টেকনাফের হ্নীলা সীমান্তের ৫টি আদম ঘাট সংশ্লিষ্ট ৫৪ দালালের হাত ধরে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ অব্যাহত

dalal.jpg

কাইছার পারভেজ চৌধুরী, টেকনাফ |
মিয়ানমারে রাখাইন রাজ্যে সেদেশের সেনাবাহিনী কর্তৃক সংখ্যলঘু মুসলিমদের নির্যাতন, নিপীড়িন, জুলুম-হত্যা, ধর্ষণের ঘটনায় মিয়ানমারের নারী পুরুষ প্রাণ রক্ষার্থে বাংলাদেশে পালিয়ে আসছে। আর এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের ৪টি রোহিঙ্গা পারাপারের অবৈধ ঘাটের সংশ্লিষ্ট দালালের হাত ধরে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ অব্যাহত রয়েছে। জাদিমুড়া, মোচনী-নয়াপাড়া, লেদা, হ্নীলা পুরাতন বাজার এলাকার দালাল সদস্যরা ৪টি রোহিঙ্গা পারপারের ঘাট দিয়ে প্রতি রাতে শত শত রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ শিশুদের সেদেশের দালাল চক্রের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে মোটা অংকের বিনিময়ে এদেশে হাতছানি দিয়ে নিয়ে আসছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। রোহিঙ্গাদের এদেশে নিয়ে এসে দালাল চক্র তাদের কাছ থেকে মোটা অংকের নগদ টাকা, মোবাইল সেট, স্বর্ণালংকার সহ মূল্যবান জিনিসপত্র হাতিয়ে নিয়ে অনিবন্ধিত লেদা রোহিঙ্গা ক্যাম্প, নয়াপাড়া রেজিষ্টার্ড ক্যাম্প ও উখিয়ার কুতুপালং নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত ক্যাম্পের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। শুধু তা নয় রোহিঙ্গাদেরে নিয়ে আসার পথে দালালরা ইয়াবাসহ অন্যান্য মাদক দ্রব্য ও নিয়ে আসছে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে খবর পাওয়া গেছে।
টেকনাফের লেদা রোহিঙ্গা ক্যাম্পটি অনিবন্ধিত ও অরক্ষিত এবং আগে থেকেই ১৯৪৮ পরিবার সেখানে অবস্থান করছে। সেখানে নতুন করে আসা প্রায় ৫ হাজার রোহিঙ্গা যত্রতত্র ঢুকে প্রতিটি বাড়ীতে আশ্রয় নেওয়ায় বর্তমানে তিল ধারণের ঠাই নেই। তাছাড়া আশ পাশের গ্রাম গুলোতে নতুন করে বাসা বাড়ী করে আশ্রয় নিতেও দেখা গেছে রোহিঙ্গাদের।
এছাড়া নয়াপাড়া রেজিস্ট্রার্ড শরণাথী ক্যাম্পে ১৯ হাজারের অধিক রোহিঙ্গা রয়েছে। সেখানে নতুন করে ৫ হাজারের বেশী নতুন আসা রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে বলে জানা গেছে।
দলে দলে রোহিঙ্গাদের আগমনের পেছনে সেদেশের সেনাদের নির্যাতনের পাশাপাশি দুই দেশের দালালদেরও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা। কেননা রোহিঙ্গাদের পারাপার করে দালালদের মোটা অংকের বানিজ্যের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় গ্রামবাসী ও আগত লেদা রোহিঙ্গা ক্যাম্পসহ বিভিন্ন স্থানে অবস্থানরত বেশ কিছু রোহিঙ্গাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে | জাদিমুড়া খালের উত্তর পাশে নয়াপাড়া ক্যাম্প বরাবর কেওড়া বাগান দিয়ে মৃত বদিউল আলমের পুত্র আব্দুল আমিন প্রকাশ আব্দুইল্লা ওরফে বিএনপি আব্দুইল্লাহ, মৃত মীর আহমদের পুত্র আব্দুল জলিল, নাগুর পুত্র এমরান, বার্মাইয়া ইসমাঈল, শফিকুর রহমান, আমির হামজা, হাবিবউল্লাহ, জালাল, ফজি উল্লাহ রাতের আঁধারে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে যাচ্ছে। মিয়ানমারের রাইম্যাবিল, রাইম্যাঘোনা ঘাট থেকে এইসব দালালরা নৌকায় করে ৫ থেকে ১০ হাজার টাকার বিনিময়ে রোহিঙ্গাদের নিয়ে আসছে। আবার প্রবাসে থাকা রোহিঙ্গা পরিবার গুলো থেকে ১ থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত এপারে নিয়ে আসতে আদায় করেছে বলে জানা গেছে। সপ্তাহখানেক আগে নৌকাডুবিতে ৩৫ রোহিঙ্গা নিহতের নৌকাটি এই ঘাটের দালালরা নিয়ে আসছিল বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
আর এই ঘাটের দালালদের গডফাদার সন্দিপের শফি। শফি নয়াপাড়া বাজারে বসে প্রশাসনের লোকজনের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তোলে তাদের গতিবিধি দালালদের সরবরাহ করে থাকে বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে এই এলাকার দালালরা আইন শৃংখলা বাহিনীর ধরা ছোঁয়ার বাইরে নিরাপদে রোহিঙ্গা বানিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে।

