গোয়েন্দা ইউনিট হচ্ছে দুদকে

acc_35049_1482866097.jpg

নির্ধারিত সময়ে নির্ভুল অনুসন্ধান ও তদন্ত নিশ্চিত হবে * আইন সংশোধনের প্রয়োজন নেই, বিধির মাধ্যমেই কার্যকর

টেকনাফ টুডে ডেস্ক |
নিজস্ব গোয়েন্দা ইউনিট গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। পঞ্চবার্ষিকী কৌশলগত কর্মপরিকল্পনা (২০১৬-২০২১) বাস্তবায়নের অগ্রাধিকার তালিকায় এটি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও যাচাই-বাছাই, অভিযোগের অনুসন্ধান ও মামলা তদন্ত করতে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সরকারের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃংখলা বাহিনীর ওপর নির্ভর করতে হয় দুদককে। পাশাপাশি পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ, সরকারি-বেসরকারি দফতর ও বিভিন্ন সূত্রের অভিযোগের ভিত্তিতে দুদক নিজেই তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে। এতে অহেতুক কালক্ষেপণসহ অনুসন্ধানের এক পর্যায়ে দেখা যায় সংশ্লিষ্ট অভিযোগ ভিত্তিহীন। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে নির্ধারিত সময়ে নির্ভুল অনুসন্ধান ও তদন্ত কার্যক্রম সম্পন্ন করতে নিজস্ব গোয়েন্দা ইউনিট গঠনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে জানায় দুদক সূত্র।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে দুদক কমিশনার ড. নাসিরউদ্দীন আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, আমাদের পঞ্চবার্ষিকী খসড়া কৌশলগত কর্মপরিকল্পনায় গোয়েন্দা ইউনিট গঠনের বিষয়টি রয়েছে। দুদককে একটি বিশেষায়িত সংস্থায় রূপান্তর করতে যা যা প্রয়োজন কর্মপরিকল্পনায় সব রয়েছে।

দুদক মহাপরিচালক (লিগ্যাল) মাঈদুল ইসলাম বলেন, গোয়েন্দা ইউনিট গঠনে দুদক আইনে কোনো সংশোধনী আনার প্রয়োজন নেই। বিধি দ্বারাই এটি গঠন করা যেতে পারে।

সূত্র জানায়, দুর্নীতিবিরোধী অভিযান জোরদারের পাশাপাশি দুদককে দুর্নীতিবিরোধী বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে রূপ দেয়ার প্রক্রিয়া চলছে। এ লক্ষ্যে বর্তমান কমিশন একটি পঞ্চবার্ষিকী কৌশলগত কর্মপরিকল্পনার খসড়া প্রায় চূড়ান্ত করেছে। এতে দুদককে আরও কার্যকর, গতিশীল, স্বাধীন এবং পেশাদার প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচালনার ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতাও চিহ্নিত করা হয়। পাশাপাশি এগুলো নিরসনে দেয়া হয় বেশ কিছু সুপারিশও। এতে দুদকের অনুসন্ধান, মামলা এবং তদন্তকে আরও বস্তুনিষ্ঠ করার কৌশল তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে সঠিক তথ্য সংবলিত অভিযোগ প্রাপ্তি ও যাচাই-বাছাই। এছাড়া দৃষ্টান্তস্বরূপ এফবিআই এবং ইন্দোনেশিয়ার দুর্নীতিবিরোধী সংস্থাসহ বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংস্থার দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রমের সাফল্যের নানা দিক উল্লেখ করা হয়েছে পঞ্চবার্ষিকী কর্মপরিকল্পনার খসড়ায়।

