সবার দৃষ্টি নারায়ণগঞ্জে : অগ্নিপরীক্ষায় দুই দল

1_86935.jpg

সবার দৃষ্টি এখন নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন (নাসিক) নির্বাচনের দিকে। প্রথমবারের মতো দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এ নির্বাচনের দিকে শুধু নারায়ণগঞ্জবাসীই নয়, সমগ্র দেশবাসী তাকিয়ে রয়েছে। নির্বাচন পরিস্থিতি ও ফল দেখার অপেক্ষায় আছে বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক, দাতা সংস্থার প্রতিনিধি, এমনকি প্রবাসী বাংলাদেশীরাও। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জনগণের কাছে প্রধান দুটি দলের জনপ্রিয়তার অবস্থান কোন পর্যায়ে আছে, তা বেরিয়ে আসবে এ নির্বাচনের মাধ্যমে। আসন্ন নির্বাচন কমিশন গঠন ও ভবিষ্যৎ জাতীয় নির্বাচনের জন্য নাসিকের ফল বিশ্লেষণ খুবই জরুরি। অনেকে মনে করেন, এ নির্বাচনে যারা জয়ী হবে, তারা রাজনীতি ও ভোটের মাঠে বড় স্কোরে এগিয়ে যাবে। নৌকা প্রতীক জয়ী হলে সরকারি দল এটিকে বেঞ্চমার্ক ধরে নিয়ে বলবে জনগণের কাছে তাদের জনপ্রিয়তা বেশি। বিপরীতে ধানের শীষ জয়ী হলে বিএনপি ভোট ও মাঠের রাজনীতিতে অনেকখানি এগিয়ে যেতে পারবে। বিশেষ করে আসন্ন নতুন নির্বাচন কমিশন গঠনে দরকষাকষিতে অনেকটা শক্তি ও সাহস নিয়ে এগোতে পারবে। এছাড়া সারা দেশে তাদের যেসব নেতাকর্মী ও সমর্থক রয়েছেন তারা জেগে ওঠার প্রেরণা পাবেন। দুই প্রধান দলের এ ধরনের হিসাব-নিকাশের চ্যালেঞ্জের মুখে নানা উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় আজ ভোট গ্রহণ চলবে।

তাদের মতে, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে নারায়গঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দুই প্রধান দলই তাদের জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের পাশাপাশি শক্তির মহড়াও দেখাতে চাইছে। প্রচার-প্রচারণায় দুই দলের কেন্দ্রীয় নেতারা অংশ নিয়ে অন্তত তাই বুঝিয়েছেন। এছাড়া স্থানীয় রাজনীতির কারণেও নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন দেশবাসীর কাছে বিশেষ অর্থ বহন করছে। বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলের মেয়র প্রার্থী ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর সঙ্গে নারায়ণগঞ্জের প্রভাবশালী ওসমান পরিবারের দূরত্ব শেষমেশ ভোটের হিসাব-নিকাশ পাল্টে দিতে পারে। যদিও তারা আইভীর সঙ্গে আছেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন। কিন্তু সাধারণ মানুষ মনেপ্রাণে তা বিশ্বাস করে না।

বিশিষ্ট আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিকের মতে, নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন শুধু দুই প্রধান দলের (আওয়ামী লীগ ও বিএনপি) জন্যই অগ্নিপরীক্ষা নয়, এ নির্বাচন সরকার এবং নির্বাচন কমিশনের জন্যও অগ্নিপরীক্ষা। বুধবার যুগান্তরকে তিনি এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, জাতীয় নির্বাচনের আরও অনেক দেরি থাকলেও এ নির্বাচনকে বেশ গুরুত্বের সঙ্গেই নিয়েছে দুই প্রধান দল আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি। তারা এ নির্বাচনকে প্রেস্টিজ ইস্যু হিসেবে দেখছে। এছাড়া এ নির্বাচনের জয়-পরাজয়ের মধ্য দিয়ে দুই দলই দেশবাসীকে একটি বার্তা দিতে চায়।’ ড. শাহদীন মালিক বলেন, মানুষ চায়, এ নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হোক। তা না হলে বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর মানুষের আর আস্থা থাকবে না।

