ভারতে ‘ধর্ষণ গুরু’র সহিংসতায় ৫ শতাধিক গ্রেফতার : কে এই ধর্মগুরু রাম রহিম?

rr_56335_1503722499.jpg

ভারতে ‘ধর্ষণ গুরু’র সহিংসতায় ৫ শতাধিক গ্রেফতার
ভারতের হরিয়ানা রাজ্যে ‘ধর্ষণ গুরু’ খ্যাত ধর্মগুরু গুরু রাম রহিম সিংয়ের সাজার ঘোষণায় ছড়িয়ে পড়া সহিংসতার ঘটনায় ৫০০ শতাধিক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে পাঞ্জাব ও হরিয়ানা এলাকার ধর্মীয় উসকানিদাতাদের গ্রেফতার ও অস্ত্র উদ্ধারের জন্য চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছে হরিয়ানার সিনিয়র পুলিশ কর্মকর্তা রাম নিয়াজ। খবর আল জাজিরার।

শুক্রবার হরিয়ানা রাজ্যের পঞ্চকুলার বিশেষ সিবিআই আদালত বাবা রামকে ধর্ষণ মামলায় দোষী সাব্যস্ত করে রায় ঘোষণা করে।

সোমবার তার বিরুদ্ধে সাজা ঘোষণা করবে আদালত। আইন অনুযায়ী তার সাত বছরের কারাদণ্ড হতে পারে।

রায় ঘোষণার পরপরই পাঞ্জাব ও হরিয়ানা রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। লাঠি, বাঁশ, ইট-পাথর নিয়ে পুলিশের ওপর হামলে পড়ে ধর্মগুরুর সমর্থকরা। পুলিশও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ ও গুলি চালায়।

সহিংসতার জেরে ৩১ জন নিহত ও দেড়শতাধিক ব্যক্তি আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে পাঁচকুলা ছাড়াও পাঞ্জাবের ভাতিন্ডা, মনসা, মুকতাসর, ফিরোজপুরে কারফিউ জারি করে। তবে শনিবার কারফিউ প্রত্যাহার করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, হরিয়ানার সিরসা শহরের কাছে অবস্থিত এলাকার ডেরা সাচা সওদার সদর দফতরের ভেতরে একজন শিষ্যকে রাম রহিম নিয়মিত ধর্ষণ করেন বলে অভিযোগ ওঠে।

ধর্ষিতা ২০০২ সালে থানায় মামলা দায়ের করেন। এতে তিনি দাবি করেন, ১৯৯৯ সালে রাম রহিম তাকে ধর্ষণ করেন।

কে এই ধর্মগুরু রাম রহিম?

দীর্ঘ ১৫ বছর আগের একটি ধর্ষণ মামলাকে কেন্দ্র উত্তাল ভারতের হরিয়ানা ও পাঞ্জাব রাজ্য। এর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন এ মামলায় অভিযুক্ত এক ধর্মগুরু। তিনি স্বঘোষিত ধর্মগুরু। তবে ভক্তও তার কম নয়। বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা এ ধর্মগুরু শুধু ধর্মীয় ক্ষেত্রেই পরিচিত নন। তিনি সিনেমার পর্দায় নায়ক, গায়ক এবং পরিচালক। আবার সমাজ সংস্কারকও বটে।

স্বঘোষিত ধর্মগুরু থেকে সিনেমার নায়কের রুপালি চিত্র তুলে ধরা হল :

পুরো নাম গুরমিত রাম রহিম সিং। ১৯৬৭ সালের ১৫ আগস্ট রাজস্থানের গঙ্গানগর জেলার শ্রী গুরুসর মোদিয়া গ্রামে জন্ম। গ্রামের স্কুল থেকেই পড়াশোনা করেন তিনি। ১৯৯০ সালে ডেরা সাচ্চা সৌদা সংগঠনের প্রধান নির্বাচিত হন। রাম রহিমের তিন মেয়ে ও এক ছেলে। দলিত ও পিছিয়ে পড়া শ্রেণীর মানুষের মধ্যে তিনি খুব জনপ্রিয়। রক্তদান শিবির, বৃক্ষরোপণের মতো কাজ করেন নিয়মিত। অনলাইনে যোগের প্রশিক্ষণও দেন তিনি। দামি কাপড় ও গয়না পরার কারণে রাম রহিম ‘গুরু অব ব্লিং’ নামেও পরিচিত।

রাম রহিমের প্রায় পাঁচ কোটি ভক্ত। পাঞ্জাব ও হরিয়ানার শহর ও গ্রামাঞ্চলে ডেরা সাচ্চার বহু কেন্দ্র রয়েছে। হরিয়ানার সিরসায় প্রায় ৮০০ একর জমির ওপর ডেরা রয়েছে। ২০০৩ সালে বিশ্বের বৃহত্তম রক্তদান শিবিরের আয়োজন করে গিনেজ রেকর্ড করে ডেরা সাচ্চা। রাজনৈতিক দিক থেকেও যথেষ্ট প্রভাবশালী রাম রহিম। ২০১৪ সালে হরিয়ানার নির্বাচন এবং ২০১৫ সালে দিল্লির নির্বাচনে তার সংগঠন বিজেপিকে সমর্থন করে।

২০০২ সালে সিরসার এক সাংবাদিক রাম চন্দ্র ছত্রপতি এবং ডেরার ম্যানেজার রঞ্জিত সিংকে খুনের অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। ২০০২ সালে এক শিষ্য রাম রহিমের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ এনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারি বাজপেয়িকে চিঠি লেখেন। এ নিয়ে মামলা হয় সিবিআই আদালতে। ২০০৭ সালে শিখ ধর্মের ভাবাবেগে আঘাত করার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে আরেকটি মামলা হয়। ২০০৯ সালে হরিয়ানার সিরসা আদালত এবং ২০১৪ সালে ভাতিণ্ডা আদালত সেই মামলা খারিজ করেন।

২০১৪ সাল থেকে তিনি সিনেমা প্রযোজনা ও অভিনয় শুরু করেন। এ পর্যন্ত তার এমএসজি : দ্য মেসেঞ্জার, এমএসজি২ দ্য মেসেঞ্জার, এমএসজি : দ্য ওয়ারিয়র লায়ন হার্ট নামে তিনটি ছবি মুক্তি পেয়েছে। ভারতে যে ৩৬ জন ভিভিআইপি জেড ক্যাটাগরির সুরক্ষা পান, রাম রহিম তাদের মধ্যে একজন। ব্রিটেনের ওয়ার্ল্ড রেকর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি পেয়েছেন। দাদাসাহেব ফালকে ফিল্ম ফাউন্ডেশন থেকে ২০১৬ সালে সবচেয়ে জনপ্রিয় অভিনেতা, নির্দেশক এবং লেখকের সম্মাননা পান রাম রহিম। এনডিটিভি।