সরকারি কর্মচারীকে ডেকে নিয়ে পেটালেন এমপি রিমন

rimon_barguna_35988_1483761309.jpg

পাথরঘাটা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক শাহনাজ পারভীন এক বছরেরও বেশি সময় ধরে কর্মস্থলে আসেন না। এরপরও নিয়মিত বেতন নিচ্ছেন তিনি।

কিভাবে ওই বেতন পাচ্ছেন শাহনাজ- এ নিয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে কমপ্লেক্সের প্রধান করণিক নুরুল ইসলামকে মারধর করেছেন বরগুনা-২ আসনের সংসদ সদস্য শওকত হাচানুর রহমান রিমন।

বুধবার রাতে দলীয় কার্যালয়ে ডেকে এনে তাকে মারধর করেন এমপি।

অভিযোগ রয়েছে, হাজিরা খাতায় শাহনাজের স্বাক্ষর করে দেন নুরুল ইসলাম। তার বেতন শিটও তৈরি করে দেন তিনি। এর ভিত্তিতেই সালিশ বৈঠকে তাকে পেটানো হয়।

তবে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর দেয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন নুরুল ইসলাম। মারধরের বিষয়টি স্বীকার করে তিনি দাবি করেন, ওই চিকিৎসকের বেতন পাওয়ার বিষয়ে তার কোনো ভূমিকা নেই।

সরকারি কর্মচারীকে মারধরের বিষয়টি যুগান্তরের কাছে অস্বীকার করেছেন এমপি রিমন। তিনি বলেন, আমি তার গায়ে হাত তুলিনি। যে অপরাধ করেছেন তাতে জনগণ উত্তেজিত হয়ে ওনাকে মারত। আমি বরং তাকে সেভ করেছি।

এমপি আরও বলেন, ডা. শাহনাজ হাসপাতালে না থেকেই এক বছরে বেতন বাবদ ৫ লাখ ৮৪ হাজার টাকা তুলে নিয়েছেন। তার বেতন বন্ধ করে তাকে কারণ দর্শানোর জন্য বলা হয়েছিল। কিন্তু উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা বা নুরুল ইসলাম কিছুই করেননি।

মারধরের ঘটনায় শুক্রবার পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ বা তদন্ত কমিটি গঠন হয়নি। ওই চিকিৎসকের বিষয়েও এদিন পর্যন্ত কোনো তদন্ত কমিটি করা হয়নি বলে জানিয়েছেন বরগুনার সিভিল সার্জন ডা. মো. জসিম উদ্দিন হাওলাদার।

তিনি বলেন, সরকারি কোনো কর্মচারীকে মারধর করা একটি ফৌজদারি অপরাধ। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে বিভাগীয় তদন্ত হবে, সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে। একজন এমপি তার গায়ে হাত তুলতে পারেন না। বিষয়গুলো (বেতন তোলা ও মারধর) বরিশাল বিভাগীয় পরিচালককে জানানো হয়েছে।

সরকারি সমস্যা সমাধানে সালিশ বসানো ও কর্মচারীকে পেটানোর ঘটনায় সংশ্লিষ্ট বিভাগসহ স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

সূত্রমতে, ২০১৫ সালের ৭ ডিসেম্বর পাথরঘাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গাইনি কনসালট্যান্ট হিসেবে যোগ দেন শাহনাজ পারভীন। এরপর থেকেই তিনি কর্মস্থলে অনুপস্থিত। কিন্তু নিয়মিত বেতন-ভাতা নিচ্ছেন।

নুরুল ইসলাম বেতন-ভাতা উত্তোলনে সহযোগিতা করেছেন। এ ব্যাপারে জানতে চিকিৎসক শাহনাজ পারভীনের সঙ্গে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। বিষয়টি শুনে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন এমপি রিমন।

