্ড। তাই ভাতের অনিশ্চয়তাও কেটেছে অনেকটা। পরিবারের সদস্য সংখ্যা আটজন হওয়ায় তিনি মাসে এই রেশন কার্ডের মাধ্যমে পাবেন ৬০ কেজি চাল।
ফিরোজা বেগমের স্বামীর নাম আবু বক্কর সিদ্দিক। বাংলাদেশে আসার আগে সেখানে তিনি বিশ্বখাদ্য কর্মসূচির কর্মচারী হিসেবে কাজ করতেন। নিজেদের বসত বাড়ি ছাড়া তেমন কোনো চাষের জমি না থাকলেও সুখে ছিলেন সেখানে। ছিলো সাজানো গোছানো একটি সংসার। সুন্দর ঘর। ছয় ছেলের মধ্যে বড় ছেলে জামাল ও মেজো ছেলে সেলিম ১০ ক্লাস পর্যন্ত পড়া লেখা করে ব্যবসা করতো। বাজারে ছিলো দোকান। সেজো ছেলে হাফেজ জোবায়ের ছিলেন পাড়ার মসজিদের ইমাম। অন্য তিন ছেলের মধ্যে ইয়াসির ৮ম শ্রেণী, আরাফাত ৬ষ্ট শ্রেণী ও ছোট ছেলে মনসুর ৩য় শ্রেণীতে পড়তো। সব মিলিয়ে একটি শান্তির সংসারই ছিলো তাদের। কিন্তু সেই সংসার চোখের সামনে ছাই হতে দেখেছেন তিনি। প্রতিবেশি ও অনেক স্বজনকে হারিয়েছেন এক মাসের ব্যবধানে। এখনো চোখ বুজলে সেইসব দুঃসহ স্মৃতি ভেসে ওঠে চোখের সামনে। তবে ছেলেদের মুখের দিকে তাকিয়ে সেসব ভুলে থাকার চেষ্টা করছেন। চেষ্টা করছেন বাংলাদেশের এই অস্থায়ী আশ্রয়ে ভালো রকম বেঁচে থাকার।
কেবল ফিরোজা বেগমই নন এই ক্যাম্পে থাকা প্রায় সবাই এসেছেন ২৫ আগস্টের সহিংসতার পরপরই। প্রথমে রাস্তার পাশের পাহাড়, বাগান, স্থানীয়দের সুপারি বাগান ও বাড়ির আঙ্গিনায় পলিথিনের ঝুপড়িতে থাকলেও দিন ১৫ আগে সরকার নির্ধারিত এই অস্থায়ী নিবাসে এসেছেন তারা। জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থার দেওয়া ত্রিপল দিয়ে ঘর বেঁধেছেন। প্রথমে রাস্তায় রাস্তায় ত্রাণের জন্য ছুটতে হলেও এখন সেখানে এসেছে শৃঙ্খলা। পরিবারের সবাইকে আর এখন খাবারের জন্য সারাদিন ব্যয় করতে হয়না। ব্যক্তি পর্যায়ের সাহায্যকারীরা ঘরে ঘরে ঘুরেই দিচ্ছেন নগদ অর্থ। সেই টাকায় গত কয়েকদিন হলো পছন্দ মতো বাজার সদাই করছেন তারা। ভাতের সঙ্গে পাতে জুটছে পছন্দের সবজি, শাক, ফার্মের মুরগি, তেলাপিয়া, পাঙ্গাস বা সামুদ্রিক মাছের ঝোলও।
প্রায় সাবাইকেই ক্যাম্পে ফিরতে দেখা যাচ্ছে প্রয়োজনীয় বাজার সদাইয়ের সঙ্গে পান-সুপারি, সবজি, জুস, জাম্বুরা, আখ ও সাংসারের নিত্য প্রয়োজনীয় তৈজস পত্র নিয়ে। প্রায় প্রতিটি ঘরেই তৈরি হয়েছে চুলা। বাজার থেকে কিনে আনা লাকড়ি দিয়ে রান্না হচ্ছে খাবার। পাড়ায় পাড়ায় বসেছে অস্থায়ী দোকান। বিভিন্ন সংস্থা তৈরি করে দিয়েছে অস্থায়ী নামাজের স্থান। ল্যাট্রিন ও টিউবওয়েলে ব্যবস্থা হয়েছে, হচ্ছে। ঝুড়িতে করে নিত্যপণ্যের পসরা নিয়ে হকাররাও ঘুরছেন নতুন এইসব ক্যাম্পে ক্যাম্পে। নারীরা সেসব পণ্য যাচাই করে দরাদরি করে কিনছেন। প্রথমে বাংলাদেশি টাকার সম্পর্কে ধারনা কম থাকায় তাদের ঠকাতে পারলেও এখন সেদিন শেষ হয়েছে ব্যবসায়ীদের। দরাদরিতেই সব ঠিক করছেন রোহিঙ্গা নারীরা। ক্যাম্পের মধ্যেই কোথাও বাঁশের ব্রেঞ্চ পেতে আড্ডায় রয়েছেন বয়স্ক পুরুষ ও যুবকেরা। শিশুরা ব্যস্ত খেলাধুলায়। তবে যারা এক সপ্তাহেরও কম সময়ে এসেছেন বা সদ্য আসছেন তাদের জীবনে এখনো এতটুকু নির্ভারের ছোঁয়া লাগেনি। অনেক ক্ষেত্রেই আগে আসা রোহিঙ্গাদের কাছে নতুনদের প্রতারিত হওয়ার গল্পও শোনা যাচ্ছে। ##