‘ষড়যন্ত্রের আগুনে’ পুড়ল : ডিসিসি মার্কেট

1_90333.jpg

গানপাউডার দিয়ে আগুন লাগানোয় ৩০ মিনিটে ধসে পড়ে ভবন -অভিযোগ ব্যবসায়ীদের * মেট্রো গ্রুপ আমাদের পুড়িয়ে দিল- বললেন বঙ্গবন্ধুর হাত থেকে দোকানের চাবি নেয়া মুক্তিযোদ্ধা আজিজ সরকার
‘ষড়যন্ত্রের আগুনে’ পুড়লআগুনে জ্বলছে গুলশান-১ এর ডিসিসি মার্কেট। তৎপর ফায়ার ব্রিগেড কর্মীরা। জড়ো হয়েছেন দোকান মালিক-কর্মচারীরা -যুগান্তর
‘জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিজ হাতে আমাদের দোকানের চাবি তুলে দিয়েছিলেন। আবার ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে সেই আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই আমরা সর্বস্বান্ত হয়ে গেলাম। ষড়যন্ত্রের আগুনে আমাদের সর্বস্ব পুড়িয়ে দেয়া হল। নিশ্চয় প্রধানমন্ত্রী এ অন্যায়ের বিচার করবেন।’

ভস্মীভূত দোকানের সামনে আহাজারি আর বিলাপের সঙ্গে চিৎকার করে এসব কথা বলছিলেন ৩ নম্বর সেক্টরে সম্মুখ সমরে অস্ত্র হাতে জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করা বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল আজিজ সরকার। তিনি বলেন, ‘এই আগুন সাধারণ কোনো আগুন নয়। এটি ষড়যন্ত্রের আগুন। জমি দখলে ষড়যন্ত্রের আগুনে আমরা পুড়ে ছারখার হয়ে গেলাম। মেট্রো গ্রুপ যে আমাদের স্বপ্নের মার্কেট পুড়িয়ে দিয়েছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।’

তবে এ আহাজারি শুধু আবদুল আজিজের একার নয়। সিটি কর্পোরেশন মার্কেটের কয়েকশ’ ব্যবসায়ীর। এভাবে তাদের চোখের সামনে সব স্বপ্ন পুড়ে যাবে, তা তারা কোনো দিন কল্পনাও করেননি। ক্ষোভের সঙ্গে তারা বলেন, জমি দখল করে বহুতল ভবন নির্মাণ করতে মানুষ এতটা নিষ্ঠুর হতে পারে, তা ভাবা যায় না। ক্ষতিগ্রস্ত বেশিরভাগ ব্যবসায়ীর কণ্ঠে ছিল এ ধরনের ক্ষোভের আওয়াজ। তারা বলেন, এ জায়গাটি দখল করতে মেট্রো গ্রুপ নামে একটি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন থেকে নানা ধরনের অপচেষ্টা করে আসছিল। কিন্তু ব্যবসায়ীদের বাধার মুখে ১০ বছরেও তারা সফল হয়নি। অবশেষে রাতের অন্ধকারে আগুন দিয়ে মার্কেটটি ধ্বংস করার পথ বেছে নিল তারা। এখন হয়তো দেখা যাবে, কয়েক মাসের মধ্যে চক্রটি প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় জায়গাটি দখলে নিয়ে নেবে। কিন্তু তাদের জীবন থাকতে তারা তা হতে দেবেন না। সমুদয় ক্ষতিপূরণসহ আগে তাদের প্রাপ্য অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। আর তা করা না হলে তাদের বুকের ওপর বুলড্রোজার চালিয়ে উত্তর সিটি কর্পোরেশনকে বহুতল ভবন নির্মাণের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে যেতে হবে।

এদিকে যুগান্তরের অনুসন্ধানেও ব্যবসায়ীদের অভিযোগের কিছুটা সত্যতা বেরিয়ে এসেছে। আগুন লাগা থেকে শুরু করে এর প্রতিটি ধাপে এক ধরনের অবহেলা ও সন্দেহের ছাপ লক্ষ করা গেছে। যেমন প্রথমত, রাত আড়াইটায় আগুন লাগার ৩০ মিনিটের মধ্যে পুরো ভবনে আগুন ছড়িয়ে পড়ার ঘটনাটি খুবই সন্দেহজনক ক্লু। কেননা এ মার্কেটটি ছিল তিন বিঘা আয়তনের। আর আগুন লেগে ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা যায় শুধু দক্ষিণ প্রান্তে। অথচ তা খুবই দ্রুত পুরো মার্কেটে ছড়িয়ে পড়ে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঘটনাস্থলে উপস্থিত ফায়ার সার্ভিসের এক পদস্থ কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, তারা ধারণা করছেন, দাহ্য পদার্থ থাকলে এমনটি হওয়ার কথা। তা না হলে এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার কথা নয়। এখন তদন্ত করে খতিয়ে দেখতে হবে, এখানে কী ধরনের দাহ্য পদার্থের উপস্থিতি ছিল। এ প্রসঙ্গে কয়েকজন ব্যবসায়ী যুগান্তরকে বলেন, তাদের আশংকা আগুন লাগানো হয় গানপাউডার (অতিশয় দাহ্য পদার্থ) দিয়ে। তা না হলে এত দ্রুত যেমন আগুন ছড়াত না, তেমনি আগুন নেভাতে এত সময়ও লাগত না।