জাদিমুড়া ও ওমর খাল পয়েন্ট দিয়ে জাদিমুড়া এলাকার নুর মোহাম্মদের পুত্র শাহ আলম, মৃত কালা চান এর পুত্র হাবিউল্লাহ, তাজর মুল্লুকের পুত্র নুরুল ইসলাম, মৃত গোলাল নবীর পুত্র আব্দুল হাকিম প্রকাশ ধইল্লা, আবুল বশর মনু, ডাকাত হাবিবুল্লাহর জামাতা নুরুল আলম, নজির আহমদের পুত্র নুরুল বশর, খাইরুল বশর, রশিদ আহমদ, মৃত আবদুল জলিলের পুত্র কামাল হোসেন প্রকাশ পেঠান, হামিদ হোসনের পুত্র মোঃ তৈয়ুব, আবুল কাসেমের পুত্র শামশুল আলম, নজির আহমদের পুত্র জিয়াউর রহমান, রশিদের পুত্র মোঃ জয়নাল, মৃত আবুল কাসেমের পুত্র আবদুর রহমান, নূর কামাল, কামাল হোসেন, আবুল ফয়েজ (বার্মায়া), নুর হাসিম গুন্ডায়া, বদি আলম, আয়ুব খান, ইউসুফ, রোহিঙ্গা বানিজ্য করে প্রতি রাতে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। এদের অনেকে বর্তমানে আঙ্গুল ফোলে কলাগাছে পরিণত হয়েছে বলে জানা গেছে।

লেদা খাল দিয়ে পূর্ব লেদার কামাল হোসেনের পুত্র তোফাইল আহমদ, মৃত কোব্বাস মিয়ার পুত্র ফোরকান আহমদ ও মোঃ হোছনের পুত্র আলী আকবর, নজির আহমদের ছেলে ওসমান গনি, জিয়াউর রহমান, মৃত আবুল হোসেনের পুত্র নুর মোহাম্মদ, কবির আহমদ, আবুল কাসেমের পুত্র শামসুল আলম, মৃত আব্দুল জলিলের পুত্র কামাল হোসেন প্রকাশ পেটান, কবির আহমদের পুত্র হেলাল, পশ্চিম লেদার হাফেজ আহমদের পুত্র শাহীন উদ্দিন, মৃত আবুল কাসেমের পুত্র আব্দুর রহমান, জাহাঙ্গীর, জাফর, সরওয়ার, জসিম রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে যাচ্ছে। এই দালালরা প্রতিদিন বিজিবি টহল দলকে ফাঁকি দিয়ে মোটা অংকের বিনিময়ে ওপারের রোহিঙ্গাদের এ পারে নিয়ে এসে মাথা পিছু ৫ হাজার টাকা থেকে ১০ হাজার টাকা করে নিয়ে কিছু সময় ধরে দালালদের বাড়ীতে রেখে সুযোগ বুঝে লেদা রোহিঙ্গা ক্যাম্পের দিকে ঢুকিয়ে দেয়। এদের নিজস্ব নৌকায় রাতের আঁধারে রাখাইন রাজ্য থেকে রোহিঙ্গাদের নিয়ে আসে। এভাবে অল্প কয়েকদিনে এরা লাখ লাখ টাকা অবৈধ আয় করেছে বলে জানা গেছে। আবার ওই পার থেকে আসা রোহিঙ্গারা টাকা দিতে না পারলে তাদেরকে বিভিন্ন বাড়িঘরে আটকিয়ে রেখে টাকা আদায় করা হয় বলে জানা গেছে। বেশ কয়েকদিন আগে লেদা এলাকায় রোহিঙ্গা অবস্থানের খবর সরবরাহ করে উল্টো বিজিবির হাতে স্থানীয় এক যুবক মারধর ও নাজেহাল হয়েছেন বলে জানা গেছে। তবে সেই যুবককে নাজেহালের ঘটনায় বিজিবির কয়েক সদস্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহন করা হয়েছিল বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। লেদা এলাকার মৃত আব্দু সমদের পুত্র কামাল হোসন স্থানীয় বিজিবি ক্যাম্পের সাথে সুসম্পর্ক রেখে বিজিবি সদস্যদের গতিবিধি দালালদের সরবরাহ করে তাদেরকে আশ্রয় প্রশ্রয় দিয়ে লাভবান হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।

দমদমিয়া এলাকায় সোনা মিয়া ও ছুরুত আলম রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশে জড়িত বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

অপরদিকে হ্নীলা পুরাতন বাজার সংশ্লিষ্ট দুইটি ঘাট পূর্ব ফুলের ডেইল ঘাট ও কাস্টমস ঘাট দিয়ে স্থানীয় দালাল চক্রের গডফাদার রবিউল হোসেন আনসারের ছেলে মালেয়শিয়ায় আদম পাচারের তালিকাভূক্ত জাহাঙ্গীর আলম ও পূর্ব পাড়ার খলিলুর রহমানের পুত্র কালুনির নেতৃত্বাধীন দালাল সিন্ডিকেট প্রতিদিন মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের এদেশে অনুপ্রবেশে সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে বলে জানা গেছে। এসব রোহিঙ্গারা এদেশে এসে স্থানীয় কিছু সুযোগ সন্ধানী ও মুনাফা লোভী লোকজন আত্মীয়তার সুযোগে আবার কেউ মুনাফার লোভে বশবর্তী হয়ে গ্রামাঞ্চলের ভাড়া বাসা গুলো সংস্কার ও নতুন করে ভাড়া বাসা নির্মাণ করে এসব রোহিঙ্গাদের আশ্রয় প্রশ্রয় দিয়ে যাচ্ছে। এসব কাজে জড়িত লোকজনের বিরুদ্ধে খতিয়ে দেখে আইনগত ব্যবস্থা না নিলে অদূর ভবিষ্যতে সীমান্ত এলাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা রোহিঙ্গা বিস্ফোরণে মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হবে বলে এলাকাবাসী মনে করছেন।