দেশের বীমা খাতে অলস টাকার পাহাড় : বিনিয়োগযোগ্য তহবিল ১৫ হাজার কোটি টাকা

bia-jugantor_36383_1484108965.jpg

টেকনাফ টুডে ডেস্ক |
দেশের বীমা খাতে অলস টাকার পাহাড় জমেছে। শুধু লাইফ ফান্ডেই বর্তমানে বিনিয়োগযোগ্য অর্থ প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা। বিশাল অংকের এই তহবিল লাভজনক কাজে ব্যবহার করতে পারছে না কোম্পানিগুলো। আইন লংঘন করে কোনো কোনো কোম্পানি গ্রাহকের টাকা বিভিন্ন খাতে খরচ করে ফেলছে। এর আগে এ খাতের উদ্যোক্তারা শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের ঘোষণা দিলেও তা করেননি। এক্ষেত্রে নীতিমালা এবং উপযোগী খাতের অভাবকে দায়ী করছেন বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিআইএ) নেতারা। তাদের অভিযোগ, পদ্মা সেতুতে বিনিয়োগের প্রস্তাব দেয়া হলেও সরকারের পক্ষ থেকে সাড়া পাওয়া যায়নি। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বীমা খাতের অর্থ বিনিয়োগের জন্য নীতিমালা জরুরি।

জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, গ্রাহকের টাকা কীভাবে বিনিয়োগ করা হবে তার একটি নীতিমালা থাকা জরুরি। কারণ নীতিমালা না থাকলে কোম্পানিগুলোর স্বেচ্ছাচারিতা বেড়ে যায়। তার মতে, বীমা খাতে গ্রাহকের এক ধরনের আস্থা সংকট রয়েছে। সার্বিকভাবে এ খাতের উন্নয়নে আস্থার সংকট কাটাতে হবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মেঘনা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের চেয়ারম্যান নিজাম উদ্দিন আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, বিশাল এই তহবিল গ্রাহকের পলিসির টাকা। এতে মুনাফা হলে গ্রাহকের বীমা দাবি পূরণ সহজ হয়। কিন্তু বর্তমানে ব্যাংকের আমানতের সুদের হার কম। ফলে ব্যাংকে এফডিআর করলে খুব বেশি লাভ আসে না। তিনি বলেন, এর আগে এই টাকা লাভজনক কোনো প্রকল্পে বিনিয়োগের জন্য সরকারের কাছে প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল। কিন্তু কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

জীবন বীমা খাতে গ্রাহক যে টাকা জমা করে তাকে লাইফ ফান্ড বলে। কোম্পানিগুলোর বার্ষিক প্রতিবেদন অনুসারে, ২০১৫ সালে জীবন বীমা খাতের লাইফ ফান্ডে আয়ের স্থিতি বেড়ে ২৮ হাজার ৬৫৪ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। ২০১৪ সালে যা ছিল ২৬ হাজার ৬৯৮ কোটি টাকা। এক বছরে তহবিল প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা বেড়েছে। আইন অনুসারে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার জন্য প্রতি বছর সরকারি ট্রেজারি বন্ডে ৩০ শতাংশ বিনিয়োগ করতে হয়। এই ৩০ শতাংশসহ মোট ৫০ শতাংশ বা সাড়ে ১৪ হাজার কোটি বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ রয়েছে। ফলে এখনও বিনিয়োগযোগ্য তহবিল রয়েছে সাড়ে ১৪ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া বীমা খাতে ২০১৫ সালে বিনিয়োগের স্থিতি ২৭ হাজার ১৭০ কোটি টাকা। আগের বছর যা ছিল ২৫ হাজার ১৫৭ কোটি টাকা। এ হিসাবে বিনিয়োগ বেড়েছে ২ হাজার ১৩ কোটি টাকা।

