প্রযুক্তি বিপ্লবের যুগে বিশ্ব ইজতেমা

ijtema-sm20170113090218.jpg

প্রতিটি মুসলমানের প্রতি মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের নির্দেশ, তুমি তোমার প্রতিপালকের প্রতি মানুষকে আহ্বান কর হিকমত ও সদুপদেশ দিয়ে এবং তাদের সঙ্গে তর্ক কর উত্তম পন্থায়… (নাহল ১২৫)

পবিত্র কোরআনের এ নির্দেশে অনুপ্রাণিত হয়েই শুরু হয়েছিল বর্তমান দাওয়াত ও তাবলিগের মেহনত। হজরত মাওলানা ইলিয়াস (র.) এ আয়াতের নির্দেশে উদ্বুদ্ধ হয়েই প্রবর্তন করেছিলেন প্রচলিত দাওয়াত ও তাবলিগের। আর প্রকৃতপক্ষে দ্বীনের দাওয়াতের কাজ তো সব যুগের নবীরাই করে গেছেন। হজরত মুহাম্মদ (সা.) এরপর সাহাবায়ে কেরাম, তাবিঈন, তাবে তাবিঈন, আইম্মায়ে মুজতাহিদীন ও পীর মাশায়েখগণ সব যুগে দ্বীনের দাওয়াতের কাজ করে গেছেন। হজরত মাওলানা ইলিয়াছ (র.) সেই দাওয়াতের কাজে নতুন মাত্রা যোগ করেছেন। ফলে পৃথিবীর দেশে দেশে প্রত্যন্ত অঞ্চলে আজ দাওয়াত ও তাবলিগের কাজ পৌঁছে গেছে। যার সুবাদে মানুষ হিদায়েতের প্রজ্জ্বল আলো পাচ্ছে। বহু জীবনের মোড় বদলে গেছে। অন্ধকারে নিমজ্জিতরা আলোর বিভায় উদ্ভাসিত হয়েছে এবং প্রতিনিয়তই হচ্ছে। এই দাওয়াত ও তাবলিগের প্রতিটি পর্যায়ে মিডিয়া ও প্রযুক্তির ব্যবহার পাচ্ছে বর্তমান বিশ্বের ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা। শুধু মুসলমান কেন পথভুলা মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে মিডিয়া ও প্রযুক্তিভিত্তিক দাওয়াত তাবলিগে হেদায়েত পাবে বলে প্রত্যাশা বিশিষ্টজনদের। প্রযুক্তি বিপ্লবের এ যুগে ইসলামের দাওয়াতের কাজে প্রযুক্তি ব্যবহার এড়িয়ে যাওয়ার কোনো যুক্তি আছে বলেও মনে হয় না। ‘তোমার প্রভুর দিকে মানুষকে আহ্বান কর হিকমত ও সদুপদেশ দিয়ে’ আয়াতের মধ্যে প্রযুক্তি ব্যবহার পড়ে না? অবশ্যই পড়ে। ছবিকে এখনও সাবধানী মুফতিরা বৈধ বলেননি। তাদের অবস্থানটাই হয়তো সঠিক। তবে ছবি ছাড়া কি মিডিয়ায় ইসলামের প্রচার করা যায় না? যায়, মিডিয়ায় এখন সবাই ছবির ব্যবহার করে। কিন্তু ওলামায়ে কেরাম ও দাওয়াত তাবলিগের মুরব্বিরা ছবিবিহীন মিডিয়ার সংস্কৃতি চালু করতে পারেন। শুরু করলে সেটা পর্যায়ক্রমে গ্রহণযোগ্যতা ও ব্যাপকতা উভয়টাই পাবে। সেই সুবাদে দাওয়াত তাবলিগ প্রসার লাভ করবে।

অতি সাবধানীরা মিডিয়াবিমুখ হওয়ায় বিশাল একটি জগতী যে হাতছাড়া হয়ে গেছে তা তারা এখন হাড়েহাড়ে টের পাচ্ছেন। আফসোস-আক্ষেপও করছেন আড়ালে-আবডালে। সময় এখনও আছে সেই বিশাল জগতে সদর্প বিচরণের। আমরাও আছি বলে জানান দেয়ার। আর এ সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত এখনই না নিলে অতি সাবধানীদেরও ধ্বংসের উত্তাল ঢেউয়ে ডুবে যেতে হতে পারে এক সময়।

