রোহিঙ্গা বস্তিকে ‘জঙ্গির আতুড় ঘর’ হিসেবে ব্যবহার করছে

5443.jpg

কায়সার হামিদ মানিক, উখিয়া |
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে মুসলিম রোহিঙ্গাদের উপর সেদেশের সেনা, পুলিশ ও মগ সম্প্রদায়ের পৈচাশিক নির্যাতন থেকে বাঁচতে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসছে রোহিঙ্গারা। নব্বই দশকেও বিশাল অংকের রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আসে। এরপর বেশ কয়েকবার রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ হয়েছে থেমে থেমে। কিন্তু সম্প্রতি রাখাইনে মানবিক বিপর্যয় ভয়াবহ আকার ধারন করায় সীমান্ত পেরিয়ে রোহিঙ্গারা আসছে প্রতিদিন। আর এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে নব্বই দশকের মতো উখিয়া-টেকনাফে কয়েকটি সংগঠন আবারো নানা অপতৎপরতা চালাচ্ছে। এসব সংগঠনের বিরুদ্ধে জঙ্গী সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠেছে।
সূত্রমতে, কুতুপালং বস্তিতে নতুন করে আসা বিপদাপন্ন রোহিঙ্গাদের টার্গেট করে গোপনে আর্থিক লেনদেন করছে ‘ভয়েস অব রোহিঙ্গা রিফুউজি ফর হিউম্যান রাইস সংক্ষেপে (বিআরআরএইচ) ও ইত্তেহাদুল জামিয়াতুল ইসলাম। তারা জঙ্গী কর্মকান্ডেও গোপনে ভূমিকা রাখছে। কিন্তু (বিআরআরএইচ) ও ইত্তেহাদুল জামিয়া বস্তি এলাকায় জঙ্গি কার্যক্রম চালালেও বারবার আরএসও’র নাম আসার সুযোগে এ সংগঠনের নেতারা আড়ালে থেকে যাচ্ছে। রাতে ও ভোরে উক্ত সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা রোহিঙ্গা বস্তিতে এসে নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের মাঝে নগদ টাকা বিরতণের মাধ্যমে সংগঠনের প্রতি নতুন আসা রোহিঙ্গাদের সম্পৃক্ত করছে। গত মঙ্গলবার রাতে ৯০০ রোহিঙ্গার মাঝে নগদ টাকা বিতরণ করার অভিযোগ রয়েছে ইত্তেহাদুল জামিয়ার বিরুদ্ধে। এভাবে দল ভারী করছে তারা। এ সংগঠনের নেতা-কর্মীরা স্থানীয় মেম্বার আওয়ামীলীগ নেতা এক মৌলভীর আশ্রয়ে থেকে এসব জঙ্গি কর্মকান্ড চালানোর অভিযোগ উঠেছে।
সূত্র জানায়, কক্সবাজারের দুটি রোহিঙ্গা শরনার্থী শিবির ও বস্তির বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গাকে পূঁজি করে চলছে নানা তৎপরতা। মানবতার বিপর্যয় রোধে সহযোগিতার আবহে দূর্দশাগ্রস্থ রোহিঙ্গা পরিবারের সাহসী তরুণদের জঙ্গি কর্মকান্ডে সম্পৃক্ত করার মিশন চলছে। রোহিঙ্গা বস্তিকে বানানো হচ্ছে জঙ্গি তৈরীর ‘আতুড় ঘর’। আর এসব কাজে অর্থ বিলাচ্ছে ‘ভয়েস অব রোহিঙ্গা রিফুউজি ফর হিউম্যান রাইটস ও ইত্তেহাদুল জামিয়াতুল ইসলাম নামের সংগঠন দুটি।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মিয়ানমারের সেনা ও পুলিশের নির্যাতনে পালিয়ে আসা বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা বর্তমানে কুতুপালং ও নয়াপাড়া ক্যাম্পে অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। বস্তি ও ক্যাম্প এলাকার বাইরে এসব রোহিঙ্গাদের বিচরণ স্থানীয় জনগণের মতো। এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে একাধিক সুযোগ সন্ধানী সংগঠন বাস্তোহারা রোহিঙ্গাদের টার্গেট করে বস্তি এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে তাদের কর্মকান্ড বৃদ্ধি করেছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও বস্তিতে অবস্থানকারী ‘ভয়েস অব রোহিঙ্গা রিফুউজি ফর হিউম্যান রাইটস ও ইত্তেহাদুল জামিয়াতুল