এবার ক্ষুধার জ্বালায় পালিয়ে আসছে হাজারও রোহিঙ্গা

3_160161_59480_1506996530.jpg

রাখাইনে গ্রামগুলো অবরুদ্ধ, খাবারের সন্ধানে ঘর থেকে বেরোলেই নিখোঁজ
নুরুল করিম রাসেল, টেকনাফ টুডে ডটকম |
এবার ক্ষুধার জ্বালায় পালিয়ে আসছে হাজারও রোহিঙ্গাকক্সবাজারের টেকনাফের উলুবনিয়া সীমান্ত দিয়ে সোমবার পাঁচ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করে – যুগান্তর
মিয়ানমারের রাখাইন থেকে এবার ক্ষুধার জ্বালায় হাজার হাজার রোহিঙ্গা পালিয়ে আসছেন। সেনারা তাদের গ্রাম অবরুদ্ধ করে রাখায় কেউ ঘর থেকে বের হতে পারছেন না।

ফলে তাদের মজুদ করা খাবার শেষ হয়ে যায়। তারা জানতে পারেন বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের পর্যাপ্ত ত্রাণ ও খাবার দেয়া হচ্ছে। তাই খাবারের আশায় টেকনাফের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে পালিয়ে আসছেন তারা।

সোমবার বিকালে হোয়াইক্যং উলুবনিয়া সীমান্ত দিয়ে ১০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে এসেছেন।

এছাড়া টেকনাফের নাইট্যংপাড়া ও শাহপরীর দ্বীপ পয়েন্ট দিয়েও রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ বেড়েছে। পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের অধিকাংশ রাখাইনের বুচিডং থানা এলাকার। এদিন বিকালে উলুবনিয়া সীমান্তে নাফ নদীর কাছে বিজিবি টহল দলের সদস্যরা পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের জড়ো করে রাখেন।

দায়িত্বরত বিজিবি সদস্যরা জানিয়েছেন, কয়েক হাজার রোহিঙ্গা আসার বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে। টেকনাফ ২ বিজিবি ব্যাটালিয়ন উপ-অধিনায়ক মেজর শরীফুল ইসলাম জুমাদ্দার উলুবনিয়া সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা আসার সংবাদের সত্যতা নিশ্চিত করলেও সংখ্যায় কত হবে, তা জানাতে পারেননি।

মূলত রোহিঙ্গা গ্রামগুলোকে কয়েক সপ্তাহ ধরে সেনারা অবরুদ্ধ করে রেখেছে। গ্রাম থেকে তারা কোথাও বের হতে পারছেন না। কাজকর্মে যেতে পারছেন না। ফলে তাদের গ্রামে খাদ্যাভাব দেখা দিয়েছে। আবার বাংলাদেশে পালিয়ে আসা আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে মোবাইল ফোনে আলাপ করে তারা জানতে পারেন, এ পারে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোয় পর্যাপ্ত ত্রাণসামগ্রী ও খাবার সরবরাহ করা হচ্ছে। তাই অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে এবং খাদ্যাভাবের কারণে তারা পালিয়ে আসছেন।

রাখাইনের মংডু দাবাংসা এলাকার সত্তরোর্ধ্ব লায়লা খাতুন জানান, এক সপ্তাহ আগে রাতের অন্ধকারে গ্রামের কয়েকশ’ লোক একসঙ্গে পালিয়ে হাঁটা শুরু করেন। তারও এক সপ্তাহ আগ থেকে গ্রাম অবরুদ্ধ করে রেখেছিল সেনা ও বিজিপি সদস্যরা। যারা গ্রাম থেকে বাইরে যাচ্ছিল, তাদের আর খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। তাই রাতের আঁধারে গ্রাম ছেড়ে পালান তারা।

রাখাইনের লম্বাবিল এলাকার আবু শামা পরিবারের ১০ সদস্য নিয়ে পালিয়ে এসেছেন। তিনি জানান, কয়েক সপ্তাহ ধরে অবরুদ্ধ তাদের গ্রাম। বাড়িতে কোনো খাবার মজুদ ছিল না। খেয়ে না-খেয়ে দিন কাটছিল। শেষে ক্ষুধার জ্বালায় পালিয়ে বাংলাদেশের পথ ধরেন তারা।

বুচিডং জব্বারপাড়ার আমিনা জানান, কয়েক সপ্তাহ ধরে সেনারা গ্রাম অবরুদ্ধ করে রেখেছে। মাঝেমধ্যে তাদের ডেকে নিয়ে ত্রাণ দেয়া হয়। ত্রাণ দেয়ার দৃশ্য ভিডিও ধারণ করে পরে আবার সে ত্রাণ কেড়ে নেয় সেনা ও তাদের সঙ্গে থাকা মগ-চাকমারা।

এছাড়া রোববার রাত ১২টার পর থেকে টেকনাফ পৌরসভার নাইট্যংপাড়া পয়েন্ট দিয়ে পালিয়ে আসেন শত শত রোহিঙ্গা।

মংডুর বইরগ্যাবিল, বুচিডংয়ের থাইম্যাখালীসহ কয়েকটি এলাকা থেকে পালিয়ে আসা এসব রোহিঙ্গা জানান, তাদের গ্রামে অগ্নিসংযোগ কিংবা হতাহতের কোনো ঘটনা না ঘটলেও খাদ্যাভাবে তারা বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছেন। এখানে খাদ্যের কোনো অভাব নেই বলে তারা আগে থেকে পালিয়ে আসা আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে শুনেছেন।

সরেজমিন ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, রাখাইনের পেরামপুরু এলাকা থেকে কয়েকটি নৌকায় রোহিঙ্গারা এ পারে আসেন। নৌকার মাঝিরাও পেরামপুরু এলাকার। তখন আরও কয়েকশ’ রোহিঙ্গা আসার জন্য ওপারে অবস্থান করছিল বলে জানায় আগত রোহিঙ্গারা। নৌকা ভাড়া বাবদ তাদের কাছ থেকে রাখাইনের নৌকার মাঝি ও দালালরা ৪০ হাজার টাকা করে নিয়েছেন।

নাইট্যংপাড়া এলাকায় মংডু বইরগ্যাবিল এলাকার মো. ছিদ্দিক জানান, পরিবারের ৮ সদস্য নিয়ে পালিয়ে এসেছেন তিনি। তিন দিন আগে রাতের অন্ধকারে গ্রাম ছেড়েছিলেন তারা। তিন দিন হেঁটে রাখাইনের পেরামপুরু পৌঁছেন। গ্রামে খাবারের অভাব থাকলেও পথে খাবারের অভাব হয়নি বলে জানান তিনি।

পথিমধ্যে জনশূন্য এমন গ্রাম পেয়েছেন, যেসব গ্রামে লোকজন না থাকলেও তাদের বাড়িতে আলু চাল মজুদ ছিল, সেখান থেকে নিয়ে রান্না করে খাবার খেয়েছেন তারা। সেখান থেকে নৌকায় নাফ নদী পেরিয়ে নৌকায় পৌঁছেন টেকনাফের নাইট্যংপাড়া এলাকায়। এখানে পৌঁছার সঙ্গে সঙ্গে কিছু মাওলানা তাদের দেড় হাজার টাকা ও খাবার দেন।