খাদ্য ও পানি সংকট চরমে : ত্রাণের জন্য হাহাকার

rohingya_refugee_food_crisis_57494_1504991442.jpg

আহমদুল হাসান আসিক, কক্সবাজার থেকে |
স্বাস্থ্যঝুঁকিতে শিশু ও বৃদ্ধরা * সীমান্তে শরণার্থীর ঢল, ওপারে বাড়ি-ঘরে দেয়া হচ্ছে আগুন * আশ্রয়হীনদের বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা * গুলিবিদ্ধ ৪ রোহিঙ্গার শরীরে পচন
খাদ্য ও পানি সংকট চরমে

মিয়ানমার থেকে শরণার্থী হিসেবে আসা রোহিঙ্গারা খাদ্য ও পানি সংকটে ভুগছেন। আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে (ক্যাম্প) খাদ্য ও পানি সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। লাখ লাখ বিপন্ন রোহিঙ্গা মানবেতর জীবনযাপন করছেন। কুতুপালং ক্যাম্প থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার পর্যন্ত এলাকাজুড়ে রোহিঙ্গারা আশ্রয় নিয়েছেন। পুরো এলাকাতেই খাদ্য ও পানির জন্য হাহাকার। মিয়ানমার থেকে আসা এসব রোহিঙ্গা সে দেশেও অনেকদিন অভুক্ত থেকেছেন। জঙ্গলে পোকামাকড় ও লতাপাতা খেয়েও কেউ কেউ বেঁচেছিলেন। তাই ত্রাণের গাড়ি দেখলেই হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন। খাদ্য ও পানির অভাবে সবচেয়ে বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েছেন শিশু ও বৃদ্ধরা। আশ্রয়হীন মানুষগুলো অমানবিক দিনযাপন করছেন কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের শরণার্থী শিবিরসহ আশপাশের পাহাড় ও রাস্তার পাশে। প্রয়োজনীয় খাদ্য আর পানির অভাবে দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে তাদের জীবন।

কোনোরকমে নিজেদের জন্য মাথা গোঁজার ঠাঁই মিললেও তারা ক্ষুধা-তৃষ্ণার যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন। শনিবার দুপুরে সরেজমিন উখিয়ার বালুখালীতে গিয়ে দেখা যায়, খাবার ও পানির অভাবে শিশুরাও রাস্তায় নেমে এসেছে। তারাও ত্রাণের ট্রাক দেখলে হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। এসব শিশুর অধিকাংশেরই শরীরে কোনো পোশাক নেই, তাদের অনেকেই নাঙ্গা। বালুখালীতে পাহাড় কেটে তাঁবু টানিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন মংডু থেকে আসা আজিম মিয়ার ১০ সদস্যের পরিবার। সঙ্গে করে তারা চার কেজি চাল নিয়ে এসে ছিলেন। শুক্রবার সকাল পর্যন্ত এ চাল দিয়ে কোনোরকমে চলেছে। দুপুরে তার পরিবারের কোনো সদস্যের মুখেই খাবার জোটেনি। রাতে কিছু চিঁড়া, মুড়ি আর এক বোতল পানি ত্রাণ হিসেবে সংগ্রহ করেছিলেন আজিম। এটুকু খেয়েই রাত পার করেছেন তারা। শনিবার সকালেও পরিবারের সদস্যদের পেটে খাবার পড়েনি। শুধু আজিম মিয়া নন, তার পরিবারের মতো লাখ লাখ রোহিঙ্গা পরিবার খাদ্য ও পানি সংকটে দুর্বিষহ জীবন পার করছেন। কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো. মাহিদুর রহমান শনিবার যুগান্তরকে বলেন, তিন লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা আসার কারণে তাদের প্রয়োজনীয় মানবিক সহায়তা দিতে সবাইকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। তবে সমন্বিতভাবে এ সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।

শিশু ও বৃদ্ধরা ডায়রিয়ায় আক্রান্ত : শনিবার দুপুরে বালুখালী ক্যাম্পে গিয়ে দেখা গেছে, অনেক শিশু ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে। একদিকে খোলা আকাশের নিচে বসবাস অপরদিকে বৃষ্টি। তাছাড়া বিশুদ্ধ খাবার পানির তীব্র সংকটে ডায়রিয়ার প্রকোপ অনেক বেড়েছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে ন্যূনতম স্যানিটেশনের ব্যবস্থাও নেই। ত্রাণ হিসেবে যেসব খাবার স্যালাইন ও শিশুখাদ্য পাওয়া যাচ্ছে তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই সামান্য।
বিভিন্ন জেলায় রোহিঙ্গাদের ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা : দালালদের মাধ্যমে কক্সবাজার ও বান্দরবান জেলার বাইরে রোহিঙ্গারা ছড়িয়ে পড়তে পারে এমন আশঙ্কাও করা হচ্ছে। এরই মধ্যে দালালদের হাত ধরে বেশ কিছু রোহিঙ্গা কক্সবাজার শহর ও চট্টগ্রাম শহরে চলে গেছে বলে স্থানীয়ভাবে জানা গেছে। খবর পেয়ে স্থানীয় প্রশাসন দালালদের সন্ধানও শুরু করেছে। গত ১৫ দিনে কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত ১৫৯ জন দালালকে কারাদণ্ড দিয়েছেন।

