কুতুপালং বস্তির অর্ধ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা নিয়ন্ত্রণ করছে স্বঘোষিত চেয়ারম্যান আবু সিদ্দিক

Ukhiya-Pic-25-01-2017.jpg

মুহাম্মদ হানিফ আজাদ, উখিয়া
কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলা পরিষদ বা ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত কোন চেয়ারম্যান নন। স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধিত্ব করা ব্যক্তির মধ্যেও তার অত্বিস্ত খুঁজে পাওয়া যাবেনা। তবুও তিনি চেয়ারম্যান! বলছিলাম, স্বঘোষিত উখিয়া উপজেলার কুতুপালং ক্যাম্পের অবৈধ রোহিঙ্গা বস্তির চেয়ারম্যান আবু সিদ্দিকের কথা। স্থানীয় সরকারের চেয়ারম্যান না হয়েও তিনি বিগত কয়েক বছর ধরে রোহিঙ্গা বস্তিতে চালিয়ে যাচ্ছেন চেয়ারম্যান গিরি। এক প্রকার রাম- রাজত্ব কায়েম করেছেন রোহিঙ্গা বস্তিতে। বিয়ে করেছেন ৬ টি। এর মধ্যে আবার অন্যজনের স্ত্রীও রয়েছে। নারীলোভী এ চেয়ারম্যানের সহযোগী হিসেবে ক্যাম্প বস্তির বিশাল এলাকা শাসন করে যাচ্ছেন ৪৩ জনের একটি সিন্ডিকেট। চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে উক্ত সিন্ডিকেটের হাতে নিয়মিত বিচার সালিশ থেকে শুরু করে বিভিন্ন অবৈধ কর্মকান্ড পরিচালিত হচ্ছে। নেপথ্যে থেকে চেয়ারম্যানের এসব কাজে সহযোগিতা করে যাচ্ছেন স্থানীয় এক প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা ও রোহিঙ্গাদের নিয়ে কাজ করা আইএমও সহ কয়েকটি এনজিও সংস্থা। কুতুপালং রোহিঙ্গা বস্তির স্বঘোষিত এ চেয়ারম্যানের সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, মানব পাচার, মাদক ব্যবসা, অস্ত্র ব্যবসা, জঙ্গি তৎপরতা অনেকটা অবাধেই চলছে।
বিভিন্ন সূত্রে জানায়, উখিয়া উপজেলার কুতুপালং রোহিঙ্গা বস্তিতে চেয়ারম্যান আবু সিদ্দিকের নেতৃত্বে ৪৩ জনের উক্ত সিন্ডিকেট প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার ইয়াবা ক্যাম্প এলাকায় মজুদ করার পর দেশের বিভিন্ন স্থানে পাচার করে যাচ্ছে। মানব পাচার ও অবৈধ অস্ত্র ব্যবসাও নিয়ন্ত্রণ করছে এ সিন্ডিকেট। বিভিন্ন স্থান থেকে লোকজনকে অপহরণ করে ক্যাম্প এলাকার বস্তি ও জঙ্গলে বেঁধে রেখে মুক্তিপণ আদায়ের ঘটনাও ঘটছে প্রতিনিয়ত। ক্যাম্প ও রোহিঙ্গা বস্তির আধিপত্য বিস্তার নিয়ে চেয়ারম্যান গ্র“পের সাথে সংঘর্ষে গত ৪ বছরে ক্যাম্পের অভ্যন্তরে খুন হয়েছে ৮ জন। রোহিঙ্গাদের মাঝে ছোটখাট বিষয় নিয়ে বিরোধ মিমাংসার নামে প্রতিদিন রাতে চেয়ারম্যানের নির্ধারিত স্থানে চলে বিচার-শালিস। উক্ত শালিসে নিরীহ রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে পুলিশ ও প্রশাসনের ভয় দেখিয়ে হাজার হাজার টাকা চাঁদা আদায় করে আত্মসাৎ করে থাকে চেয়ারম্যান সিন্ডিকেট। ইতিপূর্বে উক্ত চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে লালিত সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে ব্যাপক হারে মাদক ব্যবসা, ছিনতাই, চুরি সহ নানা অপরাধ জনিত কর্মকান্ডের অভিযোগে স্থানীয় শতাধিক রোহিঙ্গা প্রশাসনের নিকট লিখিত অভিযোগ দিয়েছিলেন। কিন্ত কাজ হয়নি।
অভিযোগ রয়েছে, ক্যাম্প এলাকায় অবৈধভাবে বসবাস করা ১০ হাজার পরিবারের মধ্যে ৫০ হাজার লোকজনের থেকে মাসে ২০০ টাকা করে ভাড়া (চাঁদা) আদায় করছে এই সিন্ডিকেট। প্রতিমাসে চাঁদার বাইরেও নানা অজুহাতে টাকা আদায় করা হয়ে থাকে। সাধারন রোহিঙ্গাদের অভিযোগ, চেয়ারম্যান সিন্ডিকেটকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছে স্থানীয় এক প্রভাবশালী নেতা ও কয়েকটি এনজিও সংস্থা। কারা এই কমিটি তৈরি করেছে সাধারণ রোহিঙ্গারা এর কিছুই জানে না। বস্তির রোহিঙ্গারা শুধু জানে তাদের চেয়ারম্যান আবু সিদ্দিক। চেয়ারম্যান বিয়ে করেছেন ৬ টি। এর মধ্যে ২টি বিয়ে করেছেন