আমি লেখালেখি করি

sm-mukul.jpg

আমি লেখালেখি করি। লেখালেখি আমার পেশা এবং নেশা। লেখালেখির চেয়ে ভাল কিছু আমি পারিনা। লেখালেখিও খুব ভাল পারি যে তাও নয়। তবে এই কাজটি আমাকে অনেক আনন্দ দেয়। আবার ভেতরে ভেতরে অনেক কাঁদায়ও। আমি নিজেও বুঝে পাইনা আমি কেন, কিভাবে লেখক হলাম। ছেলেবেলায় ছিলাম রাখালের সাথী। মাঠে মাঠে গরু চড়াতাম। দুধাল গাভীর জন্য ঘাস কেটে আনতাম। আমার একটা খাসি ছিলো। অনেক আদরক করে এটাকে লালন পালন করতাম। চিরুনি দিয়ে ওর লোম আচড়ে দিতাম। লোমে মেখে দিতাম সরষের তেল। রোদের আলোতে চিক চিক করতো। নাদোস নোদুস সেই খাসিটার পিঠে চড়া যেত। বাড়ির সামনে আব্বা পুকুর কাটালেন। মাটিয়ালরা পুকুর কাটার শেষ দিনে খাসিটা জবাই করে খাওয়ার আবদার জানালেন আব্বার কাছে। সিদ্ধান্ত হলো তাই। আমার কান্নায় শেষ মেশ থামলেন আব্বা। তবে এবার খাসিটা বিক্রি হবে বাজারে। খাসি নিয়ে পালালাম। সারাদিন দূরের মাঠে নিজে অনাহারে থেকে খাসিটাকে খাওয়ালাম। অনেক কাঁদলাম। সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরলাম। আমাকে শান্ত করলো সবাই। রাতে ঘুমালাম। পরদিন সকালে স্কুলে গেলাম। বিকেলে বাড়ি ফিরে শুনি খাসিটাকে বাজারে নিয়ে বিক্রি করে দেয়া হয়েছে। তারপর থেকে আর স্কুল ভাল লাগেনা। স্কুল ফাঁকি দিয়ে আমি রাস্তার আমগাছে সময় কাটাতাম। তখন থেকেই আমি স্কুল পালানো ছেলে। নেত্রকোনার বারহাট্টা থানায় সিংধা-ভাটিপাড়া গ্রামের শাহ্ বাড়ীতে জন্ম। শিক্ষক বাবার স্কুল পালানো ছেলে আমি। আমার শৈশব কেটেছে কংশ নদীর তীরে, গ্রামের মাঠে, বন-বাদারে। দুরন্তপনায় স্মৃতিময় ছিল সেইসব দিন। স্কুলের নাম করে বইখাতা নিয়ে প্রিয় আম গাছের ডালে বসে মাস্টারি খেলায় কেটেছে আমার দূরন্ত শৈশব। গরু-ছাগল আর মুরগীর পরিচর্যা ছিলো প্রিয় কাজ। গাছের ডালে-ডালে আর খালে-বিলে মাছ ধরে, সাঁতার কেটে কাটানো সেইসব দিনগুলো এখনো উদাস ভাবনায় ফেলে দেয় আমাকে।
প্রাথমিক স্কুলের গন্ডি পেরিয়ে উচ্চ বিদ্যালয়ের সময়টা ছিল আরো দূরন্তময়। হাট-বাজার, রেললাইন, মোহনগঞ্জ ইস্টিশন আর সিনেমা হলের ভুতের গলিতে কেটেছে অফুরন্ত সময়। এভাবে হেলাফেলায় স্কুল লেভেলটা পারি দিয়ে ইট কংক্রিটের জটিল বিষয়ে পড়া শুরু ময়মনসিংহের পলিটেকনিকে। এরপর জীবনের পথে যাত্রা শুরু। ইট কংক্রিটের কাজ কেন জানিননা আমাকে টানল না। যত্নে কুড়ানো সনদ পুড়িয়ে জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরিতে ঝাপদিলাম আমি। হয় পুড়ে ছাই ভষ্ম হব অথবা খাঁটি সোনা- আসলে কি এমন কিছু ভেবেই ঝাপ দিয়েছিলাম। এখন ঠিক মনে পড়েনা। শুধু মনে পড়ে ভাগ্যবিধাতা নাটায়ে বাঁধা সুঁতোয় টেনে এনে ফেলে দিয়েছেন জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরিতে। মেনে নিলাম বিধির বিধান। তুমি যেমন পার- আমিও তো পারি, প্রভু! ইচ্ছে যেমন তোমার- আমারও তেমনি ইচ্ছে। তাই আমি নেশায় বুদ বুদ মাতালের মতো জেগে আছি ঘুমের ঘোরে।