দুই সপ্তাহে তিন লাখ অনুপ্রবেশ : শরণার্থী রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ জানিয়ে কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এডিসি-শিক্ষা ও আইসিটি) মো. মাহিদুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, দুই সপ্তাহে তিন লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। সেদেশে অবস্থানকারী সব রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা করছেন। ফলে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার বাসস্থান ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এ সমস্যা সমাধানে স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘ মেয়াদি বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে।

কক্সবাজার জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের দুটি রেজিস্টার্ড ক্যাম্প রয়েছে। এর মধ্যে একটি উখিয়ার কুতুপালং ও অন্যটি টেকনাফের নয়াপাড়া। এ দুটি ক্যাম্পেই ৭৩ হাজার নিবন্ধিত রোহিঙ্গা বসবাস করেন। এদের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে ডব্লিউএফপি ও জাতিসংঘ। তবে কুতুপালংয়ের রেজিস্টার্ড ক্যাম্পের আশপাশে আনরেজিস্টার্ড রোহিঙ্গা ক্যাম্প গড়ে উঠেছে। উখিয়ার বালুখালি, পালংখালি এলাকায়ও একাধিক আনরেজিস্টার্ড ক্যাম্প গড়ে উঠেছে। কক্সবাজারের টেকনাফ, বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি ও চট্টগ্রাম শহরেও রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আনরেজিস্টার্ড ক্যাম্প রয়েছে। এসব ক্যাম্পে অবস্থানকারী রোহিঙ্গাদের নিয়ে শঙ্কা থেকেই গেছে। কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, রোহিঙ্গাদের কোনো গোষ্ঠী যেন অপরাধ কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করতে না পারে এজন্য বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে জেলা প্রশাসন সমন্বয় করে কাজ করছে।

সীমান্তে এখনও রোহিঙ্গাদের ঢল : ৩ দিন ধরে উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন সীমান্তবর্তী এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, জীবন বাঁচাতে রোহিঙ্গারা দলে দলে বাংলাদেশে প্রবেশ করছেন। এখনও মিয়ানমারের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় রোহিঙ্গাদের প্রবেশের দৃশ্য দেখলে মনে হয় ঢল নেমেছে। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা বলছে, মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাদের ৮০ শতাংশই নারী ও শিশু। শনিবার উখিয়ার লাম্বার বিলের সীমান্ত এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, নাফ নদী পার হয়ে হাজার হাজার রোহিঙ্গা সঙ্গে ছোট ছোট পুটলি নিয়ে বাংলাদেশে আসছেন।

এখনও রোহিঙ্গাদের বাড়িঘরে আগুন দেয়া হচ্ছে : টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ থেকে শনিবার মিয়ানমার অংশে আগুন জ্বলতে দেখা গেছে। সকালের দিকে ওই অংশে ধুঁয়ার কুণ্ডলী দেখা গেছে। সীমান্ত পাড়ি দিয়ে শাহপরীর দ্বীপে আসা আবদুল আলী জানান, ওই জায়গার নাম নয়াপাড়ার ধনখালি। সকাল পৌনে ১০টার দিকে প্রথম আগুন দেখা যায়। এ আগুনের লেলিহান শিখা সূত্রপাতের স্থান থেকে দক্ষিণ দিকে বাড়তে থাকে। দুপুর ২টা পর্যন্ত আগুন জ্বলতে দেখা গেছে।

শুরু হচ্ছে রোহিঙ্গাদের ডাটাবেজ তৈরির কাজ : আমাদের কক্সবাজার প্রতিনিধি জানান, মাত্রাতিরিক্ত রোহিঙ্গার অনিয়ন্ত্রিত বিচরণ রোধ করতে উদ্যোগ নিয়েছে কক্সবাজার জেলা প্রশাসন। নিবন্ধিত রোহিঙ্গা ছাড়া নতুন ও পুরাতন সবাইকে ডাটাবেজের আওতায় আনতে রোববার থেকে কাজ শুরু হচ্ছে। রোহিঙ্গা নিয়ন্ত্রণে খোলা জেলা প্রশাসনের কন্ট্রোল রুম ইনচার্জ অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) খালেদ মাহমুদ শনিবার বিকালে এসব তথ্য জানিয়েছেন। তিনি বলেন, নিরাপত্তার স্বার্থে রোহিঙ্গাদের আঙুলের ছাপ ও ছবি সংবলিত ডাটাবেজ তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট দফতরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আজ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।