গর্বিত বিশ্ব ইজতেমাটা এ দেশে হয়। কিন্তু বিশ্ব ইজতেমার আলো উপকারিতা ও প্রভাব একই সঙ্গে বিশ্বময় ছড়িয়ে দিতে হবে। ফলে এক দেশে অনুষ্ঠিত ইজতেমার সুফলটা পাবে গোটা বিশ্ববাসী। মিডিয়া ও প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের ফলে বিশাল জগৎটা খারাপের কবলমুক্ত হয়ে ভালোতে প্রভাবিত হবে। সাধারণ মানুষের জীবনে প্রিন্ট, ইলেক্ট্রনিক ও সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব এখন সুস্পষ্ট। তাই মিডিয়ায় ও প্রযুক্তির সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করে ইজতেমা ও তাবলিগকে সারা বিশ্বের প্রতিটি মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে হবে।

মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর দিকে মানুষকে আহ্বান করে নিজে সৎকর্ম করে এবং বলে আমি তো একজন মুসলমান মাত্র- তার কথা অপেক্ষা উত্তম আর কার কথা? (হামীম সিজদা : ৩৩)

এই উত্তম কথা যেন নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। নির্দিষ্ট মাধ্যমের মধ্যে আবদ্ধ না থাকে। সীমিত গণ্ডি ও মাধ্যম পেরিয়ে যেন সর্বমাধ্যম ও সার্বজনীনতা লাভ করে সে পদক্ষেপ নিতে হবে। আর দেরি নয়। দেরি অনেক হয়েই গেছে। দাওয়াত-তাবলিগের অনেক ক্ষেত্র ও মাধ্যমকে উপেক্ষা করা হয়েছে অনেককাল। এখন সেগুলোকে পক্ষে নিতে হবে। যুগে যুগে নবী-রাসূলরা দাওয়াতের কাজে যুগ চাহিদা ও সমকালীন মাধ্যমগুলোকে গুরুত্ব দিয়েছেন। শালীন ব্যবহার করেছেন। মানুষের ব্যবহারের গুণে বা দোষেই বিজ্ঞান-প্রযুক্তি ও বিভিন্ন মাধ্যম ভালো বা মন্দ হয়। সুতরাং ইজতেমা তাবলিগ ও অন্যান্য ধর্মীয় এবং ভালো কাজে বিজ্ঞান প্রযুক্তির ব্যবহার করলে তা শালীনরূপ পাবে। বৈধ ব্যবহারের সীমাটা নির্ণয়ের জন্য বিজ্ঞ ও যোগ্য ওলামায়ে কেরামের মতামত নিলে তা কলুষিত বা প্রশ্নবিদ্ধ হবে না। আজকের ইজতেমা ও তাবলিগ আর পঞ্চাশ বছর আগের ইজতেমা তাবলিগ কি পর্যায়ক্রমে পার্থক্য পরিবর্তন হয়নি? হয়েছে, হতেই হবে। বৈধতার সীমায় থেকে সময়োপযোগী পরিবর্তনটাই সব সময় কাম্য। ইসলাম তার অনুমতিও দিয়েছে। শেকড় মজবুত রেখে শিখরে উঠতে ইসলামে বাধা নেই। সমকালীন সব প্রচার মাধ্যমগুলোতে হেদায়তকামী লোকেরাও তো ডুবে থাকে প্রতিদিন উল্লেখযোগ্য একটা সময়। সে মাধ্যমগুলোতে তাবলিগ হলে তারা সেখান থেকে নিজেদের আত্মার খোরাক নিয়ে অন্যদের মাঝেও তা বিলিয়ে দেবে। জন্ম-প্রযুক্তিনির্ভর উন্নত বিশ্বের লোকগুলোকে প্রযুক্তি ব্যবহার করেই কাছে টানতে হবে। অন্যথায় তারা দূরেই থেকে যাবে। উন্নত বিশ্বের লোকেরাও তাবলিগে যুক্ত হচ্ছে। তবে সংখ্যাটা কম। তাদের চিরচেনা পথে এগোলে তারা দলে দলে যোগ দেবে এ মহৎ কাজে।

