ওপারে নির্যাতন এপারে লুটপাট : সীমান্তের জিরো পয়েন্টে রোহিঙ্গা নারী শিশুর কান্না

Rohingha_child.jpg

শহিদুল ইসলাম, সীমান্ত থেকে ফিরে |
মিয়ানমারে সামরিক বাহিনীর নির্যাতন সইতে না পেরে বান্দরবান ও কক্সবাজারের উখিয়ার বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্টে আশ্রয় নিয়েছে হাজার হাজার রোহিঙ্গা নারী শিশু। গত ৪ দিন খাবার খেতে না পেয়ে শিশুদের কান্নায় সীমান্তের জনপদের পরিবেশ ভারী হয়ে উঠেছে। প্রতিদিনই মিয়ানমারের বিভিন্ন এলাকায় থেমে থেমে সীমান্তরক্ষী বাহিনী কর্তৃক গুলিবর্ষন, ঘর বাড়ি জ্বালিয়ে পুড়িয়ে পুরুষ মানুষদের ধরে নেওয়ারও খবর পাওয়া গেছে। গতকাল মঙ্গলবার সকাল সাড়ে নয়টার দিকে উখিয়ার বালুখালী টিভি রিলি কেন্দ্র সংলগ্ন এলাকায় ৪ রোহিঙ্গা পরিবারের সাথে কথা হয়। এরা টেকনাফ উপজেলার উলুবনিয়া সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে মঙ্গলবার ভোরে এদেশে প্রবেশ করেন। উলুবনিয়া থেকে চাদের গাড়িতে করে উখিয়ার কুতুপালং শরণার্থী শিবিরে ঢোকার জন্য অপেক্ষা করছে। মিয়ানমারের শীলখালী গ্রামের মৃত আবদুল মজিদের স্ত্রী রফিজা খাতুন বলেন, গত হদিন ধরে আরার এলাকার পাশে ঘর বাড়ি জ্বালিপুড়ি দের, ইতল্লাই বলি এড়ে পালিয়ে আস্সিদে। কিছু নুআনি। আত্তু ঘর বাড়ি আছে, জমি জমা আছে। একই গ্রামের আবিদা খাতুন বলেন, আমার চোখের সামনে স্বামীকে ধরে নিয়ে গেছে মিলেটারী বাহিনী। আমার ৩ সন্তান নিয়ে কোন রকম প্রাণের ভয়ে পালিয়ে এসেছি। ঘুমধুমের জলপাইতলী ও উত্তর পাড়া এলাকায় অস্থায়ী ভাবে আশ্রয় নেওয়া ৭ শতাধিক মিয়ানমার নাগরিক সেদেশে ফেরৎ পাঠিয়েছে বলে বিজিবি জানিয়েছেন। বান্দরবান জেলার নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তের রেজু আমতলী ঢালা দিয়ে শত শত রোহিঙ্গারা প্রবেশ করছে। আর তাদের গরু ছাগল স্থানীয় দুর্বত্তরা লুট করে নিয়ে যাচ্ছে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন। ২৯ আগষ্ট (মঙ্গলবার) নাইক্ষংছড়ি উপজেলা ঘুমধুম ইউনিয়নের রেজু মৌজার চিকন ছড়া, মনজয় পাড়া, ফাত্রাঝিরি, লাকড়িছড়া বাজার দিয়ে শত শত রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ ঢুকে পড়েছে। দিনের বেলায় পাহাড়ের দিকে তাড়িয়ে দিলেও রাতের আঁধারে বাঁধাহীন ঢুকে পড়ছে এসব রোহিঙ্গারা। স্থানীয় মোঃ ইউছুফ ও আবু শামা, আবুল কালাম বলেন, ওয়ালিদং, মগ পাহাড়, গাছবনিয়া, গর্জনবনিয়া, বড় খালের আগা হয়ে সোমবার ২/৩ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা নদীপথে অনুপ্রবেশ কালে বিজিবি আটকিয়ে পাহাড়ের দিকে ফেরত পাঠায়। পাহাড়ের গহীন জঙ্গলে কিছু কালো পোষাকধারী অবস্থান করছে বলে শোনা যাচ্ছে। এদিকে, মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্যাতন নিপীড়ন সহ্য করতে না পেরে এদেশে পালিয়ে আসেও রোহিঙ্গারা রেহায় পাচ্ছে। তাদের গরু ছাগল সহ নগদ টাকা