এদিকে সাধারণ ও জীবন বীমা খাতে ২০১৫ সালে বেসরকারি কোম্পানির প্রিমিয়াম আয় ছিল ৯ হাজার ৭৪৪ কোটি টাকা। ২০১৪ সালে ছিল ৯ হাজার ৩৪৪ কোটি টাকা। এক বছরে আয় বেড়েছে ৪শ’ কোটি টাকা। ২০১৫ সালে দুই খাত মিলিয়ে মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ৩৯ হাজার ৮৯৪ কোটি টাকা। আগের বছরের চেয়ে যা ২ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা বেশি। এর মধ্যে জীবন বীমার সম্পদ ৩৩ হাজার ৫৩৩ কোটি এবং সাধারণ বীমার ৬ হাজার ৩৬১ কোটি টাকা।

যদিও নতুন অনুমোদন পাওয়া কোম্পানিগুলোর মধ্যে ২০১৫ সালে ৮টি কোম্পানির লাইফ ফান্ড নেতিবাচক ছিল। জেনিথ লাইফের ৪ কোটি ৭০ লাখ টাকা, যমুনা লাইফের ৪ কোটি ১২ লাখ টাকা, এনআরবি গ্লোবাল লাইফের ২ কোটি ৬৭ লাখ, প্রোটেক্টিভ লাইফের ২ কোটি ৫৫ লাখ টাকা, বেস্ট লাইফের ১ কোটি ৯২ লাখ টাকা, চার্টার্ড লাইফের ১ কোটি ৩৮ লাখ টাকা, ট্রাস্ট ইসলামী লাইফের ১ কোটি ১৮ লাখ টাকা ও স্বদেশ লাইফের ৭৩ লাখ টাকা নেতিবাচক হয়েছে।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স ফোরামের প্রেসিডেন্ট এবং পপুলার লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বিএম ইউসুফ আলী যুগান্তরকে বলেন, লাইফ ফান্ডে যে অর্থ আছে তা সম্পদ আকারে আছে। এরপরও নগদ যে তহবিল রয়েছে, তা কোম্পানির কাছে থাকা এবং ব্যক্তির কাছে একই রকম। অর্থাৎ কোম্পানি চাইলে টাকা খরচ করতে পারে।

তার মতে, এই টাকা বিনিয়োগের জন্য সরকারি একটি নীতিমালা দরকার। বিএম ইউসুফ আলী বলেন, এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বীমা খাতে সবচেয়ে সফল দেশ ভারত। ওই দেশে লাইফ ফান্ডের জন্য নীতিমালা রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে সরকারি কোনো নীতিমালা নেই। তিনি আরও বলেন, এই অর্থ বিনিয়োগ করতে পারলে কোম্পানি এবং সরকার উভয় লাভবান হবে।

বিআইএ সূত্র জানায়, বীমা খাতের টাকা অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগের জন্য ২০১০ সালে প্রধানমন্ত্রীর তৎকালীন অর্থনীতিবিষয়ক উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমানের কাছে চিঠি দেয়া হয়। এরপর তার পরামর্শে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি দুটি শর্ত দিয়েছিল। এগুলো হল- সম্পদের নিরাপত্তা এবং লভ্যাংশের নিশ্চয়তা। বিষয়টি সেখানেই থেমে যায়।

জানা গেছে, গ্রাহকদের বীমা দাবি পূরণ না করাসহ বীমা খাতে বিশাল অনিয়ম রয়েছে। ফলে এ খাতের প্রতি সর্বজনীন একটি নেতিবাচক ধারণা রয়েছে। সক্ষমতা বিবেচনায়ও দেশের অন্যান্য খাতের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে এ খাত। দক্ষ জনবল নেই। প্রয়োজনীয় এবং হালনাগাদ কোনো আইন নেই। সরকারের প্রয়োজনীয় নজরদারিও নেই। ফলে চরম স্বেচ্ছাচারিতা চলছে এ খাতে। উদ্যোক্তারাও তা স্বীকার করছেন। বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) সূত্র জানায়, বর্তমানে দেশে ৭৫টি বীমা কোম্পানি রয়েছে। এর মধ্যে জীবন বীমা ৩০টি এবং সাধারণ বীমা ৪৫টি। আর এই দুই খাত মিলিয়ে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ৪৬টি।