গুলিবিদ্ধ ৪ রোহিঙ্গার শরীর পচে বেরোচ্ছে দুর্গন্ধ : ২৪ আগস্ট রাতে হামলায় আহত বেশ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলেছেন টেকনাফ প্রতিনিধি নুরুল করিম রাসেল। আহতদের মধ্যে এমন কয়েকজনকে পাওয়া গেছে, যাদের শরীর পচে দুর্গন্ধ বের হচ্ছে। রাখাইনে বর্বর সেনা হামলার ১৩ দিন পর গুলিবিদ্ধ হয়ে এক নারী, এক শিশু ও ২ রোহিঙ্গা কিশোর সীমান্ত অতিক্রম করে শুক্রবার রাতে টেকনাফে পৌঁছে। আহতদের চিকিৎসার জন্য টেকনাফ হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানে দেখা যায় পচন ধরে দুর্গন্ধ বেরোচ্ছে তাদের শরীর থেকে। স্বজনরা কোলে-কাঁধে করে তাদের নিয়ে আসতে সক্ষম হলেও জীবনের আশঙ্কা কাটেনি তাদের। গুলিবিদ্ধ চার রোহিঙ্গা হচ্ছেন- রাখাইন রাজ্যের বুচিডংয়ের রাছিডং এলাকার ইমাম শরীফ, আবদুল করিম, জমিলা খাতুন ও ইতিলার গোঁয়াইং গ্রামের মো. সাফাত। এদের মধ্যে গুলিবিদ্ধ আবদুল করিমকে ভাইয়েরা কাঁধে বহন করে ১৩ দিন হেঁটে সীমান্ত অতিক্রম করেন। একটি ঝুড়ির মধ্যে ঢুকিয়ে পায়ে ও হাতে গুলিবিদ্ধ আবদুল করিমকে পাহাড়, জঙ্গল ডিঙ্গিয়ে খালবিল পার হয়ে এপারে আনতে গিয়ে তার ভাইয়েরাও অসুস্থ হয়ে পড়েন। এ সময় খাদ্য ও পানির সংকটে অর্ধাহারে-অনাহারে দিন কাটান তারা। পরে সেনাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে দীর্ঘ সীমান্ত অতিক্রম করে এ পারে পৌঁছেন তারা।

চোখের সামনেই গুলি করে হত্যা করা হয় ৭৩ জনকে : আবদুল আজিজ। মংডু থানার বাসিন্দা। ১৯৭৮ সালেও শরণার্থী হিসেবে বাংলাদেশে এসেছিলেন তিনি। পরে মিয়ানমারে ফিরে গিয়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে ডাক্তারি পেশায় নিয়োজিত হন। তিনি বলেন, ‘চোখের সামনে একের পর এক হত্যার দৃশ্য দেখে আমি এক মুহূর্তও বাড়িতে অবস্থান করিনি। পরিবারের ৮ সদস্যকে নিয়ে অন্যান্য পরিবারের মতো আমিও পাহাড়ের দিকে ছুটেছি। এভাবে প্রায় ১৪ দিন অর্ধাহারে-অনাহারে লুকিয়ে পাহাড়ি পথ দিয়ে হাঁটার পর দলবদ্ধ হয়ে বৃহস্পতিবার নাইক্ষ্যংদিয়া সীমান্তে পৌঁছাই শুক্রবার রাতে। পরে শাহপরীর দ্বীপ সীমান্ত দিয়ে এপারে ঢুকি।’ তিনি জানান, খবর নিয়ে জেনেছি উত্তর শীলখালী গ্রামে এক রাতেই ৭৩ জনকে পুড়িয়ে ও গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। তরুণীদের ধরে নিয়ে গেছে। আর ফিরে আসেনি। পথে ও ধানক্ষেতে নারী ও শিশুর মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখেছি।
মিয়ানমার সীমান্তে বিপুল অবৈধ মাইন : যুগান্তরের বান্দরবান প্রতিনিধি স্থানীয়দের বরাত দিয়ে জানান, আন্তর্জাতিক সীমান্ত আইন ও জেনেভা আইন লঙ্ঘন করে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী নতুন করে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের ওপারে শত শত ভূমি মাইন ও এন্টি ট্যাংক মাইন পুঁতে রেখেছে। এসব মাইনের কাছে বা ওপরে সস্তা দামের খাবার জুস ও মোবাইল সেট ফেলে রাখা হচ্ছে। যাতে করে আকৃষ্ট হয়ে শিশু-কিশোররা এসব মাইন স্পর্শ করা মাত্রই নিহত বা গুরুতর আহন হয়। স্থানীয়রা এসব তথ্য দিয়েছে।

বান্দরবান জেলার নাইক্ষ্যংছড়ি উপজলার সীমান্তের তুমব্রু ২১নং পিলার থেকে লেমুছড়ি ৫২নং পিলার পর্যন্ত ৫০ কিমি. সীমান্ত এলাকাজুড়ে মিয়ানমারের সীমান্ত রক্ষীরা সে দেশের সেনাবাহিনীর উপস্থিতিতে নতুন করে কয়েকশ’ ভূমিমাইন বা এন্টি পার্সোন্যাল মাইন ও এন্টিট্যাংক মাইন বসিয়েছে বলে সীমান্ত থেকে বিজিবি, পুলিশ ও সরকারি সংস্থারগুলোর দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে।