সাবেক এমপি কাদের খানের নির্দেশে খুন : সংসদ সদস্য লিটন হত্যা মামলা

abdul-kader-mp_40173_1487686394_40233_1487720182.jpg

টার্গেট ছিল এমপি হওয়া * হত্যায় ব্যবহৃত হয় লাইসেন্স করা অস্ত্র * ৬ দিন কার্যত গৃহবন্দি থাকার পর গ্রেফতার

ভাড়াটে সন্ত্রাসী দিয়ে গাইবান্ধা-১ (সুন্দরগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) মনজুরুল ইসলাম লিটনকে খুন করান একই আসনের সাবেক এমপি ডা. কর্নেল (অব.) আবদুল কাদের খান। হত্যাকাণ্ডে ব্যবহার করা হয়েছে তারই লাইসেন্স করা অস্ত্র। টানা ৬ দিন কার্যত গৃহবন্দি করে রাখার পর মঙ্গলবার বগুড়ার শহরের বাসা থেকে জাতীয় পার্টির (জাপা) সাবেক এ এমপিকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

গ্রেফতারের পর তাকে গাইবান্ধা জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয়ে রাখা হয়েছে। বুধবার তাকে এমপি লিটন হত্যা মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে ১০ দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে পাঠানো হবে।

কাদের খানের পরিকল্পনায়, তার নির্দেশে ও তার লাইসেন্স করা অস্ত্র ব্যবহার করে ভাড়াটে সন্ত্রাসী দিয়ে এমপি লিটনকে খুন করার বিষয়টি যুগান্তরকে নিশ্চিত করেছেন জেলা পুলিশ সুপার আশরাফুল ইসলাম।

তিনি রাতে টেলিফোনে বলেন, ‘খুনের মোটিভ এখনও আমরা শতভাগ নিশ্চিত হতে পারিনি। তাকে (কাদের খান) রিমান্ডে এনে এ বিষয়ে বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।’ সূত্র জানায়, কাদের খানের পরবর্তী টার্গেট ছিল সুন্দরগঞ্জ উপজেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী।

কাদের খান ২০০৮ সালে গাইবান্ধা-১ আসনে জাতীয় পার্টি থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। তবে জাতীয় পার্টির মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার বলেছেন, ‘ডা. কর্নেল (অব.) কাদের খান ৩ বছর আগেই জাতীয় পার্টি ছেড়েছেন। তার সঙ্গে এখন পার্টির কোনো সম্পর্ক নেই।’

গাইবান্ধায় আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার দায়িত্বশীল একাধিক কর্মকর্তা মঙ্গলবার যুগান্তরকে জানান, ‘বহু দিনের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এমপি মনজুরুল ইসলাম লিটনকে খুন করা হয়। ডা. কর্নেল (অব.) কাদের খানের রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ থেকেই প্রাণ যায় লিটনের। হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত হয় কাদের খানের লাইসেন্স করা অস্ত্র। তিনি চেয়েছিলেন এ আসনের এমপি হবেন। লিটন ছিল তার পথের কাঁটা। লিটনকে সরিয়ে দেয়া সম্ভব হলে তিনি এক প্রকার বিনা বাধায় এ আসনের এমপি হতে পারবেন। এ উচ্চাভিলাষ থেকেই খুন করা হয় লিটনকে। তিনি কিলার হিসেবে ৭ লাখ টাকায় ভাড়া করেন তার ঘনিষ্ঠ মেহেদীকে। সে দলে নেয় আবদুল মান্নান ও শাহীনসহ আরও কয়েকজনকে। ইতিমধ্যে কিলিং মিশনে অংশ নেয়া মেহেদী, শাহীন ও মান্নান আদালতে হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে। তারা এমপি লিটনকে খুনের বিস্তারিত বিবরণও দিয়েছে।’

দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা আরও জানান, এমপি লিটন খুন হওয়ার পর আমরা মূলত তিনটি বিষয়কে মোটিভ ধরে কাজ করি। তার একটি ছিল রাজনৈতিক মোটিভ। আমরা তদন্ত করে দেখার চেষ্টা করেছি এমপি লিটনের অবর্তমানে সেখানে রাজনৈতিকভাবে কারা কারা লাভবান হবেন। এক্ষেত্রে সাবেক এমপি ডা. কর্নেল (অব.) কাদের খানের নাম আসে। তদন্তে আরও দেখা যায়, কাদের খান বহুবার সুন্দরগঞ্জে অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করেন। এমপি লিটনকে বেকায়দায় ফেলতে পূজামণ্ডপে হামলা ও সংখ্যালঘু নির্যাতনসহ বেশ কিছু নাশকতা ঘটান কাদের খান। এসবের দায়ভার পড়ে এমপি লিটনের ওপর। এর মাধ্যমে তিনি সুন্দরগঞ্জের সাধারণ মানুষকে এমপি লিটনের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলারও চেষ্টা করেন। এমনকি সুন্দরগঞ্জে এমপি লিটনের গুলিতে এক স্কুলছাত্র গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর তিনি (কাদের খান) স্থানীয় লোকজনকে বিভিন্নভাবে উসকানি দিয়েছিলেন।’