সূত্র মতে, বিভিন্ন উৎস থেকে আসা দুর্নীতির অভিযোগ যাচাই-বাছাই করতে একটি কমিটি রয়েছে। এ কমিটিতে গড়ে প্রতিদিন ৮৫ থেকে ১০৫টি অভিযোগ আসে। এর মধ্যে ৯৬ শতাংশ অভিযোগই দুদকের এখতিয়ারবহির্ভূত। বাকি ৪ শতাংশ অভিযোগের অধিকাংশই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। কারণ অনুসন্ধানের প্রাথমিক পর্যায়েই দেখা যায়, এসব অভিযোগের পেছনে রয়েছে ব্যক্তি স্বার্থ, পেশাগত বিরোধসহ নানা ষড়যন্ত্র। ফলে এসব ভিত্তিহীন অভিযোগের পেছনে অনুসন্ধান করতে গিয়ে অহেতুক সময় নষ্ট হচ্ছে। পাশাপাশি অকারণে হয়রানির শিকার হতে হয় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি অথবা প্রতিষ্ঠানকে। আর অভিযোগ ভিত্তিহীন হওয়ায় স্বাভাবিক কারণেই দায়মুক্তি দেয়া হয় সংশ্লিষ্টদের। দুদক দায়মুক্তি দিয়েছে- এমন শিরোনামে সংবাদ প্রচার হয় গণমাধ্যমে। এতে দুদকের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। দুদকের নিজস্ব গোয়েন্দা ইউনিট গঠন করা হলে বিদ্যমান এসব সমস্যা অনেকাংশেই কমে আসবে বলে মনে করছেন দুদক সংশ্লিষ্টরা।

দুদকের একজন পরিচালক নাম প্রকাশ না করে জানান, নিজস্ব গোয়েন্দা পদ্ধতি না থাকায় অনেক ভালো কাজ করেও সাফল্য দৃশ্যমান হচ্ছে না। এটি আমাদের একটি সীমাবদ্ধতা। দুদকের পঞ্চবার্ষিকী কৌশলগত কর্মপরিকল্পনার খসড়ায় বহিরাগমন ও পাসপোর্ট অধিদফতর, নির্বাচন কমিশন, বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশন (বিটিআরসি) ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে সমঝোতার কথা বলা হয়েছে। এ সংক্রান্ত চুক্তি প্রস্তাবিত গোয়েন্দা ইউনিটে সঙ্গে হবে। পাসপোর্টের সঙ্গে সমঝোতা থাকলে অভিযোগ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও মামলার আসামির পাসপোর্টের তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া সম্ভব। এখন ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে চাহিদাপত্র দিয়ে তথ্য আনতে হয়। এতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। অহেতুক বিলম্বিত হয় অনুসন্ধান-তদন্ত। দুর্নীতি মামলার আসামিদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও পাসপোর্ট নম্বর, পাসপোর্টে উল্লেখিত নামের ইংরেজি বানান, ঠিকানা দিতে না পারায় নির্বিঘ্নে পালিয়ে যায় তারা। এছাড়া অধিকাংশ ক্ষেত্রে দুদকের হাতে আসামির সঠিক তথ্য সংবলিত জাতীয় পরিচয়পত্র না থাকায় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে তল্লাশি করা সম্ভব হয় না। বিটিআরসির সঙ্গে কোনো চুক্তি না থাকায় অভিযোগ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কিংবা আসামির মোবাইল ট্র্যাকিং সম্ভব হচ্ছে না। পাশাপাশি অনুসরণ করা যায় না আসামির গতিবিধি। অবস্থান সম্পর্কে সোর্সের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালাতে গিয়ে অধিকাংশ সময়েই আসামিকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয় না। এছাড়া নানা কারণে দুদক সংশ্লিষ্টদের দুর্নীতির বিষয়টিও সঠিকভাবে করা হয় না। নিজস্ব গোয়েন্দা ইউনিট গঠন করা হলে এটিও নিশ্চিত হবে বলে মনে করছেন দুদকের এই পরিচালক।

এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান শনিবার যুগান্তরকে বলেন, নিজস্ব গোয়েন্দা শাখা গঠন একটি যৌক্তিক উদ্যোগ। দুর্নীতিতে যুক্ত হচ্ছে নতুন মাত্রা ও অভিনব কৌশল। এর সঙ্গে পাল্লা দিতে হবে দুদককে। আর এজন্যই প্রয়োজন নিজস্ব গোয়েন্দা ব্যবস্থা। তবে এটির স্বচ্ছতা থাকতে হবে। গোয়েন্দা-ক্ষমতার যেন অপব্যবহার না হয়।

logo