মানবকল্যাণ ও শাশ্বত কল্যাণের পথে আহ্বান মুসলমানদের মূল কাজ। একটি জনগোষ্ঠীকে এ ব্রত নিয়েই ব্যস্ত থাকতে হবে সদা সর্বদা। আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, তোমাদের মধ্যে যেন এমন একটি দল থাকে যারা কল্যাণের দিকে আহ্বান করবে। সৎ কাজের নির্দেশ দেবে, অসৎ কাজে বাধা দেবে। এরাই সফলকাম। (আল ইমরান : ১০৪) দাওয়াত ও তাবলিগসহ আরও অনেকে সামষ্টিক ও ব্যক্তিগতভাবে এ মহান কাজটিই করে যাচ্ছেন। যে প্রয়াসের আলোয় উদ্ভাসিত হচ্ছে লোক-লোকান্তর। সত্য, শান্তি ও শাশ্বত মুক্তির বাণী পৌঁছে যাচ্ছে সর্বমহলে। নতুন দীক্ষিতরা পুরনোদের চেয়ে আরও বেশি প্রজ্বল হচ্ছে। আরও অধিক উদ্যমী হচ্ছে। আরও বিস্তৃত জগতে এই আলোকে পৌঁছে দিতে জীবন বাজি রাখছে। হজরত মুহম্মদ (সা.) তার বিদায় হজের ভাষণে যথার্থই বলেছিলেন, ‘উপস্থিতরা যেন অনুপস্থিতদের কাছে দ্বীনের কথাগুলো পৌঁছে দেয়। দ্বীনের কথা যাদের কাছে পৌঁছবে তাদের অনেকেই যিনি পৌঁছাবেন তার চেয়ে অধিক সংরক্ষণকারী হবে।’ (বুখারি) হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর এই বাণী পরবর্তীকালে অক্ষরে অক্ষরে সত্য প্রমাণিত হয়েছে।

প্রচলিত দাওয়াত ও তাবলিগই যে ইসলামক প্রচারের একমাত্র পথ তা কিন্তু নয়। ইসলামের শিক্ষাদান, ইসলামী বিষয়ে লেখালেখি, ওয়াজ-নসিহত এবং প্রচলিত দাওয়াত ও তাবলিগ সবই দ্বীনের দাওয়াতি প্রয়াস তাতে কিছুমাত্র সন্দেহ নেই। এসব প্রয়াস পরস্পর সহযোগী হতে হবে। পরস্পর দোষারোপ নয় একে অপরকে আপন করে নিতে হবে। তাহলে সব ছোট-বড় প্রয়াসই পূর্ণতা ও সফলতা পাবে। নবী ও সাহাবায়ে কোয়ামের যুগে কিন্তু উপরোক্ত সব মাধ্যমই দাওয়াতের কাজ হয়েছে। যে ধারাবাহিকতায় ইসলাম আমাদের পর্যন্ত এসে পৌঁছেছে। কেবল একটি পন্থায়ই দাওয়াত হয়েছে এবং এ পর্যন্ত চলে এসেছে দাবি করলে মস্তবড় ভুল হবে।

প্রচলিত দাওয়াত তাবলিগের ব্যাপকতা সার্বজনীনতা সর্বমহলে বিস্তৃতি সত্যি ঈর্ষণীয়। পাশাপাশি দুনিয়াজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা মাদ্রাসা-মক্তব এবং বিশ্বব্যাপী সে সবের অসামান্য অবদানও কিন্তু ঈর্ষণীয়। উভয় সমান্তরালে চলতে থাকলে ইসলামও টিকে থাকবে। জগতে হেদায়াতের আলো থাকবে অন্যথায় ক্রমশ পৃথিবীটা অন্ধকারে ডুবে যেতে থাকবে। কেয়ামত ঘনিয়ে আসবে। এ সত্যটা সবারই উপলব্ধি করতে হবে।