লিটন হত্যা মামলার তদন্তে যুক্ত এক কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, এমপি লিটন খুন হওয়ার পর প্রথমদিকে কাদের খানকে কেউ সন্দেহই করেননি। লিটনের সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ, স্ত্রীর ব্যবসা, শ্যালকদের অবস্থা, শ্বশুরবাড়ির জামায়াত কানেকশন- এসব নিয়েই ব্যস্ত ছিল তদন্ত দল। কাদের খানের লাইসেন্স করা অস্ত্র থানায় জমা দেয়ার পর তার ব্যবহৃত গুলির একটি ক্লু ধরে তদন্তের মোড় ঘুরে যায়। সন্দেহের তালিকায় রাখা হয় কাদের খানকে। গ্রেফতার করা হয় কাদের খানের ঘনিষ্ঠ ক্যাডার মেহেদী, মান্নান ও শাহীনকে। তাদের স্বীকারোক্তি ও তদন্তের পরই আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী অনেকটা নিশ্চিত হয়ে হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী, নির্দেশদাতা, অর্থদাতা ও অস্ত্র সরবরাহকারী হিসেবে কাদের খানকে গ্রেফতার করেছে। কাদের খানের জমা দেয়া ব্যক্তিগত অস্ত্রের গুলির মাপ ও এমপি লিটন হত্যায় ব্যবহৃত গুলির সাদৃশ্য রয়েছে কিনা, তা যাচাই করে দেখা হচ্ছে। অস্ত্রগুলো শিগগিরই সিআইডির ফরেনসিক ল্যাবে পাঠানো হবে।

যুগান্তরের বগুড়া ব্যুরো ও গাইবান্ধা প্রতিনিধি জানান, মঙ্গলবার বিকাল ৫টার দিকে বগুড়া শহরের রহমান নগরের বাসা কাম ক্লিনিক থেকে কাদের খানকে গ্রেফতার করা হয়। এ বিষয়ে গাইবান্ধার সিনিয়র এএসপি রেজিনুর রহমান (সি সার্কেল) বলেন, এমপি লিটন হত্যা মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আবদুল কাদের খানকে গ্রেফতার করে গাইবান্ধায় নেয়া হয়েছে। কাদের খানের বাসায় তল্লাশি করে কিছু পাওয়া যায়নি। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে তাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হয় বলেও তিনি জানান। গাইবান্ধা স্পেশাল ব্রাঞ্চের ইন্সপেক্টর মাহবুব আলমও একই তথ্য জানান।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে গাইবান্ধার পুলিশ সুপার আশরাফুল ইসলাম বলেন, কাদের খানের ঘনিষ্ঠজন ও ক্যাডার হিসেবে পরিচিত মেহেদী, শাহীন ও হান্নানকে ইতিমধ্যে গ্রেফতার করা হয়েছে। তারা আদালতে ১৬৪ ধারায় দায় স্বীকার করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। তার ভিত্তিতেই এমপি লিটন খুনের সঙ্গে কাদের খানের সম্পৃক্ততার বিষয়ে খোঁজখবর নিতে শুরু করে পুলিশ। তাদের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে নিশ্চিত হওয়ার পরই কাদের খানকে গ্রেফতার করা হয়। এ বিষয়ে বিস্তারিত কোনো তথ্য দিতে রাজি হননি পুলিশ সুপার। বিস্তারিত জানাতে আজ তার কার্যালয়ে প্রেস ব্রিফিং করা হবে বলেও জানান তিনি।

জানা যায়, বগুড়া শহরের রহমান নগরে জেলাদারপাড়ায় পাঁচতলা বাড়ি কাদের খানের। ওই ভবনে তিনি একটি ক্লিনিক পরিচালনা এবং পরিবার নিয়ে বসবাস করেন। তার স্ত্রী গাইনি বিশেষজ্ঞ ডা. এজেইউ নাসিমা বেগম। কাদের খানের ক্লিনিকের ম্যানেজার সুমন জানান, বৃহস্পতিবার বিকাল ৪টার দিকে কাদের খান বগুড়ার বাসায় আসেন। ওই রাত ১০টার পর পোশাকে ও সাদা পোশাকে একদল পুলিশ কাদের খানের বাসার সামনে অবস্থান নেয়।

তার স্ত্রী ডা. নাসিমা বেগম জানান, বাসার সামনে অবস্থান নেয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন নিরাপত্তাজনিত কারণে তারা বাসার সামনে অবস্থান নিয়েছেন। গত কয়েক দিন পুলিশ আমাদের বাসা থেকে বের হতে দেয়নি। পুলিশ কাদের খানকে কোনো ওয়ারেন্ট ছাড়াই নিয়ে গেছে। তারা কোনো ওয়ারেন্ট দেখাতে পারেনি।

কাদের খানের বড় ভাই অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক খিজির উদ্দিন খান বলেন, পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে এটি একটি ষড়যন্ত্র। এদিকে জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য ও গাইবান্ধা জেলা সভাপতি সাবেক এমপি আবদুর রশিদ সরকার বলেন, কাদের খান বর্তমানে দলের কোনো পদ বা দায়িত্বে নেই।

২০১৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর মনজুরুল ইসলাম লিটন নিজ বাড়িতে দুর্বৃত্তের গুলিতে খুন হলে আসনটি শূন্য হয়। ওই আসনের উপনির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে এবং ২২ মার্চ ভোট গ্রহণের কথা রয়েছে।