রাখাইন ফের জ্বলছে

1_r3_c1.jpg

টেকনাফ টুডে ডেস্ক |
নিরাপত্তা বাহিনীর তাণ্ডব চলছে, নিহত বেড়ে ৯৮ * হাজার হাজার ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ * সাধারণ রোহিঙ্গাদের বিদ্রোহ গণঅভ্যুত্থানে রূপ নিয়েছে * নতুন করে বাস্তুচ্যুত অন্তত ৫০ হাজার রোহিঙ্গা * ৪ হাজার অমুসলিমকে সরিয়ে নিয়েছে সরকার
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য ফের জ্বলছে। মুসলিম সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের নিবাস এ অঞ্চলে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী ও উগ্র বৌদ্ধরা ফের তাণ্ডবলীলায় মেতেছে। অবধারিতভাবেই এর শিকার হচ্ছেন নিপীড়িত রোহিঙ্গারা। রাখাইনে গত দু’দিনের সহিংসতায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৯৮ জনে দাঁড়িয়েছে। এদের ৮২ জন রোহিঙ্গা আর ১২ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য। রোববার মিয়ানমার সরকারই এ তথ্য জানিয়েছে। খবর এএফপি, রয়টার্স, আলজাজিরা ও দ্য গার্ডিয়ানের।

রাখাইন রাজ্যের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে সহিংসতা বৃদ্ধি পেতে থাকায় সেখান থেকে অন্তত চার হাজার অমুসলিমকে সরিয়ে নেয়ার কথা জানিয়েছে মিয়ানমার সরকার। দেশটির সরকার ও স্থানীয় বাসিন্দাদের দেয়া তথ্যানুযায়ী, রাখাইনের পুরো উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলজুড়ে সামরিক বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে কয়েকশ’ রোহিঙ্গা বিদ্রোহীর লড়াই শনিবার পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। সবচেয়ে সহিংস লড়াইয়ের ঘটনাটি ঘটেছে ওই এলাকার সবচেয়ে বড় শহর মংডুর কাছে। রাখাইনের সহিংসতাকবলিত এলাকায় প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা থাকায় এবং সহিংসতার বিস্তারিত প্রতিবেদন না পাওয়ায় পরিস্থিতি সম্পর্কে পুরো ধারণা করা কঠিন হলেও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সর্বশেষ হামলাটি এত ব্যাপক ছিল যে, তা নিয়মিত বিদ্রোহীদের হামলা না হয়ে বরং আন্দোলন বা গণঅভ্যুত্থানের রূপ নিয়েছে।

মিয়ানমার সেনাবাহিনীর একটি সূত্রের বরাত দিয়ে রয়টার্সকে জানিয়েছেন, বিদ্রোহী ও বেসামরিকদের মধ্যে পার্থক্য করতে গিয়ে সামরিক বাহিনী হিমশিম খাচ্ছে। রাখাইনের ওই সূত্রটি বলেছেন, ‘গ্রামবাসী বিদ্রোহী হয়ে গেছে। তারা যা করছে তা বিপ্লবের মতো হয়ে গেছে। মরবে কী বাঁচবে পরোয়া করছে না তারা। তাদের মধ্যে কে বিদ্রোহী কে নয় তা বলতে পারছি না আমরা।’ রাখাইনের বৌদ্ধ অধিবাসীরাও ছুরি-লাঠি নিয়ে রোহিঙ্গাদের আক্রমণ করছে। গ্রামগুলোতে উত্তেজনার মধ্যে গুজব ছড়িয়ে পড়ে সেনাবাহিনী হিন্দু গ্রামবাসীদেরও টার্গেট করছে। ফলে বহু হিন্দু গ্রামবাসীও মংডু থেকে পালিয়েছে। মংডুর এক হিন্দু অধিবাসী বলেন, ‘গ্রামগুলোতে এখন কোনো নিরাপত্তা নেই।’

