রোহিঙ্গারা ভিক্ষার জন্য অপেক্ষা করছে রাস্তায়

.jpg

মুহাম্মদ হানিফ আজাদ, উখিয়া :
রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির গুলোতে নেই কোন নিয়মনীতি। যে যার ইচ্ছে মতো ক্যাম্প থেকে জেলার বিভিন্ন স্থানে যাচ্ছে এবং আসছে। এমনকি জেলার বাইরেও ইতিমধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে রোহিঙ্গারা। কারো কাছে নেই কোন জবাবদিহিতা। মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে আইন শৃংখলা বাহিনীও যেন নিস্ক্রীয়। এমনকি বিনা বাধায় যেদিকে খুনি সেদিকেই যাচ্ছে রোহিঙ্গারা। বিশেষ করে ক্যাম্প অধ্যুষিত এলাকা কক্সবাজার-টেকনাফ সড়কের দু’পাশে ধরেই রোহিঙ্গারা জটলা বেঁধে বসে থাকে ভিক্ষার আশায়। রোহিঙ্গারাদের ভাষ্যমতে, এভাবে আর কতদিন উপোষ থাকা যায়? এই প্রতিবেদক সরেজমিনে গেলে চোখে পড়ে এসব চিত্র। কক্সবাজার-টেকনাফ আরকান সড়কের পশ্চিম পাশেই এই শিবিরের অবস্থান। প্রায় ৩ কিলোমিটার দক্ষিণে বালুখালী নামক স্থানে নতুন করে গড়ে উঠেছে আরো একটি অনিবন্ধিত শরণার্থী ক্যাম্প। এই কুতপালং ও বালুখালী রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির ছাড়াও টেকনাফ উপজেলার নয়াপাড়া, লেদা ও শামলাপুরেও রয়েছে রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্প। এসব ক্যাম্প গুলোতে নিবন্ধিত ৩২ হাজার রোহিঙ্গা ছাড়াও জেলার বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে অনিবন্ধিত প্রায় সাড়ে ৫ লাখ রোহিঙ্গা। জাতিসংঘের তথ্যানুযায়ী ইতিমধ্যেই নুতন করে ৬৫ হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থী এসব এলাকায় আশ্রয় নিয়েছে। কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ২ কিলোমিটারের মধ্যে সড়কের পাশে একটু পরে একের পর এক জটলা বেঁধে বসে আছে রোহিঙ্গারা। সড়কে চলাচলরত প্রতিটি গাড়ি থামানোর চেষ্টা করে তারা। গাড়ি থামলেই হামড়ে পড়ে ভিক্ষার আশায় রোহিঙ্গারা। মিয়ানমারের মংডু উপজেলার কিয়ারি পাড়া, নাফ পুরা, সিকদার বিল এলাকায় থেকে আসা রোহিঙ্গা নারী আলমাছ খাতুন (৫০), জরিনা খাতুন (৫৫), আনোয়ারা বেগম (৬০) ও ফাতেমা বেগম (৪০)। এদের কেউ এক সপ্তাহ আবার ১৫ দিন আগে কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং ক্যাম্পে এসেছেন। কিন্তু ক্যাম্পে এসেই ঘটে বিপত্তি। মাসে ৩শ থেকে ৫শ টাকা পর্যন্ত ঝুঁপড়ি ঘরের ভাড়া এবং পেটের ক্ষুধা মেটাতে তাদের বাধ্য হয়ে রাস্তা নামতে হয়েছে। শুধু তারা নয় এদের মত একাধিক নারী পুরুষের সাথে কথা হলে তারা জানান, মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসার সময় জীবনের শেষ সম্ভবটুকু ইতিমধ্যেই শেষ হয়ে গেছে। ক্যাম্পে আর্ন্তজাতিক দাতা সংস্থা গুলো সামান্য ত্রান সামগ্রী বিতরণ করলেও কেউ পাচ্ছে আর কেউ খালি হাতে ফেরৎ যাচ্ছে। তাই অনেকেই দীর্ঘদিন উপবাস রয়েছে। এক বেলা খেলে ২ বেলা খেতে পারেনা। এছাড়াও ক্যাম্পের ঝুঁপড়ি ঘরের ভাড়া মেটাতে বাধ্য হয়ে রাস্তায় নেমে এসেছেন তারা। কুতুপালং ক্যাম্পমূখী গাড়ি অল্প কিছু দূর গিয়ে দেখা যায় নারী পুরুষের পাশাপাশি শিশুরাও সারিবদ্ধ ভাবে রাস্তার দু’পাশে রয়েছে