পরিকল্পনাহীন বোলিংয়ে বিপদে বাংলাদেশ

A13T9347.jpg

টেকনাফ টুডে ডেস্ক:শুরুতেই পরিকল্পনার ঘাটতি; ব্যাটিং উইকেটে টসে জিতে প্রতিপক্ষকে পাঠানো ব্যাটিংয়ে। বেছে নিয়েও বোলিংয়ে নেই পরিকল্পনা। দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রথম পরীক্ষায় প্রোটিয়া আগুনে পুড়ল বাংলাদেশ।প্রায় দুইশ রানের এক জুটি, অবিচ্ছিন্ন শতরানের আরেক জুটিতে পচেফস্ট্রুম টেস্টের প্রথম দিন শেষেই চাপে মুশফিকুর রহিমের দল।

অভিষেকে নজর কাড়া ব্যাটিং করেছেন এইডেন মারক্রাম। দারুণ এক শতকে দলকে পথ দেখিয়েছেন ডিন এলগার। সহজাত ব্যাটিংয়ে বড় ইনিংস খেলার পথে হাশিম আমলা। বৃহস্পতিবার প্রথম দিন খেলা শেষে দক্ষিণ আফ্রিকা করেছে ২৯৮ রান।

সাত বোলার ব্যবহার করে প্রথম দিন একটির বেশি উইকেট নিতে পারেনি বাংলাদেশ। মারক্রামের উইকেট এসেছে রান আউট থেকে। পচেফস্ট্রুমে ১৫ বছরের মধ্যে প্রথম টেস্টের প্রথম দিনটি রাঙিয়েছে স্বাগতিকরা।

টেস্টে চলতি বছরের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাক এলগার ১২৮ অপরাজিত রানে। তার ২৮৫ বলের ইনিংস গড়া ৯টি চার আর দুটি ছক্কায়। ছক্কায় অর্ধশতক পাওয়া আমলা খেলছেন ৬৮ রানে। তার ১০৩ বলের ইনিংসে আছে ৭টি চার।

উইকেট পেতে বাংলাদেশের বোলারদের পিচ থেকে একটু হলেও সহায়তা লাগে। সেনওয়েস পার্কে টেস্টের প্রথম দিন সেই সহায়তা একটু ছিল না। ঠিক কোন লাইন-লেংথে বল করলে উইকেট মিলবে সারা দিন তার চেষ্টা করে গেলেন মুস্তাফিজুর রহমান, শফিউল ইসলাম ও তাসকিন আহমেদ। ফ্লাইট, লেংথ আর গতির বৈচিত্র্যে ব্যাটসম্যানদের যা একটু ভাবিয়েছেন অফ স্পিনার মেহেদী হাসান মিরাজ।

উইকেট ঠিকঠাকই পড়তে পেরেছিলেন মুশফিকুর রহিম। ব্যাটিং সহায়ক উইকেট হবে, তৃতীয় দিন থেকে হয়তো সহায়তা পেতে পারেন স্পিনাররা। এরপরও টস জিতে তিনি নিলেন ফিল্ডিং, পূরণ করলেন দক্ষিণ আফ্রিকার অধিনায়কের আশা। টস জিতলে ব্যাটিংই নিতে চেয়েছিলেন তিনি।

উইকেটে একটু আর্দ্রতা আশা করেছিলেন মুশফিক। ভেবেছিলেন উইকেটে যদি পেসারদের জন্য কোনো সহায়তা থাকে সেটা থাকবে শুরুর ঘণ্টাতেই। তেমন কিছু ছিল না। উইকেট যেন ছিল ওয়ানডে ম্যাচের, পুরোপুরি শুকনো। তবুও সতর্ক ছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার দুই উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান। নিরাপদে কাটিয়ে দেন প্রথম ঘণ্টা।

সকাল থেকে আকাশ ছিল মেঘে ঢাকা। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে উঠেছে রোদ। ঠাণ্ডা বাতাসের মধ্যে সেই মিঠে রোদ স্বাগতিকদের আরও উপভোগ্য হয়ে উঠে এলগার-মারক্রামের দারুণ ব্যাটিংয়ে।

ডিন এলগার আর অভিষিক্ত এইডেন মারক্রাম শুরু থেকেই দেখিয়েছেন ধৈর্য। অপেক্ষা করেছেন সঠিক বলের। এর ঠিক উল্টো কাজটি করেছে বাংলাদেশে। কোনো স্পেলেই বোলারের ওপর আস্থা হারাতে বেশি সময় নেননি মুশফিক। ১১ ওভারের মধ্যেই ব্যবহার করেছেন চার বোলার। তিন ঘণ্টার মধ্যে আক্রমণে দেখা গেছে অনিয়মিত দুই স্পিনার মাহমুদউল্লাহ ও মুমিনুল হকসহ ছয় জনকে।

বোলারের ওপর অধিনায়ক যত দ্রুত আস্থা হারিয়েছেন তারচেয়েও দ্রুত পরিকল্পনা থেকে সরেছেন বোলাররা। কারোর বোলিং দেখে মনে হয়নি উইকেট পেতে নির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা নিয়ে নেমেছেন। তিন-চারটি বল স্টাম্পের বাইরে করেছেন তো পরেরটি দিয়েছেন প্যাডে। ডট বল খেলিয়ে চাপ তৈরির কাজটিও কেউ করতে পারেননি।