ইসলামের স্থানীয় পর্যায়ের নেতা মৌলভী জানে আলম, মৌলভী হামিদ, মৌলভী আইযুব, মৌলভী শফি, ডাক্তার ওসমান, নুরুল আমিন মাঝি, মোহাম্মদ নুর, আবু সিদ্দিক, মৌলভী মনজুর, হাফেজ আতা উল্লাহ, খাইরুল আমিন, আবুল কালাম, নুরুল আলম, ভেজাইল্লা সহ আরো কযেকজনের বিরুদ্ধে নতুন আসা রোহিঙ্গাদের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে নগদ টাকা বিতরনের মাধ্যমে জঙ্গি সংগঠনে সম্পৃক্ত করার অভিযোগ উঠেছে। তুরস্ক ভিত্তিক সংস্থা এয়ারদিন ইলি ও কারদিস ইলি নামে একটি জঙ্গি সংগঠন থেকে বিপুল পরিমান অর্থ সরবরাহ পাচ্ছে বলে জানা গেছে। আর নেপথ্যে থেকে সবকিছু নিযন্ত্রন করার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে। গত রোববার ও মঙ্গলবার ভোরেও এসব সংগঠন বস্তির রোহিঙ্গাদের মাঝে নানা ভোগ্যপণ্য ও নগদ টাকা বিতরণ করেছে বলে স্থানীয় সুত্রে জানা গেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক রোহিঙ্গা নেতা জানান, ইত্তেহাদুল জামিয়াতুল ইসলাম ও ‘ভয়েস অব রোহিঙ্গা রিফুউজি ফর হিউম্যান রাইটস নামের সংগঠন দুটি উখিয়া টেকনাফের রেডিষ্টার্ড, আন-রেজিষ্টার্ড রোহিঙ্গা শরনার্থী শিবিরগুলোর বিপদাপন্ন রোহিঙ্গাদের পুঁজি করে কোটি কোটি টাকার মিশন বাস্তবায়ন করছে। তারা বাংলাদেশের এ রোহিঙ্গা বস্তিকে ‘জঙ্গির আতুড় ঘর’ হিসেবে ব্যবহার করছে। যার বিনিময়ে হাতে পাচ্ছেন কাড়ি কাড়ি ডলার। তারা আরো জানায়, কুতুপালং ও নয়াপাড়া ক্যাম্পে বেশ কয়েকটি মসজিদ, মাদ্রাসা নির্মাণ করা হয়েছে মধ্যপ্রাচ্য ভিত্তিক কয়েকটি সংগঠনের অর্থায়নে। মৌলভী মনজুর, মৌলভী জানে আলম ও মৌলভী হামিদের তত্বাবধানে এসব মসজিদ-মাদ্রাসা তৈরী হয়। যার পেছনে ছিলেন কুতুপালংয়ের এক জনপ্রতিনিধি ও হাফেজ ছলাহুল ইসলাম। তাদের মাধ্যমে আসা মর্ধপ্রাচ্যের প্রশ্নবিদ্ধ নানা সংগঠনগুলোর দেয়া বিপুল পরিমান অর্থ বিতরণ করতে ব্লক ভিক্তিক কমিটি করেন তারা। বিচ্ছিন্ন ভাবে কিছু মৌলভী দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এসে রোহিঙ্গা বস্তিতে টাকা ও নানা সাহায্য বিলাচ্ছে উল্লেখ করেন। আইএমও ও ডাব্লিউ এফপিও নতুন আসা রোহিঙ্গাদের বিনা অনুমতিতে ঢালাও ভাবে ২ দিন ধরে ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করলেও নতুন রোহিঙ্গারা পাচ্ছেনা বলে অভিযোগ উঠেছে। পুরাতন বস্তির রোহিঙ্গারাই ঐসব ত্রাণ সামগ্রী নিয়ে যাচ্ছে। নতুন রোহিঙ্গারা কক্সবাজার-টেকনাফ আরকান সড়কের কুতুপালং এলাকায় রাস্তার ২ পাশে সারিবদ্ধ ভাবে দাঁড়িয়ে, বসে রয়েছে ত্রানের অপেক্ষায়।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আশরাফুল হক টুটুল সাংবাদিকদের বলেন, এতসব বিষয় জানা ছিল না। জঙ্গীদের বিষয়ে সরকার ও প্রশাসন জিরো টলারেন্সে রয়েছে। ক্যাম্প ভিত্তিক সকল কর্মকান্ড তদারক করতে স্থানীয় থানাকে বলা আছে। এরপরও সব বিষয়ে খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেয়া হবে। তিনি এ ব্যাপারে সাংবাদিকদের সহযোগিতা কামনা করেন।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আলী হোসেন বলেন, আমরা এসব বিষয়ে এলার্ট রয়েছি। যে কেউ চাইলে বিপদাপন্ন রোহিঙ্গাদের সহযোগিতা করতে পারেন, তবে তা প্রশাসনের মাধ্যমে হতে হবে। রাতের আধাঁরে কারা কর্মকান্ড চালাচ্ছে তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কারো সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হবে।