প্রত্যক্ষদর্শী জানান, এমপি বুধবার সন্ধ্যায় পাথরঘাটা উপজেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে নেতাকর্মীদের নিয়ে সভা করছিলেন। এক ফাঁকে এমপি মুঠোফোনে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক আনোয়ার উল্লাহ ও করণিক নুরুল ইসলামকে সেখানে ডাকেন। রাত সাড়ে ৭টার দিকে তারা সেখানে হাজির হন।

এমপি উপজেলা স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি হিসেবে সালিশ শুরু করেন। দলীয় নেতাকর্মীদের পাশাপাশি উৎসুক জনতাও সেখানে ছিলেন। নুরুল ইসলামের কাছে এমপি জানতে চান কিভাবে ডা. শাহনাজ বেতন-ভাতা তুলছেন।

নুরুল ইসলাম বলেন, কর্মকর্তারা বেতনে স্বাক্ষর করেন। সে অনুযায়ী বেতন চিকিৎসকদের নিজস্ব ব্যাংক হিসাবে চলে যায়। এ কথা শোনার পর এমপি বাঁ হাত দিয়ে নুরুল ইসলামের মাথা টেবিলে ঠেকিয়ে ডান হাত দিয়ে কিল-ঘুষি দেন।

এভাবে তিনবার তাকে লাঞ্ছিত করা হয়। পরে আওয়ামী লীগ নেতারা তাকে রক্ষা করেন। এ সময় চিকিৎসক আনোয়ার উল্লাহ নির্বাক বসে ছিলেন।

সালিশ শেষে এমপি রাত সাড়ে ৮টার দিকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যান। চিকিৎসকদের বিল রেজিস্টার ও গাইনি কনসালট্যান্ট শাহনাজ পারভীনের ব্যক্তিগত ফাইল নিয়ে আসেন।

হাসপাতালে থেকেই এমপি মুঠোফোনে সিভিল সার্জনকে বিষয়টি জানান। বৃহস্পতিবার সকালেই বিষয়টি সমাধানের জন্য পাথরঘাটায় আসার জন্য নির্দেশ দেন।

নুরুল ইসলাম বলেন, বেতন-ভাতায় আমার স্বাক্ষর প্রয়োজনই নেই। উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তাই বিষয়টি দেখেন। এমন দাফতরিক বিধির কথা বলতে শুরু করলেই এমপি ক্ষেপে যান। আমিই সব করেছি, এমন অভিযোগ এনে আমাকে মারধর করেন। বিষয়টি আমি মৌখিকভাবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি।

এমপির বিরুদ্ধে মামলা করবেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, একজন সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে আমরা মামলা করতে পারি না।

সালিশে উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান জামাল আহমেদ, আওয়ামী লীগ নেতা গোলাম কিবরিয়া পিয়ার ও উপজেলা ছাত্রলীগ সভাপতি হাফিজুর রহমান সোহাগ প্রমুখ ছিলেন।

চিকিৎসক আনোয়ার উল্লাহ বলেন, শাহনাজ পারভীনের বেতন-ভাতা নিয়ে কথা হচ্ছিল। একপর্যায়ে এমপি স্যার রাগ করে নুরুল ইসলামকে মারধর করেন।

ঘটনার জন্য নুরুল ইসলাম দায়ী নন, বিষয়টি এমপি মহোদয়কে বোঝানোর পর তিনি রাতেই হাসপাতালে আসেন। তিনি শাহনাজের ব্যক্তিগত ফাইল নিয়ে যান।

উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট জাবির হোসেন বলেন, ওই কর্মচারীর অপরাধের কারণে সৃষ্ট জনরোষ নিয়ন্ত্রণ করতেই সংসদ সদস্যকে হাত তুলতে হয়েছিল। শাস্তির জন্য দলীয় কার্যালয়ে কেন ডাকা হয়েছিল, তার জবাব তিনিই (সংসদ সদস্য) বলতে পারবেন।

উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. রমেশ চন্দ্র বলেন, ‘করণিককে মারধরের বিষয়ে মৌখিকভাবে শুনেছি। বিষয়টি সিভিল সার্জনও জানেন।’