কলেজ ড্রেসের ‘কালো ব্যাজে’ তরুণীর হত্যারহস্য উদ্ঘাটন

arrest_24574_1473305464.jpg

বিয়েতে রাজি না হওয়ায় হত্যা করে প্রেমিক

টেকনাফ টুডে ডেস্ক :
ঘটনাটি ২৩ দিন আগের। রাজধানীর মোহাম্মদপুরের একটি হোটেলে স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে কক্ষ ভাড়া নেয় তরুণ-তরুণী। তারপর তরুণীর গলায় দড়ি পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যার চেষ্টা করে পালিয়ে যায় তরুণ। ওই তরুণীকে মুমূর্ষু অবস্থায় দেখতে পায় হোটেল কর্তৃপক্ষ। খবর পেয়ে তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠায় পুলিশ। হাসপাতালে ভর্তির ১২ দিন পর ২০ জুলাই চিকিৎসাধীন অবস্থায় তরুণীর মৃত্যু হয়। তখনও মেলেনি ওই তরুণীর পরিচয়। পুলিশ তখনও জানে না হত্যারহস্য। তাই লাশ বেওয়ারিশ হিসেবে আঞ্জুমানে মুফিদুল ইসলামের মাধ্যমে দাফন করা হয়।
ঘটনা তদন্তে নেমে কোনো কূলকিনারা করতে পারছিল না পুলিশ। হোটেলের নথিতে থাকা ঠিকানা ও মোবাইল ফোন নম্বর ছিল ভুয়া। একপর্যায়ে পুলিশ ওই তরুণীর ড্রেস (পোশাক) নিয়ে পর্যালোচনা শুরু করে। ড্রেসটি ছিল সাদা, একপাশে ছিল কালো কাপড়ের ব্যাজ। এটা দেখে পুলিশ মোটামুটি নিশ্চিত হয়, ওই তরুণী কোনো কলেজের শিক্ষার্থী হবে। খোঁজ নিয়ে জানতে পারে, রাজধানীতে অন্তত ৮টি কলেজে এ ধরনের ড্রেস রয়েছে। এসব কলেজে খোঁজ নেয়া শুরু করে পুলিশ। ড্রেসের সূত্র ধরে পুলিশ রামপুরার একরামুন্নেসা ডিগ্রি কলেজে যায়। জানা যায়, ওই কলেজের এক ছাত্রী নিখোঁজ। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ছবি দেখালে তারা নিশ্চিত করেন, ওই তরুণী দ্বাদশ শ্রেণীর বাণিজ্য শাখার শিক্ষার্থী মিথিলা আক্তার। এরপর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে মিথিলার মোবাইল ফোন নম্বর সংগ্রহ করে পুলিশ। ওই নম্বরের সূত্রেই শুক্রবার আমিনবাজার থেকে গ্রেফতার হয় তরুণীর প্রেমিক আসলাম হোসেন। মিরপুর বাঙলা কলেজের বিবিএ’র শিক্ষার্থী আসলাম পুলিশের কাছে হত্যাচেষ্টার ঘটনা অকপটে স্বীকার করেছে। আসলাম জানায়, দীর্ঘদিন ধরে মিথিলার সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্ক ছিল। মিথিলাকে সে বিয়ে করতে চেয়েছিল। কিন্তু মিথিলা রাজি হচ্ছিল না। তার ধারণা ছিল, মিথিলার সঙ্গে অন্য কারও প্রেমের সম্পর্ক রয়েছে। বিষয়টি মেনে নিতে পারছিল না সে। এ কারণে ঘটনার দিন সকালে কৌশলে মিথিলাকে মোহাম্মদপুরে ডেকে আনে আসলাম। আসলাম পুলিশকে জানায়, ৮ জুলাই সকাল সাড়ে ৮টার দিকে তারা মোহাম্মদপুরের বিজলী মহল্লার তাজিন আবাসিক হোটেলের ১০৭ নম্বর কক্ষে স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে ওঠেন। হোটলে ওঠার সময় নথিতে আশরাফ নাম ব্যবহার করেছিল আসলাম।

মিথিলাকে হত্যা করতে ব্যাগের মধ্যে একটি রশি নিয়েছিল আসলাম। দুপুর ১২টার দিকে মিথিলার পেছন থেকে গলায় রশি পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে। কিছুক্ষণ পর মিথিলা আর নড়াচড়া না করায় মৃত্যু হয়েছে ভেবে সে মিথিলার মোবাইল ফোনটি নিয়ে সাভারের আমিনবাজারে চলে যায়। সেখানে মিথিলার মোবাইল ফোন থেকে তার বাবাকে এসএমএস পাঠিয়ে বলে, ‘আমরা ভালো আছি। আমাদের জন্য কোনো চিন্তা করো না।’ এরপর মিথিলার সিমটি ফেলে দেয়। নিজের মোবাইল ফোনের সিমটিও বদল করে।

মোহাম্মদপুর থানার পরিদর্শক (অপারেশন) শরীফ উদ্দিন যুগান্তরকে বলেন, তদন্তে নেমে মিথিলার পরিচয় নিশ্চিত হতে পারছিলাম না। তাই হত্যারহস্য উদ্ঘাটন করাও সম্ভব হচ্ছিল না। পরে কলেজ ড্রেসের সূত্র ধরে মিথিলার পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চত হই। এরপর তার পরিবারের সঙ্গে কথা বলে হত্যার সম্ভাব্য কারণের ধারণা পাই। মিথিলার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনের কললিস্টের সূত্রে আসলামকে গ্রেফতার করি।

মিথিলা রামপুরার পূর্ব হাজীপাড়ার ৪৮/১ নম্বর বাসার নিচতলায় বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকত। তার বাবা গিয়াসউদ্দিন জমি কেনাবেচার ব্যবসা করেন। মা মিনারা আক্তার গৃহিণী। দুই বোন এক ভাইয়ের মধ্যে সে ছিল সবার বড়। মঙ্গলবার বিকালে পূর্ব হাজীপাড়ায় কথা হয় মিথিলার বাবা-মায়ের সঙ্গে। বাবা গিয়াসউদ্দিন বলেন, আমার মেয়ে মিথিলাকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন ছিল। এখন সবই শেষ। মা মিনারা আক্তার বলেন, আমার নিষ্পাপ মেয়েটাকে এভাবে হত্যা করল আসলাম। তার কঠিন সাজা চাই আমি। পুলিশ জানায়, আসলামের গ্রামের বাড়ি পিরোজপুর। ঢাকায় সে মেসে থেকে লেখাপড়ার পাশাপাশি একটি জুস কোম্পানিতে চাকরি করছিল।