ঠেঙ্গার চরে কেন যাচ্ছেনা রোহিঙ্গারা?

tengharchar.jpg

ভোটার তালিকায় অন্তর্ভূক্তি * ইয়াবা বানিজ্য * বৈবাহিক সম্পর্ক অন্যতম কারন *

মুহাম্মদ হানিফ আজাদ, উখিয়া :
পর্যটন এলাকা কক্সবাজারের আইনশৃংখলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রন রাখার লক্ষ্যে সরকার মিয়ানমার থেকে এদেশে অনুপ্রবেশ করা কক্সবাজারের উখিয়া টেকনাফে অবস্থান করা রোহিঙ্গাদের নোয়াখালীর হাতিয়ার ঠেঙ্গার চরে নিয়ে যাওয়ার সিন্ধান্ত নেয়। ইতিমধ্যে রোহিঙ্গাদের ঠেঙ্গার চরে নিয়ে যাওয়ার জন্য সরকার প্রাথমিক প্রস্তুতিও সম্পন্ন করেছে সরকার। কিন্ত রোহিঙ্গারা ঠেঙ্গার চরে যেতে নারাজ।
তারা উখিয়া-টেকনাফে থাকতে চায়, অন্যতায় মিয়ানমারে ফিরে যেতে চায়। এজন্য দীর্ঘদিন ধরে ক্যাম্পে অবস্থান করা রোহিঙ্গা নেতারা বিভিন্ন ভাবে প্রভাবশালী নেতা, এনজিও সংস্থা ও আন্তজার্তিক সম্প্রদায়ের কাছে ধর্ণা দিচ্ছে। ইংরেজীতে পারদর্শী রোহিঙ্গারা বাংলাদেশী মোবাইল কোম্পানীর সিম ব্যবহার করে ই-মেইল সহ তথ্য প্রযুক্তির বিভিন্ন মাধ্যমে আন্তজার্তিক ভাবে লবিং করে যাচ্ছে। ফলে ঠেঙ্গার চর ইস্যুটি বর্তমানে আলোচিত ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।
কেন রোহিঙ্গারা ঠেঙ্গার চর যেতে চাচ্ছেনা। নেপথ্যের কারন অনুসন্ধান করতে গিয়ে উঠে এসেছে অনেক কিছু। বিশেষ করে বিপুল পরিমান রোহিঙ্গা স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ম্যানেজ করে ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভূক্ত হয়েছে। তাছাড়া কেউ স্থায়ীভাবে ব্যবসা করছে, কেউ করেছে বিয়ে। মানবপাচার সহ বেশীর ভাগ রোহিঙ্গা জড়িয়ে গেছে ইয়াবা বানিজ্যে।
এপার-ওপারে রোহিঙ্গাদের অনেকেই ইয়াবা ব্যবসার নিয়ন্ত্রক। তাই ঠেঙ্গার চরে নিয়ে গেলে সবচেয়ে বিপদে পড়বে তারা। এজন্য প্রভাবশালী রোহিঙ্গা নেতাদের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ভাবে লবিং এর জন্য মোটা অংকের টাকার মিশন নিয়ে নেমেছে রোহিঙ্গারা। তাদের উদেশ্যে, যে করেই হোক, রোহিঙ্গাদের ঠেঙ্গার চরে নিয়ে যাওয়া যাবেনা। এছাড়া সম্প্রতি উখিয়ার কুতুপালং ও টেকনাফের নয়াপাড়া ক্যাম্প ও বস্তিতে আইএমও, মুক্তি, এমএসএফ হল্যান্ড, এসিএফ, মুসলিম এইড ও শেড, শেফ সহ বিভিন্ন এনজিও সংস্থা রোহিঙ্গাদের জন্য বিভিন্ন উন্নয়ন মূলক কাজ করে যাচ্ছে। ফলে এসব এনজিও গুলোও চাচ্ছেনা রোহিঙ্গাদের ঠেঙ্গার চরে পুনবাসন করা হোক।
এদিকে সরজমিন কুতুপালং ও বালুখালী বস্তি এলাকা ঘুরে দেখা যায়, নোয়াখালীর ঠেঙ্গার চরে নিয়ে যাওয়ার সরকারি ঘোষনায় সাধারন রোহিঙ্গাদের অনেকেই ক্যাম্প ও বস্তি ছেড়ে চলে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন স্থানে। মিয়ানমারের মংডু নাইচ্ছংপাড়া গ্রামের আলি হোসেন (৫৫) পরিবার পরিজন ও সরঞ্জামাদি নিয়ে সড়কের কিনারায় অপেক্ষা করছে। জানতে চাওয়া হলে জানায়, কক্সবাজার এলাকায় তার আত্মীয় স্বজন রয়েছে। সেখানে চলে যেতে গাড়ীর জন্য অপেক্ষা করছে। এভাবে অসংখ্য রোহিঙ্গা পরিবার প্রতিদিন কুতুপালং বস্তি ও ক্যাম্প ছেড়ে অন্যত্রে চলে যাওয়ার সত্যতা স্বীকার করে কুতুপালং রোহিঙ্গা বস্তি ব্যবস্থাপনা কমিটির সেক্রেটারী মোহাম্মদ নুর জানায়, কুতুপালং বস্তির ঠিকানায় এসে রোহিঙ্গারা প্রথমে কয়েকদিন আশ্রয় নিলেও নোয়াখালী নিয়ে যাওয়ার সরকারি ঘোষনা পরবর্তীতে অধিকাংশ রোহিঙ্গা কাউকে না জানিয়ে অন্যত্রে চলে যাচ্ছে। স্থানীয় ইউপি সদস্য বখতিয়ার আহমদ জানান, অনিবন্ধিত ও সদ্য অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গারা অবাধ বিচরণ করার সুযোগ পেয়ে তাদের পছন্দের জায়গায় চলে যেতে সক্ষম হচ্ছে। যেহেতু এসব রোহিঙ্গাদের নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার তেমন কোন দায়ী দায়িত্ব নেই বললে চলে।
