ছোট্ট দেশ কাতারের বিশ্বব্যাপী সাম্রাজ্য

2_93884.jpg

মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কাতার বিশ্বের অন্যতম ধনী রাষ্ট্র। মাথাপিছু আয়ের দিক দিয়ে বিশ্বের শীর্ষ ধনী কাতার যেন বিশ্বব্যাপী সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে। বিশ্বে কাতারের ব্যবসায় বিনিয়োগ প্রতিনিয়ত বাড়ছেই। শুধুমাত্র গত দুই মাসে উপসাগরীয় এই দেশটি তুরস্কের সবচেয়ে বড় পোলট্রি খামার, রাশিয়ার তেল কোম্পানি রোজনেক্ট এবং যুক্তরাজ্যের বিশাল গ্যাস কোম্পানি ‘ন্যাশনাল গ্রিডে’ বড় ধরনের বিনিয়োগ করেছে। আর এই বিনিয়োগ করা হয়েছে কাতার বিনিয়োগ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে। দেশটির তরলিকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের বিক্রি নিয়ন্ত্রণের জন্য ২০০৫ সালে প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলা হয়েছে। কাতার বিশ্বের তলর গ্যাসের সবচেয়ে বড় রফতানিকারক দেশ।

যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের সবচেয়ে জনবহুল শহর হাউসটন। এই হাউসটনের চেয়েও কম জনসংখ্যার দেশ (মাত্র ২২ লাখ) কাতার। উপসাগরীয় ক্ষুদ্র এ দেশটির বিশ্বব্যাপী ৩৩৫ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ রয়েছে। সভরেন ওয়েলথ ফান্ড ইন্সটিটিউটের হিসাবে কাতার বিশ্বের ১৪তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ।

কাতার ইনভেস্টমেন্ট অথরিটি সংক্ষেপে কিউআইএ হিসেবে পরিচিত। সরকারি এ বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি কাতারের রয়েছে অন্যান্য বেসরকারি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান। এ প্রতিষ্ঠানগুলোর রয়েছে হলিউড ব্যবসা, নিউইয়র্কে বিলাসবহুল অফিস, লন্ডনে রিয়েল এস্টেট ব্যবসা। এছাড়া ইতালির বিলাসবহুল ফ্যাশন কোম্পানিতে বিনিয়োগ। এমনকি একটা ফুটবল দলও রয়েছে তাদের। তবে তেলের দাম কমে যাওয়ায় ২০১৫ ও ২০১৬ সালে কাতারের অর্থনীতি কিছুটা মন্থর হয়ে গিয়েছিল।

কাতারের শেয়ার বাজারে সবচেয়ে বড় বিনিয়োগকারী হচ্ছে কাতার ইনভেস্টমেন্ট অথরিটি (কিউআইএ) প্রতিষ্ঠানটির বেশিরভাগ শেয়ার রয়েছে কাতার ন্যাশনাল ব্যাংক ‘এসএকিউ’তে। ব্যাংকটি গাল্ফ কো-অপারেশন কাউন্সিলের সবচেয়ে বড় ঋণদাতা। প্রতিষ্ঠানটির শেয়ার রয়েছে টেলিকম কোম্পানি ওয়ারিদোতে। কোম্পানিটির ১২টি দেশে কার্যক্রম রয়েছে এবং এর চেয়ারম্যান হচ্ছেন শেখ আবদুল্লাহ বিন মোহাম্মদ বিন সৌদ আল থানি। আল থানি কিউআইএ’র সিইও হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।

ইউরোপের অনেক দেশেই কাতার দীর্ঘদিন ধরে বিনিয়োগ করে আসছে। জার্মানির গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও ইতালির বিলাসবহুল ফ্যাশন হাউস ও ফুটবল ক্লাবেও কাতার বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে। ২০০৮ সালের অর্থনৈতিক মন্দাকালে বারক্লেইসও ক্রেডিট সুইস গ্রুপে কয়েক বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে কাতার। কাতারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও রাজপরিবারের সদস্য শেখ হামাদ বিন জসিম বিন জাবর আল থানি ২০১৪ সালে জার্মানির ডয়েচ ব্যাংকে ১.৮৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেন। পুঁজি বৃদ্ধির জন্য জার্মানির এই ব্যাংকটি শেয়ার বিক্রি করেছিল সেই সময়। অন্যান্য বড় ধরনের বিনিয়োগের মধ্যে ২০১১ কাতার স্পোর্ট ইনভেস্টমেন্টস প্যারিস সেইন্ট-জারমেইন ফুটবল ক্লাব কিনে নেয়। ক্লাবটি ডেভিড বেকহামের মতো তারকা খেলোয়াড়দের দলে ভেড়ায় এবং চারটি ফ্রেঞ্চ সকার লীগ জিতে নেয়। কাতারি বিনিয়োগকারীদের প্রতিষ্ঠিত কোম্পানি মেহোলো ফর ইনভেস্টমেন্ট এসপিসি। ২০১২ সালে প্রায় ৭০০ মিলিয়ন ডলার দিয়ে ‘পারমিরা অ্যাডভাইজর্স’ নামের একটি কোম্পানির কাছ থেকে বিলাসবহুল ইতালীয় ফ্যাশন হাউস ভ্যালেন্তিনো ফ্যাশন গ্রুপ কিনে নেয়।

