মিয়ানমারের নাগরিকত্ব ফেলে রোহিঙ্গারা টেঙ্গার চরে যেতে রাজি

Rohingha_6543.jpg

মুহাম্মদ হানিফ আজাদ, উখিয়া :
মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব নিশ্চিত ও সেদেশে ফিরিয়ে দিতে সরকার নিশ্চয়তা দিলে রোহিঙ্গারা টেঙ্গার চরে যেতে রাজি বলে রোহিঙ্গারা অভিমত ব্যক্ত করেছেন।
উখিয়া টেকনাফ থেকে রোহিঙ্গাদের হাতিয়ার ঠেঙ্গার চরে নিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে সরকার। ইতিমধ্যে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নোয়াখালীর হাতিয়ার ঠেঙ্গার চরে পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে সহায়তা ও কৌশল ঠিক করতে দাতাদের সঙ্গে পরামর্শ করার জন্য পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম আগামী তিন মাসের মধ্যে বাংলাদেশে বসবাস করা রোহিঙ্গাদের ডাটাবেজ তৈরি করার কথা জানিয়েছেন। পররাষ্ট প্রতিমন্ত্রীর মতে, বহু রোহিঙ্গা বাঙালিদের সঙ্গে সমাজের মধ্যে মিশে গেছে। তাই রোহিঙ্গাদের নিদ্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করার জন্য স্থানীয় কমিটি করা হয়েছে। তাদের চিহ্নিত করা হবে স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের সহায়তায়। রোহিঙ্গাদের ডাটাবেজের সুবিধা সম্পর্কে তিনি বলেন, ডাটাবেজ প্রস্তুত হলে মিয়ানমার সরকার অথবা বিদেশি রাষ্ট্র বা সংস্থার সঙ্গে কাজ করতে ও কথা বলতে অনেক সুবিধা হবে। তিনি আরো বলেন,গত বছর করা এক শুমারিতে দেখা গেছে,বাংলাদেশে প্রায় তিন লাখ অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা আছে। তার উপর গত অক্টোবরে মিয়ানমারে নিরাপত্তা বাহিনীর অত্যাচার শুরু হওয়ার পর এ যাবত প্রায় ৬৫ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে। কক্সবাজারের কুতুপালং ও নয়াপড়া ক্যাম্পে আছে ৩২ হাজারের বেশি নিবন্ধিত রোহিঙ্গা। প্রথম পর্যায়ে নিবন্ধিত রোহিঙ্গাদের সরিয়ে নেওয়ার কাজ করবে সরকার। কিন্তু সরকারের এসব পরিকল্পনার সাথে ভিন্নমত রোহিঙ্গা নেতাদের। নেতাদের মতে, বিশাল রোহিঙ্গা সম্প্রদায় কক্সবাজার ছেড়ে অন্যত্র সরে যেতে চায়না। তাদের দীর্ঘদিনের পরিচিত কক্সবাজারেই থেকে যেতে চায় তারা। তবে সরকারের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে স্থানীয় জনগন। স্থানীয়রা মনে করে, মিয়ানমার থেকে এদেশে আসা রোহিঙ্গাদের নিয়ন্ত্রণ না করায় তারা দিনের পর দিন বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। যে যার মত করে যত্রতত্র অবস্থান নিয়ে দেশের আইন শৃংখলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাচ্ছে। এমনকি ওই সব রোহিঙ্গারা মাদক, অস্ত্র, চোরাচালানসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধজনক কাজে জড়িয়ে পড়ছে। এ সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের উচ্চ পর্যায়ের কুটনৈতিকদের নিয়ে একাধিকবার বৈঠক হলেও কার্যত ফলপ্রসু হয়নি। যে কারণে রোহিঙ্গা সমস্যা দিন দিন প্রকট আকার ধারণ করছে। জনশ্র“তি রয়েছে প্রভাবশালী রোহিঙ্গারা এ দেশীয় মৌলবাদী সংগঠনের সাথে জড়িত রয়েছে। ২০০৫ সালের জুলাই মাসে প্রত্যাবাসন কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কক্সবাজার জেলার উখিয়া-টেকনাফের দু’টি শরণার্থী শিবিরে ৩০ হাজারের অধিক তালিকাভুক্ত ও শিবিরের আশপাশে বন বিভাগের জায়গা জবর দখল করে অবস্থান করছে ২ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা। ওই সব রোহিঙ্গারা সরকারী ভাবে ত্রাণ সামগ্রী না পাওয়ায় বস্তির অভ্যন্তরে ও বাহিরে গিয়ে নানা ধরনের অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার চোখকে ফাঁকি দিয়ে। তাই সরকার রোহিঙ্গাদের ডাটাবেজ তৈরীর মাধ্যমে কেক্সবাজার থেকে সরিয়ে নেওয়ার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্থানীয় জনগন তা সাধুবাদ জানালেও নিবন্ধিত ৩০ হাজারের অধিক রোহিঙ্গা উখিয়ার কুতুপালং ও টেকনাফের নয়াপাড়া ক্যাম্প থেকে সরে যেতে মোটেই রাজি নয়। উখিয়ার কুতুপালং রেজিষ্ট্রাট ক্যাম্প কমিটির চেয়ারম্যান আবু সিদ্দিক ও রোহিঙ্গা নেতা শামশু মাঝি, হাফেজ জালাল, সিরাজুল মোস্তফা ও কুতুপালং রেজিষ্ট্রার্ট ক্যাম্পের চেয়ারম্যান আলী আহাম্মদ সহ একাধিক রোহিঙ্গা নেতা জানান, রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরৎ যেতে নাগরিকত্ব সহ ৩ দফা দাবী দাওয়া সরকার নিশ্চিত করতে পারলে তারা টেঙ্গার চরে যাবে। অন্যথায় যেখানে আছে সেখানেই থাকতে রাজি। তাদের মতে উখিযা টেকনাফে অবস্থান করলে তারা মাঝে মধ্যে মিয়ানমারে থাকা তাদের আত্বীয় স্বজনদের সাথে দেখা সহ খোঁজখবর নেওয়ার সুযোগ পায়। কিন্তু তাদের ঠেঙ্গার চরে নিয়ে গেেেল অপরিচিত জায়গায় তাদের সে সুযোগ থাকবেনা। তাই তারা উখিয়া টেকনাফ ছেড়ে যাবেনা। এ ব্যাপারে উখিয়া উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির চেীধুরী জানান, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে দ্বি-পাক্ষিক আলোচেনার মাধ্যমে রোহিঙ্গা বিষ ফোঁড়া দ্রুত সমাধান করা না গেলে দেশের দক্ষিণ পূর্বাঞ্চল তথা বৃহত্তর চট্টগ্রাম বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি, লামা, আলিকদম ও কক্সবাজার জেলার উখিয়া-টেকনাফের স্থানীয় অধিবাসীরা নাগরিক সুবিধা নিয়ে হুমকির মুখে পড়ার আশংকা রয়েছে। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রোহিঙ্গাদের কক্সবাজার থেকে সরিয়ে নেওয়ার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা দ্রুত কার্যকর করার দাবী জানান তিনি। স্থানীয় পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান গফুর উদ্দিন চৌধুরী স্থানীয় জনগনের জন্য রোহিঙ্গাদের বিষফোড়া আখ্যায়িত করে বলেন,রোহিঙ্গাদের কারনে তার ইউনিয়নে আইনশৃংখলা বিরোধী কর্মকান্ড বেড়ে গেছে, রোহিঙ্গাদের নিয়ন্ত্রন করা না গেলে নিয়ন্ত্রনহীন এসব রোহিঙ্গা বাংলাদেশের জন্য হুমকি হয়ে দাড়াবে। তিনি রোহিঙ্গাদের দ্রুত অন্যত্র সরিয়ে নিতে সরকারের প্রতি অনুরুধ জানান। উখিয়ার রোহিঙ্গা প্রত্যাবাশন সংগ্রাম কমিটির আহবায়ক অধ্যক্ষ হামিদুল হক চৌধুরী জানান, সরকার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তাতে আমরা স্বাগত জানাচ্ছি। তবে রোহিঙ্গারা যাতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে না পড়ে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।