রোহিঙ্গা নারীদের নিয়ে বিদ্রোহী গ্র“পগুলোর বহু মাত্রিক বাণিজ্য

DSC_4443.jpg

রোহিঙ্গা নারী ফাইল ছবি

এইচএম এরশাদ ॥
মিয়ানমার থেকে সদ্য অনুপ্রবেশকৃত রোহিঙ্গাদের নিয়ে বহু মাত্রিক বাণিজ্য চালাচ্ছে রোহিঙ্গা বিদ্রোহী গ্র“পের ক্যাডাররা। যুবতীদের মাজলুমা নামে বিয়ে দিতে অবৈধ পথে পাচার করছে পাকিস্তানে। ওমরা হজের নামে বাংলাদেশী পাসপোর্ট নিয়ে পার করিয়ে দেয়া হচ্ছে সৌদি আরবে। আবার কেউ কেউ রোহিঙ্গাদের অসহায়ত্বের কথা বলে বিদেশী সংস্থার কাছ থেকে টাকা এনে আত্মসাত করে চলছে। ওসব কর্মকান্ডে জড়িত রয়েছে একাধিক রোহিঙ্গা বিদ্রোহী গ্র“প ও কতিপয় স্থানীয় দালাল। গত ১৮ জানুয়ারি চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে সৌদি আরব পাঠানোর সময় ইমিগ্রেশন পুলিশ সাত রোহিঙ্গা নারীকে আটক করেছে। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে আটক তরুণীরা মিয়ানমারের রোহিঙ্গা নাগরিক বলে স্বীকার করেছে।
সূত্র জানায়, মিয়ানমার থেকে ভিটা-মাটি ত্যাগ করে বাংলাদেশে পালিয়ে এসে আশ্রয় নেয়া কিছু সংখ্যক রোহিঙ্গা পরিবারের সঙ্গে ভাব জমিয়ে তাদের ভবিষ্যত উজ্জল হওয়ার আশ্বাস দেয় আরএসও ক্যাডাররা। পরে তাদের যুবতী মেয়েদের এসে তুলে দেয়া হয় দালাল চক্রের হাতে। এদেশীয় মেয়েদের পোষাক পরিয়ে ক্যাম্প থেকে রোহিঙ্গা যুবতীদের নিয়ে আসা হচ্ছে ঢাকায়। সেখান থেকে ওমরা হজ পালনের নামে পাঠানো হয় সৌদি আরবে। অপরদিকে বেনাপুল হয়ে দালালের মাধ্যমে অবৈধ ভাবে ওসব যুবতীকে পাঠানো হচ্ছে পাকিস্তানে। রোহিঙ্গা ললনাদের পাকিস্তানে পাঠাতে ঢাকা-টেকনাফ কেদ্রিক গঠিত এক সিন্ডিকেট গোপনে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। সৌদি আরবে যাওয়ার প্রাক্কালে চট্টগ্রাম বিমান বন্দর থেকে উদ্ধার হওয়া সাত রোহিঙ্গা নারী হচ্ছে- মঞ্জিলা বেগম, ছেনোয়ারা আক্তার, মোবাশ্বেরা খানম, আয়েশা বেগম, রহিমা খাতুন, জোসনা আক্তার ও রোকসানা বেগম। পাসপোর্টে রাঙ্গুনিয়া, বাঁশখালী, কুমিল্লা, কুষ্টিয়ার, চাঁদপুর ও বগুড়া জেলায় তাদের ঠিকানা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তারা আসলেই রোহিঙ্গা ললনা। তাদের মোটা অঙ্কের টাকায় বিক্রি করে দিয়েছে দালাল চক্র। ওসব রোহিঙ্গা মহিলা জানে শুধু তারা বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়ে সৌদি আরব যাচ্ছে এবং সেখানে তাদের বিয়ে এবং গৃহকর্মীর চাকরি হবে।
সূত্র আরও জানায়, মোচনী শরনার্থী ক্যাম্প, লেদা, বাহারছড়া, বালুখালী, কুতুপালং ও উনচিপ্রাং ইত্যাদি এলাকা হতে রোহিঙ্গা যুবতীদের এনে টেকনাফের পূর্ব সিকদার পাড়া, পশ্চিম পানখালী ও হোয়াকিয়া পাড়ায় জমায়েত করা হয়। তাদের বাংলাদেশী পোষাক তথা থ্রি পিচ ও আধুনিক ডিজাইনের বোরকা পরিয়ে পাঠানো হয়েছে ঢাকায় নির্ধারিত স্থানে।
স্থানীয় একাধিক সূত্র মতে, পানখালীর মৌলভী আবদু শুক্কুর, ইয়াবা সম্রাট মৌলবি নুর মোহাম্মদ গত এক মাসে অন্তত দুই’শ রোহিঙ্গা নারী ক্যাম্প-বস্তি থেকে ঢাকায় নিয়ে গেছে। তারা রোহিঙ্গা যুবতিদের দালালদের মাধ্যমে সংগ্রহ করে থাকে। দালালরা অসহায় রোহিঙ্গা পিতা-মাতাকে বুঝিয়ে তাদের মেয়েকে বিদেশে বিয়ে দিলে পরবর্তীতে তাদেরও স্থান হবে বলে প্রলোভন দেয়। পরবর্তীতে ওইসব রোহিঙ্গা অভিভাবকও বাংলাদেশে স্থায়ী বসবাসের আশায় মেয়েকে তুলে দিচ্ছে দালাল চক্রের হাতে। ইতোমধ্যে মুছুনি, বাহারছড়া ও কুতুপালং ক্যাম্পের নতুন রোহিঙ্গা যুবতি অনেকে সৌদি আরব ও পাকিস্তান পৌছে গেছে বলে সূত্র দাবী করেছে।