অন্যদিকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী হামাদ বিন জসিম ২০১৫ সালে পশ্চিম ইউরোপের সবচেয়ে বড় ডিপার্টমেন্ট স্টোর এল কোর্ট ইংলেসের ১০% মালিকানা কিনে নেন। যুক্তরাজ্যের স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন মতে, ২০১৪ সালে যুক্তরাজ্যে কাতারের বিনিয়োগ ছিল ৩৫ বিলিয়ন ডলার। আর এ বিনিয়োগ মূলত লন্ডনের বিলাসবহুল আবাসিক এলাকাগুলোতে। ২০১৫ সালে কাতারের একটি কোম্পানি লন্ডনের ক্যানারি ইর্ফ নামের একটি এলাকা কিনে নেয়। এছাড়া লন্ডনের স্যাভয় হোটেল, শার্ড স্কাইক্র্যাপার, হ্যারোডস ডিপার্টমেন্ট স্টোর, অলিম্পিক ভিলেজ ও এইচএসবিসি টাওয়ারেও কাতারের বিনিয়োগকারীদের মালিকানা রয়েছে। রাশিয়ার তেল কোম্পানিতে কাতারের বড় ধরনের বিনিয়োগ রয়েছে। গত বছরের ডিসেম্বরে রাশিয়ার জায়ান্ট তেল কোম্পানি রোজনেক্টের সঙ্গে ১১ বিলিয়ন ডলারের একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে কাতার। এছাড়া কাতার গত বছরের জুলাইয়ে সেইন্ট পিটার্সবার্গ বিমানবন্দরের ২৪.৯% কিনে নিতে সম্মত হয়। এজন্য ২০১৪ সালে রাশিয়ার রাষ্ট্রচালিত রাশিয়ান ডাইরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট ফান্ডে ২ বিলিয়ন ডলার প্রদানের জন্য রাজি হয় কাতার।

কাতারের বড় ধরনের বিনিয়োগগুলো এযাবৎ ইউরোপে হলেও বর্তমানে কাতার যুক্তরাষ্ট্রের দিকে নজর দিচ্ছে। ২০১৫ সালে নিউইয়র্কে একটি অফিস খুলেছে দেশটি। ২০২০ সাল নাগাদ দেশটির তেল খাতে আরও ৩৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ পরিকল্পনা রয়েছে কাতারের।

হলিউডের সিনেমাশিল্পেও কাতারের বিনিয়োগ রয়েছে। কাতারভিত্তিক বিইন মিডিয়া গ্রুপ গত বছর ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক কোম্পান মিরাম্যাক্স কিনে নেয়। এই ফিল্ম কোম্পানিটির ‘পাল্প ফিকশনে’র মতো অস্কারজয়ী সিনেমা রয়েছে। বিপুল অর্থ ব্যয়ে আলজাজিরা আমেরিকা চ্যানেল খুলেছিল কাতার। তবে পরে সেটি বন্ধ হয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রে অফিস খাতেও কাতারের বড় ধরনের বিনিয়োগ রয়েছে। ২০১৬ সালে প্রধানত যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক ও লস অ্যাঞ্জেলেস শহরে কিউআইএ চতুর্থ বৃহৎ বিনিয়োগকারীর অবস্থানে ছিল। গত বছর প্রতিষ্ঠানটি এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিংয়ের মালিক প্রতিষ্ঠান এম্পায়ার স্টেট রিয়েলিটি ট্রাস্ট ইনকর্পোরেশনের ১০% মালিকানা কিনে নেয়। এছাড়া ব্রুকফিল্ড প্রোপার্টি পার্টনার্সের সঙ্গে ৮.৬ বিলিয়ন ডলারের মিশ্র মালিকানা রয়েছে।

এশিয়ার হংকং, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানের সঙ্গে কাতারের ব্যবসায়িক সম্পর্ক প্রসারিত হচ্ছে। ২০১৫ সালে কাতারের এলএনজি গ্রাসের অর্ধেকই কিনে নেয় চীন। কিউআইএ’র কর্মকর্তারা ২০১৪ সালে জানান, এশিয়ায় আগামী ছয় বছরে ২০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। বেইজিং ও নয়াদিল্লিতেও অফিস বিস্তার করতে চায় কাতার।