ঠিক কবে থেকে লেখা শুরু মনে পড়ছেনা। প্রথম লেখা প্রকাশিত হয় পাঠকপ্রিয় রহস্য পত্রিকায়, ১৯৯৬ সালে। প্রথম লেখার সম্মানী একশ টাকা। ১৯৯৮ সালে সাংবাদিকতা পেশা গ্রহণ। শিক্ষা ও ক্যারিয়ার বিষয়ক মাসিক ম্যাগাজিন শিক্ষাবিচিত্রা’য় সহকারি সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন। এ সময়ে শিক্ষাবিচিত্রার পাশাপাশি লেখালেখি করি দৈনিক যুগান্তরের টিউটোরিয়াল, পাক্ষিক আলোক, কথকতা, বিচ্ছুরণসহ বিভিন্ন সাময়িকীতে। ২০০৫ সালে বিজ্ঞান বিষয়ক ম্যাগাজিন সায়েন্স ওয়ার্ল্ড- এর সহযোগি সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ। এসময় সায়েন্সওয়ার্ল্ড এর পাশাপাশি লেখালেখি করি প্রফেসর’স কারেন্ট অ্যাফেয়াসর্, পাঞ্জেরী শিক্ষাসংবাদ এবং সমকালের সারাবেলায়। ২০০৮ সালে মিডিয়া সেল-এর পাবলিকেশন ও ডকুমেন্টেশন বিভাগের সম্পাদক ও ইনচার্জ হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করি। এসময়ে প্রবন্ধ লেখালেখি শুরু হয় শফিক রেহমান সম্পাদিত দৈনিক যায়যায়দিনে। সেসময়ের যায়াযায়দিনে মঙ্গলবারের পি ম্যাগাজিন (পলিটিক্স এন্ড সোসাইটি)-তে পাঠকপ্রিয় সিরিজ কলাম ‘আলোর পথযাত্রী’ নিয়মিত লিখি। পাশাপাশি যায়যায়দিনের উপসম্পাদকীয়, দৈনিক ডেসটিনি’র অন্যস্বর ও উপসম্পাদকীয়, দৈনিক বাংলাদেশ সময়-এর মুক্ত কলাম ও উপসম্পাদকীয়, দৈনিক আমার দেশ-এর মুক্তমত, দৈনিক সমকাল-এর মুক্তমঞ্চ, দৈনিক নয়াদিগন্ত-এর মুক্তাঙ্গন, দৈনিক সংবাদ-এর উপসম্পাদকীয়, দৈনিক যুগাান্তরের উপসম্পাদকীয় ও বাতায়ন, দৈনিক কালেরকন্ঠের আয়-ব্যয় পাতা, কানাডা থেকে প্রকাশিত দেশেবিদেশে পত্রিকা, পাক্ষিক এখন, পাক্ষিক চলমান সময়, মাসিক অর্থজগৎ, মাসিক টইটম্বুর, কৃষি বিষয়ক ম্যাগাজিন কৃষি বার্তায় দেশের সম্পদ-সম্ভাবনা ও সমৃদ্ধি, সামাজিক অসঙ্গতি, মানবিক মূল্যবোধ এবং শিশুবিকাশ বিষয়ে ফিচার, প্রবন্ধ ও কলাম প্রকাশিত হয়ে আসছে। এরই মাঝে অভিমানে লেখালেখি থেকে দূরে সরে থেকেছি বেশ ক’বার। যখনি হোচক খাই, যখন ভর করতে পারিনা- তখনি সব ছেড়েছুড়ে পালাতে ইচ্ছে করে। আবার ফিরে আসি। নিজেকে বুঝাই নিজে- রাগে বিপর্যয়, রাগে ঠকিতে হয়! স্কুল পালানো ছেলে আমি- ব্যাকবেঞ্চার। পড়াশুনায় মনযোগ কম। একদিন ক্লাশে প্রিয় স্যার বলেছিলেন- ‌তুই তো দেখি আলু বিক্রি করেও ভাত পাবিনা। স্যার ঠিকই বলেছিলেন। আমি আলু বিক্রি করে নয়- আলো বিকিরণ করে এজীবন পার করে দিব। কথা দিলাম- এজীবন বৃথা যেতে দিবনা।