পয়সা স্থানীয় দুর্বত্তরা লুটপাট করছে বলে রেজু আমতলী গ্রামের ছৈয়দ আলম জানিয়েছেন। সে জানায়, ওয়ালিদং দুই চাইল্যা পাহাড় এলাকায় গরু ছাগল ছেড়ে দিয়ে রোহিঙ্গারা প্রাণ বাঁচাতে এদেশে পালিয়ে আসছে। তারা টমটম ও সিএনজি গাড়ি যোগে রেজু আমতলী থেকে কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ঢুকে পড়ছে বলে কুতুপালং গ্রামের সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন। তাদেরকে ডব্লিউএফপি ও ইউএনএইচসিআর সাহায্য সহযোগীতা করছে। চিকিৎসার নামে এমএসএফ হল্যান্ড কর্তৃক আসা রোহিঙ্গাদের প্রাথমিক চিকিৎসা সেবা দিতেও দেখা গেছে। মিয়ানমারের এই বর্বরতা ও তান্ডব না কমলে আরকান রাজ্যে মুসলিম শূন্য হওয়ার উপক্রম দেখা দিয়েছে। রাখাইন প্রদেশে শতশত রোহিঙ্গা মুসলিমকে হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন মংডু জেলা থেকে পালিয়ে আসা কুতুপালংয়ে আশ্রয় নেওয়া আবদুল করিম। এখনো রোহিঙ্গা নিধনের তান্ডব থামানো হয়নি।
সূত্রে জানা যায়, মিয়ানমারের উত্তরাঞ্চলের রাখাইন রাজ্যে পুলিশ পোস্টে হামলার পর নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে নিহত বেড়ে ১০৪ জনে দাঁড়িয়েছে। নিহতদের মধ্যে ৯২ জন সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলিম আর ১২ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য রয়েছেন। গত বৃহস্পতিবার মধ্যরাতের পর রোহিঙ্গা যোদ্ধারা পুলিশ পোস্টে হামলা ও একটি সেনাঘাঁটিতে ঢুকে পড়ার চেষ্টা করলে এ সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। রোহিঙ্গাদের ওপর থেকে বিধিনিষেধ প্রত্যাহার এবং তাদের নাগরিকত্ব প্রদানে জাতিসংঘের সাবেক মহা-সচিব কফি আনানের নেতৃত্বাধীন একটি প্যানেলের আহ্বানের কয়েক ঘণ্টা পরই এ হামলার ঘটনা ঘটে। আরাকান রোহিঙ্গা সলভেশন আর্মি (এআরএসএ) এক টুইট বার্তায় হামলার দায় স্বীকার করেছেন। মিয়ানমার বাহিনীর বিরুদ্ধে হত্যা ও ধর্ষণের অভিযোগ এনে এআরএসএ জানায়, তারা ২৫টির বেশি এলাকায় আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। সংগঠনটির দাবি, রাখাইনের উত্তরাঞ্চলীয় রাথেতুয়াং শহর এলাকা গত দুই সপ্তাহ ধরে অবরুদ্ধ। সেখানে রোহিঙ্গারা না খেয়ে মারা যাচ্ছেন। মংডুতে তারা যখন একই কাজ করতে যাচ্ছিল, তখন বার্মিজ উপনিবেশিক বাহিনীকে হটাতে চূড়ান্ত পর্যায়ে এই পদক্ষেপ নিয়েছি। কক্সবাজার ৩৪ বিজিবির অধিনায়ক মঞ্জুরুল হাসান খান বলেন, কয়েক হাজারের অধিক রোহিঙ্গা নাফ নদীর ওপারে সীমান্তে অবস্থান নিয়েছেন।
ঘুমুধুম ইউপি চেয়ারম্যান একেএম জাহাঙ্গীর আজিজ বলেন, মঙ্গলবার পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক। মিয়ানমার থেকে আসা লোকজন বাড়ি ফিরতে শুরু করেছে। ৩৪ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্ণেল মঞ্জুরুল হাসান খান বলেন, এখন পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে।