৩০ উপজেলায় বই পায়নি শিশুরা

new_text_book_36063_1483818610.jpg

৭৪ প্রতিষ্ঠানের কাজে অবহেলা * বিল আটকে দিয়েছে এনসিটিবি * বাফার স্টকের বই দিয়ে সামাল দেয়ার চেষ্টা

দেশের ৩০ উপজেলায় এখন পর্যন্ত প্রাথমিক স্তরের সব বই পৌঁছায়নি। দুটি প্রতিষ্ঠান যথাসময়ে বই ছাপতে না পারায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়। ফলে ওইসব উপজেলার শিশু শিক্ষার্থীদের দু-একটি করে বই দিয়ে শান্ত রাখা হয়েছে। নতুন শিক্ষাবর্ষের প্রথম সপ্তাহ পার হলেও ছাত্রছাত্রীরা জানে না কবে নাগাদ বাকি বই পাওয়া যাবে। সংশ্লিষ্ট এলাকার শিক্ষা কর্মকর্তা এবং স্কুলের শিক্ষকও এ প্রসঙ্গে কিছুই বলতে পারছেন না।

এ ছাড়া আরও ৭২টি মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান এবার সময়মতো বই সরবরাহ করতে পারেনি। দেরিতে বই সরবরাহ করায় এসব প্রতিষ্ঠানের বিল আটকে দিয়েছে সরকার। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক নারায়ণ চন্দ্র সাহা দাবি করেছেন, সব জায়গায় বই সরবরাহ করা হয়েছে। শিশুদের বই পেতে সমস্যা হয়নি। ভারতে কোনো বই নেই। কাজ পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো বই পাঠিয়েছে। প্রক্রিয়াজনিত কারণে বন্দরে বেশকিছু বই আটকে গেছে। খুব শিগগির এসব বই খালাস করা হবে।

তবে এনসিটিবি এবং প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের (ডিপিই) কর্মকর্তারা বলছেন, স্থানীয়ভাবে সরকার গ্রুপ এবং ভারতের শীর্ষাসাই নামের প্রতিষ্ঠান প্রাথমিকের সব পাঠ্যবই সময়মতো ছাপতে পারেনি। সর্বশেষ ২৫ ডিসেম্বরের সব বই সরবরাহ করার কথা ছিল সরকার গ্রুপের। কিন্তু তারা ব্যর্থ হয়েছে। আর ভারতের শীর্ষাসাই শনিবার পর্যন্ত ৪৬ লাখ বই দিতে পারেনি। ভারতীয় এ প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী এবং চট্টগ্রাম অঞ্চলের ৩০ উপজেলায় বই পৌঁছে দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু ২৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত একটি বইও পৌঁছায়নি। পরে দেশের ৩৮ জেলা থেকে ৭ লাখ টাকা ট্রাক ভাড়া দিয়ে তড়িঘড়ি বাফার স্টক (আপদকালীন মজুদ) থেকে বই তুলে ৩০ উপজেলায় পাঠানো হয়। কিন্তু তাতেও শেষরক্ষা হয়নি। উপজেলাগুলোর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাংলা, ইংরেজি ও গণিতের মতো প্রধান বইগুলো দেয়া যায়নি।

ডিপিই কর্মকর্তারা বলছেন, দেশী প্রতিষ্ঠান সরকার গ্রুপ কয়েক বছর ধরে কাজ করছে। ভারতীয় প্রতিষ্ঠান শীর্ষাসাই এবারই প্রথম কাজ পেয়েছে। সরকার গ্রুপকে এক কোটি ৮০ লাখ এবং শীর্ষাসাইকে প্রায় ৬০ লাখ বই ছাপার কাজ দেয়া হয়। ২৫ ডিসেম্বরের মধ্যে সরকার গ্রুপ এবং ৪ জানুয়ারির মধ্যে শীর্ষাসাইকে উপজেলা পর্যায়ে বই পৌঁছে দেয়ার জন্য সময় বেঁধে দেয়া হয়। কিন্তু ৭ জানুয়ারি পর্যন্ত প্রতিষ্ঠান দুটি সব পাঠ্যবই সরবরাহ করতে পারেনি। ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে ১ কোটি ৪০ লাখ বই সরবরাহ করে সরকার গ্রুপ। শীর্ষাসাই ৬০ লাখের মধ্যে ১৩ লাখ ৭৭ হাজার বই পৌঁছে দিয়েছে। বাকি বই নৌপথে পাঠিয়েছে। কিন্তু সেগুলো এখন পর্যন্ত বন্দরে পৌঁছায়নি। শুধু এবারই নয় সরকার গ্রুপ প্রায় প্রতিবছরই বই ছাপা নিয়ে ঝামেলা তৈরি করে বলে অভিযোগ আছে। সর্বশেষ তারা গত বছরও নিম্নমানের কাগজে বই ছাপানো, বিলম্বে বই দেয়া, ছাপার মানসহ অন্য কারণে সরকার প্রিন্টিং অ্যান্ড পাবলিশিংকে মোট ১ লাখ ২৬ হাজার ৭৬১ টাকা জরিমানা দিয়েছে।

এ প্রসঙ্গে নাম প্রকাশ না করে চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা প্রাথমিক উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তারা যুগান্তরকে বলেন, বাফার স্টক দিয়ে বই বিতরণ নিশ্চিতের তথ্য শতভাগ সঠিক নয়। বিভিন্ন উপজেলায় শিশুদের দু-একটি করে বই দেয়া হয়েছে। অবস্থা এমন যে, অধিকাংশ উপজেলায় এখনও বাংলা, ইংরেজি ও অংক বই পাঠানো হয়নি। প্রতিদিন বই নিতে বিভিন্ন স্কুল থেকে শিক্ষকরা আসছেন। কিন্তু তাদের খালি হাতে ফেরাতে হচ্ছে। শিক্ষা কর্মকর্তারা প্রতিদিনই বইয়ের জন্য এনসিটিবিতে ফোন দিচ্ছেন বলে জানা গেছে।

এদিকে এনসিটিবির কর্মকর্তারা বলছেন, উল্লিখিত দুটির বাইরে আরও ৭২টি প্রতিষ্ঠান এবার সময়মতো বই সরবরাহ করেনি। এসব প্রতিষ্ঠান প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও মাদ্রাসা স্তরের বই দেরিতে সরবরাহ করেছে। সাধারণত বই সরবরাহের পর সারা দেশে আরেকটি নিরীক্ষা (পিএলআই-পোস্ট ল্যান্ডিং ইন্সপেকশন) হয়। ওই নিরীক্ষার পর কাগজ ও ছাপার মান, বাঁধাই ইত্যাদি দেখে আরেক দফা জরিমানা করা হয়। এরপর শতভাগ বিল দেয়া হয়।

তবে মুদ্রণকারীরা বলছেন, বিলম্বে বই সরবরাহ নয়, অর্থ সংকটের কারণে এনসিটিবি বিল ছাড় করছে না। বৃহস্পতিবার সরেজমিন এনসিটিবিতে গিয়ে দেখা যায়, মুদ্রণ বিলের জন্য একদল মুদ্রাকর তৃতীয় তলায় অবস্থান করছেন। তাদের একজন রাব্বানী জব্বার যুগান্তরকে বলেন, এনসিটিবি এবার মাধ্যমিকের বইয়ের কাজের জন্য প্রায় ২শ’ কোটি টাকা কম বরাদ্দপত্র দিয়েছে। অর্থ সংকটের কারণে এখন তারা বিল আটকে রেখেছে।

উল্লেখ্য, এবার ৪ কোটি ২৬ লাখ ৩৫ হাজার ৯২৯ জন শিক্ষার্থীর জন্য মোট ৩৫ কোটি ৭ লাখ ৫৩ হাজার ৪৭৭টি বই ছাপানোর কার্যাদেশ দেয়া হয়। এর মধ্যে প্রাক-প্রাথমিকের এক কোটি এক লাখ ৫ হাজার ৮৩২টি, প্রাথমিকের (বাংলা ও ইংরেজি ভার্সন) ১০ কোটি ৫২ লাখ ৩৬ হাজার ৭৯৭টি বই আছে। মাধ্যমিকে বাংলা ও ইংরেজি ভার্সন এবং এসএসসি ভোকেশনালের জন্য ১৭ কোটি ৬৮ লাখ ৩০ হাজার ৩৬৮টি। এসএসসি ও দাখিল ভোকেশনালের (ট্রেড বই) ৯ লাখ ২১ হাজার ১১০টি। ইবতেদায়ি ও দাখিলের ৫ কোটি ৭১ লাখ ৯৭ হাজার ৮৮৫টি। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য ৯ হাজার ৭০৩টি ব্রেইল বই। নৃগোষ্ঠীর ২৫ হাজার ৫০০ বই। বাকিগুলো প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষক গাইড।