সূত্রে জানা যায়, মংডু খিয়ারী প্যারাং এলাকার ফাতেমা বিবি, চুয়াংখালীর মুরশিদা বেগম, মহিশকুমের জুহুরা খাতুনসহ ৫রোহিঙ্গা ললনা পাকিস্তানে পৌছে ক্যাম্পে থাকা তাদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলেছে। স্কাইপির মাধ্যমে কথা বলার সময় তারা জানিয়েছে, দালালরা তাদেরকে প্রথমে ঢাকায় নিয়ে এনে অপেক্ষায় রাখে ১০দিন। তারপর বেনাপুল দিয়ে দালালের মাধ্যমে পৌছানো হয় ভারতে। সেখান থেকে ৩দিন ট্রেনে করে এলাহাবাদে পৌছানো হয়। এলাহাবাদ থেকে রাতের আধারে কাটা তাঁরের বেড়া অতিক্রম করে পাকিস্তানে পার করে দেয়া হয়েছে। সেখান থেকে পুরো ১দিন দালালের রিজার্ভকরা কালো নোয়াহ গাড়িতে চড়ে ওরা ৫জন করাচিতে পৌছেছে। ওই ৫জনের মধ্যে ৪জনের বিবাহ হয়ে গেছে বলে তারা জানিয়েছে। উল্লেখিত তিন দালাল একেকজন রোহিঙ্গা যুবতী বাবদ ৩০হাজার টাকা হারে নিয়ে থাকে ঢাকা কেন্দ্রিক দালালদের কাছ থেকে।
এদিকে আরএসও, আরআইএফ ও আল এ্যাকিনের সদস্যরা রোহিঙ্গাদের অসগায়ত্বের দোহাই তুলে লাখ লাখ টাকা আনছে বিদেশ থেকে। বিপুল টাকা একাউন্টে জমা হলে সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষ কৈফিয়ত তলব করে থাকে বলে রোহিঙ্গা জঙ্গীরা তাদের ধারন পাল্টে ফেলেছে। টেকনাফ থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত অন্তত ১০হাজার রোহিঙ্গার ব্যাংক একাউন্টে ১-২লাখ করে ওই টাকা আনছে বিদেশ থেকে। রোহিঙ্গাদের সাহায্যের জন্য মালয়েশিয়া, কাতার, তুরস্ক ও সৌদি আরবে বাংলাদেশী পাসপোর্ট নিয়ে পুরনো রোহিঙ্গা নেতা কেউ কেউ পাড়ি দিয়েছে ইতোমধ্যে। আরও অনেকে ওসব দেশ ছাড়াও বিভিন্ন দেশে রোহিঙ্গাদের সাহায্য আনার নামে রওনা দিতে প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানা গেছে। সচেতন মহল জানান, মিয়ানমারে উত্তপ্ত পরিস্থিতি সৃষ্টি করে দিয়ে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা আনার পেছনে কারণ একটাই। আর তা হচ্ছে রোহিঙ্গা বিদ্রোহী গ্র“পের সদস্যরা কাড়ি কাড়ি বিদেশী টাকার পাহাড় গড়া এবং বিত্তভৈববের মালিক বনে যাওয়া। এসব বন্ধকল্পে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরী বলে মনে করেন তারা। স্থানীয়রা আরও জানায়, যেভাবে প্রতিদিন অনপ্রবেশকারী রোহিঙ্গারা বিভিন্ন জনপদে ছড়িয়ে ছিটিয়ে স্থানীয় জনস্রোতে মিশে যাচ্ছে, তাতে করে ওই সকল এলাকায় মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিঘিœত হচ্ছে আইনশৃংখলা পরিস্থিতি। বাড়ছে সামাজিক অপরাধও। অচিরে এদের সুষ্ঠু নজরদারীতে আনা না গেলে ধীরে ধীরে নতুন করে আসা অধিকাংশ রোহিঙ্গা জনস্রোতে মিশে যাবে। সমাজ ও রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপে সম্পৃক্ত হয়ে দেশের স্বাভাবিক পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করে তুলবে তারা। সমাজে ও বিভিন্ন স্থানে ঘাপটি মেরে থাকা প্রতিক্রিয়াশীলচক্র বা গোষ্ঠী এদের সহায়ত্ব ও জরিপগত পরিসংখ্যান দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে দেশের স্বার্থবিরোধী তৎপরতায় ব্যবহার করার আশঙ্কা রয়েছে। সূত্র: জনকণ্ঠ