চকরিয়ায় স্বামীর নির্যাতনের শিকার গৃহবধু তাহেরা দেখছে শুধু অন্ধকার

6.jpg

এম.জিয়াবুল হক, চকরিয়া :
চকরিয়া নিউ মার্কেটের ইসু ভিডিও দোকানের মালিক মনিরুল ইসলাম মনিরের গ্রামের বাড়ি মহেশখালী উপজেলার কুতুবজোম ইউনিয়নের খন্দকারপাড়া গ্রামে। তিনি ওই গ্রামের মরহুম মোস্তাক আহমদ প্রকাশ মোস্তাক খলিফার ছেলে। প্রথমে মনির বিয়ে করেন একই উপজেলার ছোট মহেশখালী ইউনিয়নের দক্ষিন নরবিলা গ্রামের মাওলানা মোহাম্মদ ইসমাইলের মেয়ে জাকেয়া বেগমকে। বিয়ের পর তিনি স্ব-পরিবারে বসবাস করতেন চকরিয়া সদরে। সংসারে তাদের কোলজুড়ে জন্ম নেয় সেইদিনের শিশু ইবনু ও শিবনু। ২০০১ সালের ২৬ নভেম্বর ছোট ছেলের জন্মেরদিন জাকেয়া বেগম প্রসব বেদনায় হাসপাতালে মারা যান। এরপর পারিবারিক ও সামাজিক স্বজনদের চাপের কারনে কলেজ জীবনের লেখাপড়া শেষ হওয়ার আগে দুলাভাই মনিরের সাথে বিয়ের পিড়িতে বসেন তাহেরা বেগম।
২০০২ সালের ১২ জানুয়ারী কক্সবাজার সদর উপজেলা নিকাহ রেজিষ্ট্রার কার্যালয়ে তাদের বিয়ে হয়। ১৫বছরের সংসার জীবনে তাদের কুলে এসেছে দুই মেয়ে সন্তান। কিন্তু এতদিন পর এসে গত ৭-৮বছর ধরে স্বামী মনির ফের ভোল্ট পাল্টাতে শুরু করে। চলে স্ত্রী তাহেরা বেগমের উপর শাররীক ও মানষিক নির্যাতন। সন্তানদের লেখাপড়া এমনকি খাওয়া ধাওয়া হচ্ছে নাকি উপোষ থাকছে তারও খবর নেয়না মনির। সব দোষ স্ত্রী তাহেরা বেগমের উপর চাপিয়ে দিয়ে তিনি এখন নতুন অপর এক মেয়েকে ঘরে তুলতে বিভোর হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তাহেরা বেগমের স্বজনরা। স্বজনদের অভিযোগ, প্রথম স্ত্রী জাকেয়া বেগমের সংসারে দুই ছেলে রয়েছে। শ্যালিকা তাহেরা বেগমের দ্বিতীয় সংসারে রয়েছে দুই মেয়ে সন্তান। সংসারে চারজন সন্তান ও স্ত্রী থাকার পরও মনিরুল ইসলাম এখন নানা ধরণের চলচাতুরীর আশ্রয় নিয়ে স্ত্রী তাহেরা বেগমকে বাড়ি থেকে তাড়ানোর জন্য অপচেষ্ঠা চালাচ্ছে। বাড়িতে এসে নানা কারনে ইস্যু বানিয়ে স্ত্রী তাহেরা বেগমকে নির্যাতন করছে। আবার মাসের পর মাস বাড়িতে না এসে অন্যত্র থাকছে। থানায় অভিযোগ দিয়ে স্ত্রী ও সন্তানদেরকে ভয়ভীতি দেখাচ্ছে।
২০০১ সালের ২৬ নভেম্বর বড়বোন জাকেয়া বেগম প্রসব বেদনায় সয্যাসয়ী হয়ে হাসপাতালে মারা যান। বোন মারা গেলে এতিম হয়ে যায় তার দুই ছেলে সন্তান আল শাহরিয়ার ইসলাম ইবনু ও আল তাহরিয়ার শিবনু। বর্তমানে ইবনু ঢাকার নামকরা কলেজে পড়ছেন। এবছর এইচএসসি পরীক্ষা দেবে। অপরদিকে ছোট ভাই শিবনু পড়ছেন চকরিয়া গ্রামার স্কুলের নবম শ্রেনীতে। বড়বোনের মৃত্যুর ৪০ দিনের ভেতর সেই সময়ের দুলাভাই (বর্তমান স্বামী) মনিরুল ইসলাম মনিরের চকরিয়া বালক উচ্চ বিদালয়ের পাশের বাড়িতে পা রাখেন তাহেরা বেগম। ইতোমধ্যে তাদের সংসার হয়েছে ১৫বছর। নতুন সংসারে দুইজনের কোলজুড়ে আসে দুই মেয়ে। তাদের মধ্যে তাফান্নুমা ইসলাম সাওয়ান পড়ছেন চকরিয়া গ্রামার স্কুলের সপ্তম শ্রেণীতে, আর ছোটজন তারান্নুম ইসলাম ইলমুন পড়ছেন একই স্কুলে দ্বিতীয় শ্রেনীতে।