২০১০ সালে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা- হেল্প দি ডিস্ট্রেসড-এর পাবলিকেশন এন্ড ডকুমেন্টেশন বিভাগে ইনচার্র্জ হিসেবে যোগদান করি। তবে হেল্প দি ডিস্ট্রেসড-এর উদ্যোগে ২০০৭ সালে আমার সার্বিক তত্বাবধানে প্রকাশিত হয় মুক্তিযুদ্ধের আলোকচিত্রের এলবাম ‘আলোকচিত্রে একাত্তুর’। এখন লিখছি দৈনিক যায়যায়দিন, দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ, দৈনিক বর্তমান, দৈনিক বণিকবার্তা, দৈনিক প্রতিদিনের সংবাদ, দৈনিক খোলাকাগজ, দৈনিক ডেসটিনি এবং দৈনিক মানবকন্ঠ পত্রিকার উপসম্পাদকীয়তে। সম্ভাবনার বাংলাদেশ নিয়ে পজিটিভ নিউজ কলাম বা ফিচার লিখছি দৈনিক জনকন্ঠের অর্থনীতি পাতা এবয় দৈনিক যায়যায়দিনের কৃষি ও সম্ভাবনা পাতায়। এ দেশে ভাল কাজ খুব কম লোকে করে। ভাল বা আশাবাদের বিষয় নিয়ে খুব কম লেখালেখি হয়। সে সুবাধে ভাল বা আশাবাদের বাংলাদেশ নিয়ে লেখালেখির কারণে আমার ভাগ্যে বেশ বাহবা জোটে। মনের ক্ষুদা মিটলেও পেটের খিদে তাতে মেটেনা তাই আমাকে আরো কিছু করতেই হয়। অনেক পাঠক হয়ত জানেন না- ভাল বিষয় নিয়ে লেখা কতটা কঠিন। তারচেয়েও আরো কঠিন- ভাল বিষয়ের লেখা প্রকাশের সুযোগ পাওয়া। কারণ হুজুগে বাঙালি সমাজে- নেতিবাচক লেখার পাঠক যে অনেক বেশি। আমাকেউ কেউ কেউ বলেন- দেশের সমস্যা নিয়ে লিখেন, রাজনীতি আর সুরসুরি নিয়ে লিখেন- দ্রুত লাইন পেয়ে যাবেন। নাহ্ আমাকে দিয়ে এসব আর হয়নি। মাথায় একটা পোকা ঢুকেছে। তাই আমাকে যারা বলে সম্ভব না- আমি বুঝি সম্ভাবনা। বিধাতা নাটাইয়ে ধরে যেভাবে টানছেন আমি তার বাইরে তো আর যেতে পারিনা ভা্ইটি।
আমার লেখা অনলাইন নিউজ পোর্টালেও প্রকাশিত হচ্ছে। কোনোটার খবর জানি, কোনোটার না। বহুমাত্রিক ডটকম, আজকাল নিউজবিডি ডটকম, প্রাইমনিউজ ২৪ ডটকম, বিডিটুডে ডটকম, নতুনবার্তা ডটকম, বাংলামেইল ডটকম, উত্তরাধিকার নিউজ ৭১ ডটকম সহ বেশ কয়েকটি নিউজ পোর্টালে। দেশের বাইরের অনেক বাংলা পত্রিকাতেও ছাপে। মাঝে মাঝে জানতে পারি ইন্টারনেট ঘেটে। ভাল লাগে কখনো। কখনো কিছুই ভাল লাগেনা।
যেহেতু লেখা নিয়েই কাজ কারবার একারণেই আমি বই লিখি। প্রতিবছর একুশে বইমেলার সময় ঘনিয়ে এলে আমার মাথায় বাজ পড়ে। যাপিত জীবনের নানাবিধ যাতনা নিয়ে বছরের সময় কেটে যায়। বই প্রকাশের অনেক সুন্দর ভাবনা থাকলেও শেষে আর হয়ে উঠেনা। অবশ্য বছরজুড়ে আমার লেখালেখি প্রকাশিত হয়। কোথাও কলাম, কোথাওবা ফিচার। পত্রিকায় যখন কলাম বা ফিচার প্রকাশিত হয় এগুলো আমাকে অনেক আনন্দ দেয়। জীবন চলার পথের খেড়োখাতায় যত অতৃপ্তির বিস্বাদ আছে- লেখাগুলো ছাপা হলে আমি সব ভুলে যাই। তারপরও তো আমি মানুষ। আমার ঘর-সংসার-সন্তান সবই আছে। আর এসবের বাস্তবিক চাহিদা, ভূত-ভবিষ্যতের অনেক জিজ্ঞাসা আমাকে মানসিকভাবে হতাহত করে। তারপরও কাজ করি নতুন উদ্যমে, নতুনভাবে বাঁচার স্বপ্ন নিয়ে- হয়ত এটাই জীবনের নিয়ম। নাটায়ে বাঁধা সুঁতোর টান।