মানুষে মানুষে ব্যবধান ঘুচিয়ে সবাইকে এক কাতারে দাঁড় করাতে পারাটা দাওয়াত তাবলিগের সফলতা-সার্থকতার উল্লেখযোগ্য দিক। তুরাগ তীরে বিশ্ব ইজতেমার ময়দানে যে দৃশ্যের অবতারণা হয় হজ ছাড়া আর কোথাও সেটি দেখা যায় না। আমরা বাংলাদেশীরা গর্বিত এ দৃশ্য আমরা আমাদের মাটির বুকে ধারণ করি প্রতি বছর। হতদরিদ্র বাংলাদেশীদের দয়াময় আল্লাহ এত বড় নিয়ামত দিলেন- অসংখ্য শুকরিয়া তাঁর। দাওয়াত ও প্রকৃত মানবকল্যাণের এ মহান কাজে দল-মত নির্বিশেষে আমরা সবাই যুক্ত হব এটিই প্রত্যাশা।

বিশ্ব হিজতেমা ও তাবলিগ আমাদের ব্যক্তি পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে ভালো প্রভাব ফেলেছে। ভবিষ্যতেও ফেলবে ইনশাআল্লাহ্। শান্তি-শৃংখলা ও পরস্পর সৌহার্দ্যরে প্রতীক হবে তাবলিগ ইজতেমা। যা প্রতিটি রাষ্ট্রের ও রাষ্ট্রের নাগরিকদের পরম কাক্সিক্ষত। বাংলাদেশের মানুষ নিয়ম-নীতি অনুসরণ করে ইজতেমা ও তাবলিগে অংশ নিলে এর ফসল নিজেদের ঘরে তুলবেই। শুধু পরকালেই নয় প্রতিটি মহৎ ও নেক কাজের সুফল দুনিয়াতেও পাওয়া যায়। সুতরাং দাওয়াত তাবলিগের সুফল ও শুধু পরকালে নয় ইহজগতেও পাওয়া যাচ্ছে এবং যাবে। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন, ‘যদি জনপদবাসী ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত তাহলে আমি তাদের ওপর আসমান জমিনের বরকতের দুয়ার খুলে দিতাম’। ঈমান ও তাকওয়ার ফলে দুনিয়ায় প্রচুর বরকত লাভ হয়- তাকওয়া থেকে তাই বোঝা যাচ্ছে। এ বরকত আমরা সবাই চাই। আর বরকত পেতে হলে ঈমান ও তাকওয়ার কাজগুলোতে অংশ নিতে হবে। বিশ্ব ইজতেমায় সর্ব শ্রেণীর মানুষই অংশ নেয়। বরকতটাও সবাই পাবে আশা করা যায়। তবে বাংলাদেশের মানচিত্র পেরিয়ে গোটা বিশ্বেই এ বরকতকে ছড়িয়ে দিতে হবে। বহির্বিশ্ব থেকে অনেকেই আসেন এই বরকত আঁজলা ভরে নিতে। উদার চিত্তে আমাদের তাদের সে সুযোগ দিতে হবে। আর এর জন্য বৈধ, শালীন ও শরিয়ত অনুমোদিত সব প্রযুক্তি ও মিডিয়া ব্যবহারে গুরুত্ব দিতে হবে। সীমাবদ্ধতা, খণ্ডিত চিন্তা ও একপেশে ভাবনাকে প্রশ্রয় দেয়া মোটেই সঠিক হবে না। এবারের তাবলিগ ইজতেমা দেশ, জাতি, রাষ্ট্রের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বমানবতার জন্য কল্যাণ বয়ে আনুক এটাই

সবার প্রত্যাশা।

লেখক: প্রধান মুফতি, চৌধুরী পাড়া মাদ্রাসা ও খতিব মুহাম্মদিয়া দারুল উলুম জামে মসজিদ পশ্চিম রামপুরা, ঢাকা।