ভুক্তভোগী তাহেরা বেগম জানান, আমার বড়বোন মারা যাওয়ার পর পারিবারিক চাপে ও দুই ভাগ্নের ভবিষ্যত চিন্তা করে আমি তাঁর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হই। এখন আমার সংসারে দুই মেয়ে সন্তান রয়েছে। বিয়ের পর কয়েকবছর সুখের মাধ্যমে সংসার জীবন অতিবাহিত করলেও গত ৭-৮বছর ধরে হঠাৎ করে পাল্টে যেতে শুরু করে মনির। নানা কারনে আমাকে নির্যাতন করছে। সন্তানদের লেখাপড়া, থাকা খাওয়ার কোন খবর নিচ্ছেনা। চকরিয়া সদরের দি জামান হোটেলের অংশিদার মনির প্রথমে সন্তানদের জন্য খরচাপাতি বাবতে হোটেল থেকে মাসে কিছু কিছু টাকা দিত। কিন্তু এখন কোন ধরণের টাকা পয়সা দিচ্ছেনা। এমনকি হোটেলে গেলে কর্মরতরা তাকে (স্ত্রী তাহেরা বেগম) কোন ধরণের টাকা না দিতে সে (মনিরুল) বারণ করেছে বলে জানায়।
তাহেরা বেগমের অভিযোগ, কয়েকবছর ধরে স্বামী মনিরুল ইসলাম চারিত্রিকসহ নানা বিষয়ে পরিবর্তন ঘটেছে। রাতে বাড়িতে ফিরেনা। থাকে অন্যত্র। ফোন করলে কোন মহিলাকে ফোন ধরিয়ে দেয়। জানতে চাইলে বলে এসব মোবাইল কোম্পানীর অপারেটর মহিলা নাকি কথা বলেছে। এসব বিষয় নিয়ে প্রতিবাদ করলে শুরু করে শাররীক ও মানসিক নির্যাতন। এভাবে চলে আসছে দীর্ঘদিন।
ভুক্তভোগীরা তাহেরা বেগমের দাবি, বড়বোনের দুই ছেলে ও আমার সংসারে থাকা দুই মেয়ের ভবিষ্যত চিন্তা করে আমি শত কষ্টের পরও স্বামীর সংসারে থাকতে চাই। কিন্তু মনিরুল নাছোড় বান্দা আমাকে ডির্ভোস দেবে। এ জন্য সে বিভিন্ন স্থানে বলাবলি করছে। আমি বিয়ের পর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ওইসময় মনির বলে আমার এত টাকা আছে। চাকুরীর দরকার নেই। কিন্তু এখন সে আমার কাছ থেকে সবকিছু কেড়ে নিয়ে আমাকে তাড়িয়ে দিতে চায়। এখন আমি নিরুপায়। আমি সন্তানদের জন্য হলেও সংসার রক্ষা করতে চাই। এই জন্য প্রশাসনের সকলস্থরের কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিদের কাছে সুবিচার চাই। আমাকে রক্ষা করুন।
তাহেরা বেগম বলেন, বর্তমানে তাদের মধ্যে সৃষ্ট পারিবারিক মনোমালিন্যের বিরোধের বিষয়টি চকরিয়া পৌরসভার ২নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর রেজাউল করিমের কাছে বিচারধীন রয়েছে। বিচার কাজেও স্বামী মনিরুল ইসলাম নানাভাবে প্রপাগান্ডা ছড়িয়ে তাকে নাজেহাল করার চেষ্ঠা করছেন বলে অভিযোগ করেন তাহেরা। তারপরও সংসার রক্ষার জন্য হলেও তিনি একটি ন্যায় বিচারের আশায় রয়েছেন।
চকরিয়া পৌরসভার ২নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও পৌরসভা আওয়ামীলীগের যুগ্ম সম্পাদক রেজাউল করিম বলেন, মনিরুল ইসলাম ও তার স্ত্রী তাহেরা বেগমের পারিবারিক বিরোধের বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে একবার বৈঠক অনুষ্টিত হয়েছে। বৈঠকে প্রাথমিকভাবে দুই পক্ষের অভিযোগ আপত্তি নেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, আগামী ১৭ ফেব্রুয়ারী ফের বিষয়টি নিয়ে বৈঠকের সময় দেয়া হয়েছে। আশাকরি উভয়পক্ষ সংসারটি টিকিয়ে রাখতে একটি সিদ্বান্তে উপনীত হবে। তা না হলে উভয়পক্ষের মতামত নিয়ে বিষয়টি আমি আদালতের কাছে পাঠিয়ে দেব।