জানা গেছে, ১৯৯১ সালে উখিয়া টেকনাফ সীমান্তে নাফ নদী অতিক্রম করে মিয়ানমারের প্রায় ২ লক্ষ ৪৮ হাজার ৫৩০ জন রোহিঙ্গা নাগরীক স্বপরিবারে উখিয়া, টেকনাফ ও রামু উপজেলার বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় নেয়। এ সময় সরকার আশ্রয় কেন্দ্র খোলে এসব রোহিঙ্গাদের থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থা করে। পরবর্তীতে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত ২ লক্ষ ৩৬ হাজার ৫৯৯ জন রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে ফেরৎ পাঠাতে সরকার সক্ষম হলেও উখিয়ার কুতুপালং শরনার্থী ক্যাম্পে প্রায় সাড়ে ১০ হাজার ও টেকনাফের নয়াপাড়া শরনার্থী ক্যাম্পে প্রায় ১৪ হাজার রোহিঙ্গা রয়ে যায়। যেসব রোহিঙ্গারা রেজিষ্ট্রেশনের আওতায় এসে সরকারী সাহায্য সহযোগীতা ভোগ করার পাশাপাশি সীমান্ত অতিক্রম করে প্রায় ১ লাখ রোহিঙ্গা উখিয়ার কুতুপালং সরকারী বনভুমির জায়গা দখল করে অবস্থান নেয়। একই ভাবে টেকনাফের লেদা এলাকায় লক্ষাধিক রোহিঙ্গা নাগরীক বস্তি গেড়ে বসবাস শুরু করে। সেই থেকে এসব রোহিঙ্গারা চুরি, ডাকাতি, বেইশ্যা বৃত্তি সহ নানা অপরাধ মূলক কর্মকান্ডে সম্পৃক্ত হয়ে এসব রোহিঙ্গারা সামাজিক পরিবেশ অস্থিতিশীল করে তুলেছে। হাতাহাতি, মারামারি, খুন এদের নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত কয়েক বছর ধরে কুতুপালং রোহিঙ্গা বস্তি এলাকা হয়ে উঠেছে মাদাক সেবীর ও মাদক পাচারের নিরাপদ আস্তানা হিসাবে। এখানে হাতবাড়ালেই পাওয়া যাচ্ছে ইয়াবা সহ নানা রকমের মাদক দ্রব্য। কুতুপালং বস্তি হয়ে মিয়ানমারের তৈরী ইয়াবার চালান ছড়িয়ে পড়ছে সারা দেশে। র‌্যাব, পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা রোহিঙ্গা বস্তিতে বেশ কয়েকবার অভিযান চালিয়ে ইয়াবা সহ পাচারকারীদের গ্রেফতার করলেও থেমে নেই ইয়াবা ব্যবসা। এর আগে কুতুপালং ক্যাম্প ইনচার্জ রেজিষ্ট্রার্ড রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অভিযান চালিয়ে জাল টাকা, টাকা তৈরীর সরঞ্জাম ও স্থানীয় নাগরীকত্ব সনদ পত্র সহ ৩ জন রোহিঙ্গা নাগরীককে গ্রেফতার করে। এছাড়া বিপুল পরিমান রোহিঙ্গা স্থানীয় প্রভাবশালী নেতাদের ম্যানেজ করে উপজেলায় প্রণীত ভোটার তালিকায় স্থান করে নিয়েছে।
এ ব্যাপারে উখিয়া উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির চেীধুরী জানান, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে দ্বি-পাক্ষিক আলোচেনার মাধ্যমে রোহিঙ্গা বিষ ফোঁড়া দ্রুত সমাধান করা না গেলে দেশের দক্ষিণ পূর্বাঞ্চল তথা বৃহত্তর চট্টগ্রাম বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি, লামা, আলিকদম ও কক্সবাজার জেলার উখিয়া-টেকনাফের স্থানীয় অধিবাসীরা নাগরিক সুবিধা নিয়ে হুমকির মুখে পড়ার আশংকা রয়েছে। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রোহিঙ্গাদের কক্সবাজার থেকে সরিয়ে নেওয়ার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা দ্রুত কার্যকর করার দাবী জানান তিনি। স্থানীয় পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান গফুর উদ্দিন চৌধুরী স্থানীয় জনগনের জন্য রোহিঙ্গাদের বিষফোড়া আখ্যায়িত করে বলেন, রোহিঙ্গাদের কারনে তার ইউনিয়নে আইনশৃংখলা বিরোধী কর্মকান্ড বেড়ে গেছে, রোহিঙ্গাদের নিয়ন্ত্রন করা না গেলে নিয়ন্ত্রনহীন এসব রোহিঙ্গা বাংলাদেশের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। তিনি রোহিঙ্গাদের দ্রুত অন্যত্র সরিয়ে নিতে সরকারের প্রতি অনুরোধ জানান।