মিয়ানমারে। একটি কক্সবাজারের চকরিয়ায়। বর্তমানে যে ৩ টি রয়েছে তাদের মধ্যে কুলসুমা খাতুন এনজিও সংস্থা এসিএফে ও শহর বানু এনজিও সংস্থা আইওএমে কর্মরত। দু,জনই রোহিঙ্গা বস্তির ই-২ ব্লকের বাসিন্দা। বাকী জনের নাম জমিলা বেগম। সে বস্তির মাহমুদুল হকের স্ত্রী ছিল। মাহমুদুল হকের ঘরে ২ সন্তানও রয়েছে তার। কিন্তু চেয়ারম্যান আবু সিদ্দিকের লোলুপ দৃষ্টি পড়ে সুন্দরী জমিলা বেগমের উপর। বিগত ৩ বছর পূর্বে চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে সিন্ডিকেট মাহমুদুল হককে মারধরপূর্বক তার সুন্দরী স্ত্রী জমিলা বেগমকে তুলে এনে বিয়ে করে। ৪৩ জনের সিন্ডিকেটের মধ্যে চেয়ারম্যান আবু সিদ্দিকের সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসেবে দ্বায়িত্ব পালন করেন যথাক্রমে সিরাজুল মোস্তফা ও মোহাম্মদ জিয়া। সিন্ডিকেটের অন্য সদস্যর মধ্যে রয়েছেন এ-১ ব্লকের আবদুস শুক্কুর, আবদুল হাফেজ, বি ১ ব্লকের ইসলাম (প্রকাশ কাপড় ব্যবসায়ী ইসলাম) এ-২ ব্ল¬কের মান্নান, বি ব্ল¬কের মোহাম্মদ নুর, বি-১ ব্ল¬কের আমিন, বি-২ ব্ল¬কের মোহাম্মদ আলম, বি-৩ ব্ল¬কের আবু তৈয়ুব, নুর হোসেন, জকরিয়া, আমির হামজা। ডি ব্ল¬কের দায়িত্বে রয়েছেন রফিক, ডি-১ ব্ল¬কের আবু জাফর, আবদুল¬াহ, ডি-২ ব্ল¬কের মনিরুজ্জামান, আবদুল মাজেদ, ডি-৩ ব্ল¬কের মোহাম্মদ হোসেন ওরফে কালা বদা, সৈয়দুল আমিন, মজিদ, ডি-৪ ব্ল¬কের রুহুল আমিন, মোহাম্মদ সালাম, শমশু, আবদুস সালাম, ডি ব্ল¬কের মোহাম্মদ আলী, নুরুল আমিন ও কালু। সি-১ ব্লকের দায়িত্বে রয়েছেন মৌলভী রফিক, মোহাম্মদ আলম, সি-২ ব্লকের মোস্তফা কামাল, উলা মিয়া, ই-১ ব্লকের আবুল কালাম, হাবিব, নুর আলম, ই-২ ব্লকের আলী হোসেন, সলিম, মৌলভী জামাল, মোহাম্মদ বাসের, ফরিদ অন্যতম। এদের মধ্যে অনেকেই জঙ্গি সংগঠন আরএসওর সঙ্গে জড়িত। তারা ১০ হাজার রোহিঙ্গা পরিবার থেকে ২০০ টাকা করে প্রতি মাসে ১০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করে থাকে। অবৈধভাবে বসবাসরত রোহিঙ্গারা ক্যাম্প থেকে বের হয়ে জেলার বিভিন্ন স্থানে ঘুরতে পারলেও স্থানীয়রা সহজে প্রবেশ করতে পারে না রোহিঙ্গা ক্যাম্পে। স্থানীয় লোকজন ও সাংবাদিকরা প্রবেশ করতে চাইলে বাধা দেয় সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট। এ ব্যাপারে ক্যাম্প কমিটির সেক্রেটারী দাবী করা মোঃ নুর এর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি এসব কথা এড়িয়ে যান। ৪৩ জনের একটি সিন্ডিকেট তৈরী করে ক্যাম্পের অভ্যন্তরে মাদক ব্যবসা, জঙ্গি কার্যক্রম, পতিতা ব্যবসা, অস্ত্র বানিজ্য সহ বিভিন্ন আইনশৃংখলা বিরোধী কর্মকান্ড চালিয়ে যাচ্ছে। পাকিস্তান ভিত্তিক আল কায়েদা, ভারত ভিত্তিক বাইতুল মাল, আরব ভিত্তিক কয়েকটি সংস্থা থেকে রোহিঙ্গাদের নামে বিপুল পরিমান অর্থ এনে তারা বাংলাদেশ বিরোধী তৎপরতায় লিপ্ত রয়েছে। অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে স্বঘোষিত চেয়ারম্যান আবু সিদ্দিক বলেন, আইনশৃংখলা রক্ষাসহ বিভিন্ন সামাজিক বিচার মিমাংসার জন্য এ কমিটি গঠন করা হয়েছে। রোহিঙ্গা বস্তির চেয়ারম্যান আমি, আমার নেতৃত্বেই সবকিছু পরিচালিত হবে। তিনি আরো বলেন, অবৈধ কর্মকান্ড রোহিঙ্গা বস্তিতে নেই। যা হচ্ছে তা রেজিষ্ট্রাট রোহিঙ্গা শরনার্থী ক্যাম্পে। কুতপালং ক্যাম্প ইনচার্জ শামসুদ্দোহা বলেন, রোহিঙ্গা বস্তিতে কি হচ্ছে তা আমি জানিনা, তবে চেয়ারম্যান হিসেবে বিচার সালিশ করার এখতিয়ার কারো নেই। এদিকে উখিয়ার কুতুপালং শরণার্থী ক্যাম্পের নিয়ন্ত্রনকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি ২ পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় আনরেজিষ্ট্রাট ক্যাম্পের ইÑ২ ব্ল¬কের মৃত অলী আহম্মদের ছেলে আবুল বাছের, রাকিবের বাবা মোহাম্মদ নাজমুল নিহত হয়েছে।