যখন নিজেকে প্রশ্ন করি আমি কেন লিখি- তেমন যুতসই কোনো জবাব নিজের কাছে না থাকলেও শান্তনার একটি অমীয় বাণী তো আছেই। আমি হয়তো এরচেয়ে ভালো আর কিছু পারিনা। করুনাময় হয়তো এই ক্ষমতাটুকু আমাকে দিয়েছেন। বইমেলা আসে- অর্থকড়ি পাই আর নাইবা পাই বই প্রকাশিত হয়। যদিও অনেকের বিপরীত ধারণা রয়েছে। আমার বইগুলো বিষয়গত দিক দিয়ে বেশ তথ্য-গবেষণালদ্ধ। এসব বইয়ের বাজার কাটতি তেমন উল্লেখ করার মতো নয়। প্রকাশিত বইগুলোর মধ্যে নাম বলা যেতে পারে- সাংবাদিকতায় ক্যারিয়ার (ক্যারিয়ার গ্রন্থ), সমবায় আন্দোলন ( তথ্যভিত্তিক), রূপকল্প ২০২১ : উন্নয়ন ভাবনায় বাংলাদেশ (প্রবন্ধ), দিনবদলের হাওয়া (কাব্যগ্রন্থ), ছন্দ ছড়ার দেশে (ছড়াগ্রন্থ), স্কলারশিপ ও বিদেশে উচ্চশিক্ষা (শিক্ষা তথ্য ভিত্তিক), ছড়ায় ছড়ায় দেশের পড়া (ছড়াগ্রন্থ), ক্যারিয়ার ভাবনা (ক্যারিয়ার গাইড লাইন), ছড়ার খেলা সারাবেলা (ছড়া গ্রন্থ), স্বপ্নের ক্যারিয়ার বিদেশে উচ্চশিক্ষা ও স্কলারশিপ, বাংলার সম্পদ (তথ্যভিত্তিক), দিনবদলের আহ্বান (সাফল্য কাহিনী), বাংলাদেশের শিল্প সম্পদ সম্ভাবনা (তথ্যভিত্তিক), আলোকচিত্রে একাত্তুর (সম্পাদনা সদস্য), বহুমাত্রিক হুমায়ূন আহমেদ, কর্মক্ষেত্রে সফলতা, জীবনে বিজ্ঞান, সাদা মনের কালো মানুষ : নেলসন ম্যান্ডেলা, জানা অজানার রহস্যপুরী ইত্যাদি। বই প্রকাশ করে অপার আনন্দ পাই। সাথে অর্থের যোগ হলে হয়তো সেই আনন্দটুকু পরিপূর্ণতা পেত। আফসোস!! আমার কলামগুলো যারা কষ্ট করে পড়েন তাদের মধ্য থেকে অনেকেই আমার বিশেষ গুণগ্রাহী। ফোনে, ইমেইলে অথবা ফেসবুক ওয়ালে আশাজাগানিয়া অনুপ্রেরণায় আমাকে বিমোহিত করেন। বইমেলার সময়ে, আগে এবং পরে কেউ কেউ খোঁজ নেন- বছরের নতুন বইয়ের কি খবর। অনেকে আমার এসএমএস পেয়ে মেলায় গিয়ে সৌজন্যতার কারণে হলেও একটি বই কেনেন। তাদের সবার কাছে আমি কৃতজ্ঞতায় আবদ্ধ।
আমি একজন লেখক- এটা আমার গর্বের পরিচয়। যতদিন বাঁচব লিখে যেতে চেষ্টা করব। নতুন নতুন তথ্য-গবেষণালদ্ধ বই উপহার দিতে চেষ্টা করব। আমার বইয়ের কোনো একটি তথ্য, বিষয় পাঠকের মূলবোধ ও চেতনায় আলোড়ন সৃষ্টি করলেই আমি সার্থক। এমন অভিজ্ঞতাও আমার ভান্ডোতে জমা হয়েছে। অনেক পাঠকের ফোন পাই। পাঠকের এই ভালবাসা আমাকে লেখক হিসেবে বেঁচে থাকার প্রেরণা যোগায়। আমাদের সমাজ জীবনে এই চেতনা ও মূল্যবোধের জাগরণ খুবই জরুরি হয়ে পড়েছে। সবাইকে নতুন ইংরেজি বছরের শুভেচ্ছা। আসছে অমর একুশে গ্রন্থমেলায় স্বাগত জানাচ্ছি।
এস এম মুকুল, কলাম ও ফিচার লেখক, ফোনালাপ : ০১৭১২৩৪২৮৯৪, ০১৫৫২৩৫৩৮৯২, ইমেইল : lekhokmukul@gmail.com