এ প্রসঙ্গে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমান বুধবার যুগান্তরকে বলেন, ‘আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শুধু দুই দলই নয়, সমগ্র জাতি তাকিয়ে আছে এ নির্বাচনের দিকে। এ নির্বাচনের মধ্য দিয়েই সরকার এবং নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা স্পষ্ট হবে। চলমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেও এ নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে আরও উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রেও এ নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।’

তিনি বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে অনিয়ম হলে দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থা চিরতরে নস্যাৎ হয়ে যাবে। মানুষ আর নির্বাচনের ওপর আস্থা রাখতে পারবে না।’ ড. তারেক শামসুর রেহমান বলেন, ‘মনে রাখতে হবে, এমন একটা সময় এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যখন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন ইস্যুতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপ শুরু করেছেন। এ ধরনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপটে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের দিকে দৃষ্টি সবার। কী আওয়ামী লীগ, কী বিএনপি, পুরো দেশের দৃষ্টি নির্বাচনের দিকে। প্রবাসী বাংলাদেশীদেরও দৃষ্টি নারায়ণগঞ্জের দিকে। বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক এবং দাতা সংস্থার প্রতিনিধিরাও এ নির্বাচন কঠোরভাবে মনিটরিং করছে। তাই নানা দিক দিয়েই নাসিক নির্বাচন খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

এই নির্বাচন জাতীয় রাজনীতিতে কি প্রভাব ফেলতে পারে- তা মূল্যায়ন করতে গিয়ে তিনি বলেন, এই নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী জয়ী হলে জাতীয় রাজনীতিতে এর প্রভাব পড়বে। বিএনপি দেশবাসীকে বোঝাতে সক্ষম হবে যে তাদের তৃণমূল পর্যায়ে জনপ্রিয়তা রয়েছে। আর বিএনপি পরাজিত হলে, আওয়ামী লীগ প্রার্থী জয়ী হলে- ক্ষমতাসীনরা বোঝাতে সক্ষম হবে যে বিএনপির আসলেই জনসমর্থন নেই। তাদের (বিএনপি) সবকিছুই ফাঁকা বুলি। ড. তারেক শামসুর রেহমান বলেন, ‘এজন্য নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হওয়াটাই জরুরি। নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হলে অনেক প্রশ্নের উত্তর মিলবে। আর নির্বাচনে কারচুপি হলে অতীতের মতোই সরকার এবং নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হবে, এর সুফল যাবে বিএনপির ঘরে।

নারায়ণগঞ্জের মাঠ পর্যায়ের রাজনীতি এবং দুই প্রধান প্রার্থীর অবস্থান সম্পর্কে মূল্যায়ন করতে গিয়ে ড. তারেক শামসুর রেহমান বলেন, ‘সেলিনা হায়াৎ আইভীর এবারের বিজয় খুব সহজ হবে না। আগেরবার তিনি দলীয় প্রার্থী ছিলেন না। এবার দল মনোনীত প্রার্থী হয়েছেন। সরকারি দলের প্রার্থী হওয়ায় সরকারবিরোধী ভোটারদের ভোট পাওয়া থেকে বঞ্চিত হবেন তিনি। অন্যদিকে তার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানের রয়েছে ক্লিন ইমেজ। সন্ত্রাসবিরোধী আন্দোলনে তিনি ছিলেন অগ্রভাগে। আর সবচেয়ে বড় কথা, এই নির্বাচনে বিএনপি ও তাদের শরিকদের হারানোর কিছু নেই। বরং নির্বাচনে জয়ী হলে অর্জন হবে অনেক কিছু- এমন ভাবনা মাথায় রেখে এগুচ্ছে তারা।