দ্বিতীয়ত, গুলশান-১ নম্বর মোড়ে ওয়াসার পাম্প হাউস আছে এবং সেখান থেকে দ্রুত পানির সংযোগ নিয়ে ফায়ার ফাইটিং করা খুবই সহজ ছিল। এছাড়া চারিদিক থেকে ফায়ার ফাইটিং করার জন্য গুলশান লেকসহ আরও কয়েক উৎস থেকে দ্রুত পানি আনা যেত। কিন্তু এক্ষেত্রে সে ধরনের কিছুই করা হয়নি। বিশেষ করে দিনের বেলা টিভি চ্যানেলের সামনে ফায়ার সার্ভিসের ২২টি ইউনিটকে যেভাবে তৎপর দেখা গেছে আগুন লাগার পর সে ধরনের চেষ্টা ছিল না। বেশ কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী ব্যবসায়ী বলেন, ১ মিনিট পানি দেয়ার পর তারা বলে আর পানি নেই। ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীরা দ্রুত আগুন না নেভানো নিয়েও অনেক প্রশ্ন তুলেছেন। পর্যবেক্ষক মহল সন্দেহের এ বিষয়টিকে খাটো করে দেখছেন না।

তৃতীয়ত, উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আনিসুল হকের একটি মন্তব্য ব্যবসায়ীদের সন্দেহের আগুনে ঘি ঢেলে দেয়ার মতো হয়েছে। সকালে ঘটনাস্থলে এসেই তিনি গণমাধ্যম কর্মীদের এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘আমি ৯৯ পার্সেন্ট নিশ্চিত এখানে নাশকতার কোনো ঘটনা ঘটেনি। বৈদ্যুতিক লাইন থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে।’ তার এ বক্তব্য শুনে উপস্থিত সবাই হতবাক হয়ে যান। সাধারণত তদন্তের আগে কিংবা নিশ্চিত না হয়ে এসব ঘটনায় দায়িত্বশীল কেউ এমন মন্তব্য করেন না।

এদিকে মেয়র আনিসুল হকের এমন মন্তব্যের পর ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা আরও ফুঁসে ওঠেন। তারা মেয়রের প্রতি পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে বলেন, উনি এখনই কীভাবে ৯৯ ভাগ নিশ্চিত হলেন যে এখানে নাশকতামূলক কোনো ঘটনা ঘটেনি। যেখানে তাদের মনোনীত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেট্রো গ্রুপ ডিসিসি মার্কেটের ছয় শতাধিক দোকানদারকে এক রকম জোরপূর্বক উচ্ছেদ করে বহুতল ভবন নির্মাণ করতে চায়, সেখানে তার এমন মন্তব্য নিশ্চয় সন্দেহের পাল্লা ভারি করবে।

সর্বশেষে চতুর্থ কারণটি খুবই প্রণিধানযোগ্য। সেটি হল, এ মার্কেটের জায়গা দখলে মেট্রো গ্রুপের দীর্ঘদিনের অপচেষ্টা। ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীরা মনে করেন, তাদের এখান থেকে উচ্ছেদ করতে হেন চেষ্টা নেই যা মেট্রো গ্রুপ করেনি। বিশেষ করে মামলায় হেরে গিয়ে তারা একরকম হতাশ হয়ে পড়েন। কয়েক দফায় বিদ্যুৎ ও পানির লাইনও তারা কেটে দেয়। লেলিয়ে দেয় সন্ত্রাসী। কিন্তু যখন তাদের সব অপচেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যায়, তখন তারা এমন একটি জঘন্য পথ বেছে নেবে, এটাই স্বাভাবিক। এমনটিই আশংকা করছেন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের অনেকে। ষড়যন্ত্র করে আগুন লাগানোর অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ডিসিসি মার্কেট দোকান মালিক সমিতির সভাপতি আওয়ামী লীগ নেতা তালাল রেজভী যুগান্তরকে বলেন, বিষয়টি গভীরভাবে তদন্ত করে দেখা উচিত। তিনি অভিযোগ করেন, ফায়ার সার্ভিস সঠিক সময়ে এলে ক্ষয়ক্ষতি কিছুটা কম হতো। ফায়ার সার্ভিসের গাফিলতির কারণেও আগুন ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছায়। উদ্দেশ্যমূলকভাবে আগুন লাগানোর অভিযোগ অস্বীকার করে মেট্রো গ্রুপের জেনারেল ম্যানেজার মোর্শেদ আলম যুগান্তরকে বলেন, এ ধরনের কথাবার্তা যারা বলছে তারা ঘোলাপানিতে মাছ শিকার করতে চাইছে। প্রকৃতপক্ষে দোকান মালিকদের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক করা হলেও দোকান মালিকরা মতৈক্যে পৌঁছতে পারেননি।