গার্মেন্ট নিয়ে পরিকল্পনায় নাখোশ অনেক বন্ধু রাষ্ট্রই : মন্ত্রী

33_BGMEA_041017_0002.jpg

টেকনাফ টুডে ডেস্ক:কোনো দেশের নাম উল্লেখ না করে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেছেন, পোশাক রপ্তানি করে ৫০ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা বাংলাদেশের অনেক বন্ধুরাষ্ট্রই পছন্দ করেনি।ওই লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের পর থেকে এই খাত নিয়ে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।
বুধবার ঢাকার একটি হোটেলে পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, “দেশের পোশাক রপ্তানি খাত এখন দেশি-বিদেশি নানা ষড়যন্ত্রের শিকার।
“যেদিন থেকে ৫০ বিলিয়ন রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ হল সেদিন থেকেই এই খাত নিয়ে ষড়যন্ত্র শুরু হল। অনেক বন্ধুরাষ্ট্র আছে আমাদের এই উন্নয়ন পরিকল্পনা পছন্দ করে নাই। অনেক শ্রমিক নেতা এই খাতের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে নেমেছেন।”
‘পোশাক শিল্পের বর্তমান ও করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিজিএমইএর সহ-সভাপতি মোহাম্মদ নাছির। জ্বালানি ও বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম, নৌ পরিবহনমন্ত্রী ও শ্রমিক নেতা শাহজাহান খান, বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান পবন চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক আবুল কালাম আজাদ, গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিআরআইয়ের পরিচালক আহসান এইচ মনসুর, এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি শফিউল ইসলামসহ পোশাক ব্যবসায়ীরা আলোচনায় অংশ নেন।
প্রবন্ধে মোহাম্মদ নাছির পোশাক খাতের বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরে বলেন, সদ্য সমাপ্ত ২০১৬-১৭ অর্থবছরে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। গত ১০ বছরে গড় প্রবৃদ্ধি ১৩ শতাংশের বিপরীতে বিগত বছর প্রবৃদ্ধি ছিল দশমিক ২ শতাংশ।
এর অন্যতম কারণ ছিল বিদ্যুতের সমস্যা, অবকাঠামো সমস্যা, চট্টগ্রাম বন্দরের স্থবিরতা, ঢাকা বিমানবন্দরের অচলাবস্থা, পোশাকের দরপতন ও উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, কারখানা সংস্কার বাবদ অতিরিক্ত খরচ ও প্রতিযোগী দেশগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি।
প্রবন্ধে তিনি পোশাক শিল্পের জন্য কর রেয়াত সুবিধা, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণসহ আরও কিছু প্রণোদনা দাবি করেন।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, রানা প্লাজা ধসের পর পোশাক শিল্পে অনেক সংস্কার করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রতিষ্ঠানের বিচারে বিশ্বের প্রথম ১০টি গ্রিন কারখানার মধ্যে সাতটি বাংলাদেশে, যার মধ্যে প্রথম তিনটিও রয়েছে।
তিনি বলেন, “একটি কারখানার সংস্কারে সর্বনিম্ন ৫ কোটি থেকে ২০ কোটি টাকা পর্যন্ত খরচ পড়েছে। এর পরেও পশ্চিমা ক্রেতারা পোশাক শিল্প সম্পর্কে নেতিবাচক প্রচারণায় কান দিচ্ছে।
“আমরা মাত্র এক বছরের প্রচেষ্টায় শ্রমিক আইন করেছি। অথচ আমেরিকায় শ্রমিক আইন করতে উদ্যোগ নেওয়ার পর তা শেষ করতে ২৫ বছর লেগেছিল। তাদের বেসরকারি খাতে ৩০ শতাংশ এবং সরকারি খাতে ৭ শতাংশ শিল্পে ট্রেড ইউনিয়ন রয়েছে। অথচ তারা আমাদের ট্রেড ইউনিয়ন করার জন্য চাপ দিচ্ছে।”
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বলেন, কারখানায় অনেক সংস্কার হলেও বিশ্ব বাজারে সেই তুলনায় ব্র্যান্ডিং হয়নি। দেশীয় বিশ্লেষকরাও হতাশার কথা শোনান। রপ্তানিকারকরা নতুন বাজারের প্রতি আগ্রহী নন। এসবই পোশাক খাতের বড় সমস্যা।
“পোশাক রপ্তানিতে নেট ভ্যালুয়েডিশন ৫০ শতাংশের উপরে আছে। কিন্তু বিশ্লেষকরা ২০ থেকে ২২ শতাংশের বেশি বলছেন না।”
সরকার পোশাক রপ্তানির জন্য রাশিয়ার দিকে ঝুঁকছে জানিয়ে তিনি বলেন, রাশিয়া, কাজাখস্তান, উজবেকিস্তানসহ ইউরো-এশিয়ান বিজনেস করিডরে প্রবেশ করতে কাজ করছে সরকার।“রাশিয়ার বাজার উন্মুক্ত আছে, কিন্তু আমাদের ব্যবসায়ীরা সেই বাজারে যাওয়ার ঝুঁকি নিতে চাচ্ছেন না।”
ইউরোপ-আমেরিকার ক্রেতারা পোশাকের দাম কমাচ্ছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, এখন দক্ষিণ আফ্রিকা, তুরস্ক, রাশিয়ার মতো দেশে নতুন বাজার খুঁজতে হবে।
নৌপরিবহন মন্ত্রী বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা অনেকাংশে বেড়েছে, ভবিষ্যতে আরও বাড়বে। স্বাধীনতার সময় ১৩টা জেটি থাকলেও এখন ২০টা জেটি। আগে পণ্য খালাসে ১০ থেকে ১৫ দিন সময় লাগলেও এখন ২ থেকে ৩ দিনের মধ্যে পণ্য খালাস করা যাচ্ছে।
বিদ্যুৎ ও জালানি প্রতিমন্ত্রী বলেন, ব্যবসার স্থিতিশীলতার জন্য গ্যাস বিদ্যুতের দাম স্থিতিশীল হওয়া প্রয়োজন। তবে এই মুহূর্তে তা করা সম্ভব নয়। আগামী এপ্রিল থেকে কারখানায় এলএনজি গ্যাস দেওয়া যাবে।
এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক আবুল কালাম আজাদ বলেন, ঢাকার আশপাশে পোশাক খাতের জন্য বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল বেছে নিতে বিজিএমইএ ও বেজার সদস্যদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করা হবে। এই কমিটি আগামী সাত দিনের মধ্যে স্থান নির্বাচন করবে।
পিআরআই গবেষণা পরিচালক আহসন এইচ মনসুর বলেন, ঘন ঘন ব্যবসায়িক নীতি পরিবর্তন শিল্পায়নের অন্তরায়। নীতিগুলো পরিবর্তন হয়ে যায় কি না ব্যবসায়ীরা সেই আতঙ্কে থাকেন। গ্যাস বিদ্যুতের দাম আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরের জন্য নির্ধারণ করে দেওয়া প্রয়োজন। তাহলে ব্যবসায়ীরা সেই অনুযায়ী বিনিয়োগ পরিকল্পনা গ্রহণ করবেন।
অন্যদের মধ্যে বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি আব্দুস সালাম মুর্শিদী, আনিসুর রহমান সিনহা, এনবিআর চেয়ারম্যান নজিবুর রহমান সভায় বক্তব্য রাখেন।