ভিক্ষার আশায়। মিয়ানমারের মংডু উপজেলা চালিপ্রাং গ্রাম থেকে এসেছেন রহিম উদ্দিনের ছেলে আবদুল হাকিম (৫০)। তার ২ ভাই ১ মেয়েকে মিয়ানমার সেনা বাহিনী নির্যাতন করে হত্যা করেছে। তাই তিনি স্ত্রী ২ ছেলে ও ১ মেয়েকে নিয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছেন। আমির হোছন বলেন, শুধু সে নয় তার মত একই এলাকার আলী আকবর, অহিদুল হক, আলী আহমদ ও মিয়ানমারের সেনা বাহিনীর নির্যাতনের নানা গল্প শুনিয়েছেন। তাদের পাশাপাশি ৬ বছরের শিশু তাহের আলী, আবদুল করিম, ছমি উদ্দিন ভয়াবহ নির্যাতনের বর্ণনা দিয়েছেন। এদের কেউ বাবাকে, আবার কেউ মাকে হারিয়ে কুতুপালং ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছেন। করছেন ভিক্ষা বৃত্তি। কোন সময় দিনে ২শ থেকে ৩শ টাকা ঝুটলেও অনেক সময় ১ টাকাও ঝুটেনা। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে উখিয়া রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন কমিটির আহবায়ক অধ্যক্ষ হামিদুল হক চৌধুরী বলেন, রোহিঙ্গারা রাস্তায় ভিক্ষা করতে করতে যখন এক পর্যায়ে ভিক্ষাও মিলবে তখন সড়ক ডাকাতির মত পরিস্থিতি শিকার হবে আমাদের। ইতিমধ্যে এলাকায় চুরি ডাকাতি বেড়ে গেছে। তাই দ্রুত রোহিঙ্গাদের আর্ন্তজাতিক মহলের সহযোগীতায় যত দ্রুত সম্ভব মিয়ানমারে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য সরকারের কাছে দাবী জানিয়েছেন। উখিয়া থানার ওসি আবুল খায়ের বলেন, উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কড়া নির্দেশনা রয়েছে। যে রোহিঙ্গা যাতে করে নির্দিষ্ট এলাকার বাইরে যেতে না পারে সেক্ষেত্রে কিছুদিন আগে তিনি সহ উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাঈন উদ্দিনের নেতৃত্বে উখিয়া থানার পুলিশ ক্যাম্প এবং আশপাশের এলাকা পরিদর্শন করে নিষেধ করা হচ্ছে। বিশেষ করে রাস্তার পাশে ভিক্ষা বৃত্তি না করতে কড়া ভাষায় নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। উল্লেখ্য, ২০১৬ সালের অক্টোবর মাসের ৯ তারিখ বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী মিয়ানমারের অভ্যন্তরীন এলাকায় সন্ত্রাসীদের হামলায় ৯ পুলিশ সহ ১৪ জন নিহত হয়। এর পর রোহিঙ্গাদের উপর চালানো হয় চরম নির্যাতন। আর তখন থেকে শুরু হয় সেনাবাহিনীর দমন নিপিড়ন প্রক্রিয়া। মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের দাবী এর পর থেকে রাখাইন রাজ্যে ক্লিয়ারেন্স অপারেশন চালিয়ে যাচ্ছেন তারা। জাতিসংঘ এর মধ্যে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠিকে জাতিগত ভাবে নির্মূল করার অভিযোগ এনেছে। আর্ন্তজাতিক মানবাধিকার সংস্থা গুলো রোহিঙ্গা নারীদের গণধর্ষন নানা নির্যাতন সহ মানবতা বিরোধী কর্মকান্ডের অভিযোগ তোলা হয়। কিন্তু এর পরও হাজার হাজার রোহিঙ্গা মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর নির্যাতনের মূখে সীমান্ত ফাঁড়ি দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকে পড়ে। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী এ পর্যন্ত ৬৫ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে চলে এসেছে।