নির্বিষ বোলিংয়ের দিনে ফিল্ডিং ছিল ম্যাড়ম্যাড়ে। একটু আক্রমণাত্মক ফিল্ডিংয়ে ব্যাটসম্যানের ওপর চাপ তৈরির কোনো চেষ্টা দেখা যায়নি। গালি থেকে মাঝে মাঝে শোনা যাচ্ছিল মিরাজের কণ্ঠ, ‘একটা পড়লে সাথে আরেকটা পড়বে, কাম অন’। কিন্তু সেই একটা উইকেট কিভাবে নিতে হবে সেটা যেন জানা ছিল না কারোরই।

প্রথম সেশনে বিনা উইকেটে ৯৯ রান করা দক্ষিণ আফ্রিকা দ্বিতীয় সেশনে যোগ করে আরও ৯৯ রান। চা-বিরতির আগে শেষ ওভারে ফিরে যান অভিষিক্ত মারক্রাম। মাত্র ৩ রানের জন্য শতক না পাওয়া তরুণ ব্যাটসম্যান দলকে এনে দেন দেন চমৎকার সূচনা। ১৭ ইনিংসের মধ্যে প্রথম পঞ্চাশ ছোঁয়া উদ্বোধনী জুটি পায় দক্ষিণ আফ্রিকা। ২০১০ সালের নভেম্বরের পর প্রথম ওপেনিংয়ে দেড়শ রানের জুটির দেখা মেলে এলগার-মারক্রামের ব্যাটে।

২৮ রানে তাসকিনের বলে পয়েন্টে মুস্তাফিজকে ক্যাচ দিয়েও বেঁচে যান মারক্রাম। প্রতিক্রিয়া দেখাতে দেরি করেছিলেন মুস্তাফিজ, বল ড্রপ পরে তার সামনে। পেসারদের বলে পয়েন্টে ফিল্ডিং করেন সাব্বির, স্পিনে মুস্তাফিজ। সতর্ক না থাকায় সে সময়ে সাব্বিরের জায়গায় পয়েন্টে ছিলেন মুস্তাফিজ, যিনি দলের সেরা ফিল্ডারের একজন নন।

৩৬ রানে থাকার সময়ে রান আউট হতে হতে বেঁচে যান মারক্রাম। তখন যেভাবে আউট হতে পারতেন ঠিক সেভাবেই ফিরেন ব্যক্তিগত ৯৭ রানে। ৯৯ রানে ছিলেন তখন এলগার। বল খেলেই রান নিতে চেয়েছিলেন তিনি, সাড়া দিয়ে ছুটেছিলেন মারক্রাম। রান হবে না বুঝতে পেরে ঘুরে যান এলগার, ফেরার উপায় ছিল না ২২ বছর বয়সী ডানহাতি ব্যাটসম্যান মারক্রামের। সাব্বিরের থ্রো ধরে স্টাম্প ভাঙেন মিরাজ।

মারক্রামের ১৫৩ বলের দারুণ ইনিংসটি গড়া ১৩টি চারে। মাত্র তৃতীয় ব্যাটসম্যান হিসেবে অভিষেকে নব্বইয়ের ঘরে রান আউট হলেন তিনি। তার বিদায়ে ভাঙে ১৯৬ রানের জুটি।

দ্বিতীয় নতুন বল নেওয়ার আগে কয়েক ওভারের জন্য সপ্তম বোলার হিসেবে সাব্বিরকে আক্রমণে আনেন মুশফিক। অনিয়মিত লেগ স্পিনার সাফল্য প্রায় পেয়েই যাচ্ছিলেন। আমলার বুলেট গতির ফিরতি ক্যাচ আঙুল ছুঁয়ে সীমানা ছাড়ায়। সে সময় ৪১ রানে ছিলেন আমলা।

কোনো বিপদ ছাড়াই শেষ সেশন কাটিয়ে দেন এলগার-আমলা। দক্ষিণ আফ্রিকার তিন নম্বর ব্যাটসম্যান ক্রিজে আসার পর নিজেকে একটু গুটিয়ে দেন বাঁহাতি উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান এলগার। সে সময়ে রানের চাকা সচল রাখেন আমলা।

১০১ রান নিয়ে তৃতীয় সেশন শুরু করেন এলগার। বাঁহাতি উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান দিনের শেষ সেশনে যোগ করেন মাত্র ২৭ রান। আমলার সঙ্গে অবিচ্ছিন্ন ১০২ রানের জুটিতে তার অবদান মাত্র ২৯ রান।

ব্যাটসম্যানরা হয় ছেড়েছেন নয়তো খেলেছেন। পরাস্ত হয়েছেন কমই। রঙিন পোশাকে দুর্দান্ত বাংলাদেশের বোলিং সাদা পোশাকে আরও একবার বিবর্ণ।

তিন পেসার নিয়ে খেলা বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি ৩৬ ওভার বল করিয়েছে মিরাজকে দিয়ে। তরুণ এই অফ স্পিনার ১০১ রানে উইকেটশূন্য।

টস জেতাটাই কেবল মুশফিকের দলের দিনের সবচেয়ে ভালো মুহূর্ত হয়ে রইল।

সংক্ষিপ্ত স্কোর:

দক্ষিণ আফ্রিকা ১ম ইনিংস: ৯০ ওভারে ২৯৮/১ (এলগার ১২৮*, মারক্রাম ৯৭, আমলা ৬৮*; মুস্তাফিজ ০/৫৪, শফিউল ০/৪৪, মিরাজ ০/১০১, তাসকিন ০/৫২, মাহমুদউল্লাহ ০/১৩, মুমিনুল ০/১৫, সাব্বির ০/১৫)