বৌদ্ধ গ্রামবাসী ও সেনাবাহিনীর আক্রমণ-অভিযানের মুখে প্রাণ বাঁচাতে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশ সীমান্তে অবস্থান নিয়েছেন। সেখানেও তাদের ওপর গুলি চালিয়েছে মিয়ানমারের সীমান্ত পুলিশ বিজিপি। বাংলাদেশের সীমান্ত বাহিনী বিজিবি জানিয়েছে, সীমান্তে হাজারও রোহিঙ্গা অবস্থান নিয়ে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করছেন। তবে বিজিবি সতর্ক থাকায় তারা প্রবেশ করতে পারছেন না। এএফপির একজন প্রতিবেদক জানান, শনিবার বাংলাদেশের ঘুমধুম সীমান্তে সীমান্ত পার হওয়ার চেষ্টায় থাকা রোহিঙ্গাদের একটি বড় দলকে লক্ষ্য করে মিয়ানমার নিরাপত্তা বাহিনী বেশ কয়েকটি মর্টারশেল ও মেশিনগান থেকে বেশ কয়েক রাউন্ড গুলি ছোড়ে। এ সময় গুলির হাত থেকে বাঁচতে তারা দিগি¦দিক ছোটাছুটি করতে থাকে।

আলজাজিরা জানায়, শনিবার দুপুরের পর সীমান্তে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা নারী-শিশুদের ওপর মিয়ানমারের সীমান্ত পুলিশ বিজিপি গুলি চালালে এক ভয়ানক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। তাদের আর্তনাদের বাতাস ভারি হয়ে ওঠে। কক্সবাজার বিজিবি কমান্ডার মঞ্জুরুল হাসান খান জানিয়েছেন, তিন হাজারের অধিক রোহিঙ্গা নাফ নদীর ওপারে সীমান্তে অবস্থান নিয়েছে। শুক্রবারে সহিংসতা শুরু হওয়ার পর থেকে প্রায় দুই হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করতে সক্ষম হয়েছে। তাদের অনেকেই আহত অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছে।

বৃহস্পতিবার মধ্যরাতের পর রোহিঙ্গা যোদ্ধারা পুলিশ পোস্টে হামলা ও একটি সেনাঘাঁটিতে ঢুকে পড়ার চেষ্টা করলে এ সংঘর্ষ হয়। রোহিঙ্গাদের ওপর থেকে বিধিনিষেধ প্রত্যাহার এবং তাদের নাগরিকত্ব প্রদানে জাতিসংঘের সাবেক প্রধান কফি আনানের নেতৃত্বাধীন একটি প্যানেলের আহ্বানের কয়েক ঘণ্টা পরই এ হামলার ঘটনা ঘটে। আরাকান রোহিঙ্গা সলভেশন আর্মি (এআরএসএ) এক টুইট বার্তায় হামলার দায় স্বীকার করেছে। মিয়ানমার বাহিনীর বিরুদ্ধে হত্যা ও ধর্ষণের অভিযোগ এনে এআরএসএ জানায়, তারা ২৫টির বেশি এলাকায় আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করছে।

সংগঠনটি দাবি করে, রাখাইনের উত্তরাঞ্চলীয় রাথেতুয়াং শহর এলাকা গত দুই সপ্তাহ ধরে অবরুদ্ধ। সেখানে রোহিঙ্গারা না খেয়ে মারা যাচ্ছেন। মাউংদোতেও তারা যখন একই কাজ করতে যাচ্ছিল, তখন চূড়ান্ত পর্যায়ে এই পদক্ষেপ সেনা পোস্টে হামলার সিদ্ধান্ত নেয় তারা। এরপর শুক্রবার ও শনিবার রাখাইনের রোহিঙ্গা অধ্যুষিত মাওন তাও, বুথিডাং ও রাথেডংসহ বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক অভিযান চালায় মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। এ সময় তারা হাজার হাজার ঘরবাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। অনেক এলাকায় তাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে রোহিঙ্গা যোদ্ধারা। এখনও বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চলছে। হাজার হাজার রোহিঙ্গা আটকা পড়েছে। বাস্তুচ্যুত হয়েছে অন্তত ৫০ হাজার রোহিঙ্গা। গত বছরের অক্টোবরে একটি নিরাপত্তা চৌকিতে হামলার ঘটনায় ৯ পুলিশ সদস্য নিহত হন। এরপর মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ব্যাপক অভিযান চালিয়ে রোহিঙ্গা এলাকায় হত্যাযজ্ঞ চালায়। তারা গ্রামের পর গ্রাম ঘরবাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। জাতিসংঘসহ মানবাধিকার সংগঠনগুলো দাবি করে, জাতিগত নিধন চালিয়েছে সেনাবাহিনী। সেনারা রোহিঙ্গা নারীদের ধর্ষণও করেছিল। সে সময়ে প্রায় ৮৭ হাজার রোহিঙ্গা সীমান্ত পার হয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করে। তারা কক্সবাজারের বিভিন্ন শরণার্থী ক্যাম্পে অবস্থান করছেন।