তিনি বলেন, ‘অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেনের পক্ষে সবাই যেভাবে একাট্টা হয়ে মাঠে নেমেছেন তেমনটি দেখা যায়নি সেলিনা হায়াৎ আইভীর পক্ষে। তিনি দলকে ঐক্যবদ্ধ করে নির্বাচনী মাঠে নামতে পারেননি। বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জের প্রভাবশালী এবং জনপ্রিয় পরিবার- ‘ওসমান পরিবার’ এখন পর্যন্ত তার বিপক্ষে বলেই স্থানীয়রা মনে করছেন। যদিও ওসমান পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে তারা সেলিনা হায়াৎ আইভীর পক্ষেই আছেন। কিন্তু স্থানীয় বাসিন্দারা তা বিশ্বাস করতে পারছেন না। তারা মনে করছেন, হয়তো আওয়ামী লীগ প্রধানকে খুশি করতে প্রকাশ্যে সেলিনা হায়াৎ আইভীকে সমর্থন জানানোর কথা বলছে ওসমান পরিবার। আবার এটাও সত্য যে, সেলিনা হায়াৎ আইভীও ওসমান পরিবারকে খুব একটা আমলে নিতে নারাজ। মানুষ মনে করে এই মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব ভোটের দিন জয়-পরাজয়ে প্রভাব ফেলতে পারে।’

সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু স্থানীয় পর্যায়েই নয়- এই নির্বাচনকে ঘিরে জাতীয় রাজনীতিতেও সৃষ্টি হয়েছে উত্তাপ। বড় দুই দল আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি নির্বাচনকে দেখছে মর্যাদার লড়াই হিসেবে। দলীয় প্রার্থীকে জয়ী করতে সব ধরনের চেষ্টা চালিয়েছেন দল দুটির নেতারা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরাও বলছেন, এ নির্বাচনের ফলের ওপর নির্ভর করছে দেশের পরবর্তী রাজনীতির গতিপ্রকৃতি। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত গণসংযোগে অনেকটাই এগিয়ে ধানের শীষ। বিএনপির স্থায়ী কমিটি থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় দুই শতাধিক নেতা পুরো এলাকা চষে বেড়িয়েছেন ধানের শীষের পক্ষে। বিশ দলীয় জোটের শরিকরা তো আছেই, আছে তাদের স্থানীয় নেতাকর্মী-সমর্থকরাও। জামায়াতে ইসলামীর ভোটও পড়বে ধানের শীষে। এর সঙ্গে যোগ হবে নীরব এবং সরকারবিরোধী ভোটার। যোগ হবে সেলিনা হায়াৎ আইভীবিরোধী আওয়ামী লীগের কিছু ভোট। পক্ষান্তরে নৌকার পক্ষে কেন্দ্রীয় নেতাদের বাইরে জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগ নেতাদের খুব একটা দেখা যায়নি।

ড. তারেক শামসুর রেহমানের মতে, ৩৫ থেকে ৪০ ভাগ ভোটার কোনো দল করেন না। তারা সাধারণ খেটেখাওয়া শ্রমিক। এই বিপুল জনগোষ্ঠী যেদিকে ঝুঁকবেন শেষ হাসি হাসবেন সেই প্রার্থী।

জানতে চাইলে এ প্রসঙ্গে লেখক কলামিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ বুধবার যুগান্তরকে বলেন, ‘এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সরকার এবং নির্বাচন কমিশনের শেষ পরীক্ষা হবে। বাংলাদেশে আর আদৌ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হবে কি না সেই পরীক্ষাও হবে এই নির্বাচনে।’ তিনি বলেন, ‘নির্বাচন সুষ্ঠু হলে, প্রতদ্বন্দ্বী দল যাই মনে করুক- যে ফলাফল হবে সবাই তা গ্রহণ করবে। নির্বাচন সুষ্ঠু না হলে, ফলাফল যাই হোক না কেন তার দায় সরকার এবং নির্বাচন কমিশনকে বহন করতে হবে।’