শরণার্থী শিবিরে রোহিঙ্গারা খাদ্য, বস্ত্র, আবাসন সংকটে : অনুপ্রবেশ থেমে নেই

7766-1.jpg

কায়সার হামিদ মানিক, উখিয়া :
কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফ সীমান্তের নাফ নদী পার হয়ে এসেছিল ২০১২ সালে। অনুপ্রবেশকারী প্রায় ৫০ হাজার রোহিঙ্গাদের তাৎক্ষণিক মিয়ানমারে ফেরত দিতে ব্যর্থ হয়ে তাদেরকে ত্রাণ সামগ্রী বিতরণে স্থানীয় এনজিও গুলোর প্রতি আরোপিত নিষেধাজ্ঞা এখনো বলবৎ রয়েছে। এমতাবস্থায় সদ্য অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করা হচ্ছে না। যে কারণে মৃত্যুভয়ে এক কাপড়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা একদিকে যেমন প্রচন্ড শীতে কাবু হয়ে পড়েছে, অন্য দিকে অন্ন, বস্ত্র বাসস্থানের অভাবে তাদেরকে খোলা আকাশের নীচে মানবেতর দিন কাটাতে হচ্ছে। এমনকি ছোট্ট ছেলে মেয়েরা ঠান্ডা জনিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে বলে রোহিঙ্গা জানিয়েছে। জেলা প্রশাসক মোঃ আলী হোসনের উদ্ধৃতি দিয়ে কক্সবাজার-টেকনাফ সড়কের মরিচ্যা যৌথ চেকপোষ্টের দায়িত্বরত সুবেদার মোঃ সাদেক সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, জেলা প্রশাসকের নির্দেশ ছাড়া কোন প্রকার ত্রাণবাহী গাড়ী কুতুপালং বস্তি এলাকায় যেতে না দেওয়ার জন্য উপরের নির্দেশ রয়েছে। গত বৃহস্পতিবার বস্তি এলাকায় রোহিঙ্গাদের মাঝে নগদ টাকা বিতরণ কালে ক্যাম্প পুলিশ কক্সবাজার কালুর দোকান এলাকার মৌলভী শামশুল আলম নামের এক ব্যক্তিকে আটক করে উখিয়া থানা পুলিশের নিকট সোপর্দ্দ করেছে। উখিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ মোঃ আবুল খায়ের জানান, আটক ব্যক্তির নিকট থেকে ১৮ হাজার ৮শ’ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে।
গতকাল শনিবার সকালে কুতুপালং রোহিঙ্গা বস্তি এলাকা ঘুরে দেখা যায়, বিবস্ত্র ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের কান্নায় পরিবেশ ভারী হয়ে উঠেছে। বনভূমির গাছতলায় বসে থাকা সাহারা খাতুন (৬৫) জানায়, তাদের বাড়ী মংডু বলি বাজার গ্রামে। তাদের দোতলা গাছের বাড়ী ছিল। গরু, মহিষ, হাঁস, মুরগি, জায়গা জমি ছিল অগাধ। হঠাৎ রাতের আধারে বর্মী সেনা পুলিশ ও সশস্ত্র রাখাইন যুবকেরা তাদের বাড়ীতে লুটপাট চালিয়ে আগুন দিলে বাড়ীটি পুড়ে ছাঁই হয়ে যায়। এমনকি গোয়াল ঘরে গরু, মহিষ, ছাগল পর্যন্ত পুড়ে অঙ্গার হয়ে যায়। এসময় গুলি করে মেরে ফেলা হয় স্বামী ছমির আহমদ ও ছেলে দিলদার আহমদকে। বর্মী সেনারা চলে যাওয়ার পর সহায় সম্বল সব হারিয়ে স্বামীহীন পুত্র বধু ছেনুয়ারা (২৫), লুতু (৫), মিনারা (৩) ও এক বছর বয়সী শাহিনাকে নিয়ে তিনদিন হেঁটে তুমব্র“ সীমান্ত দিয়ে কুতুপালং বস্তিতে এসেছি বৃহস্পতিবার রাতে, পথ দেখিয়ে দিতে সঙ্গে ছিল একজন দালাল। হাতে যা টাকা কড়ি ছিল তাকে দিয়ে দিতে হয়েছে। এখন থাকা, খাওয়ার কোন কুল কিনারা হচ্ছে না। দুধের শিশু শাহিনার গায়ে জ্বর এসেছে। এভাবে তাদের দুঃখ দর্দশার কথা বর্ণনা দিতে গিয়ে অনেকেই নিরবে অশ্র“ বিসর্জন দিতে দেখা গেছে। এসময় একাধিক রোহিঙ্গা নাগরিক জানায়, যাদের হাতে টাকা আছে তারা ঘর ভাড়া নিয়ে থাকছে। আবার অনেকে চট্টগ্রাম, কক্সবাজারসহ বিভিন্ন স্থানে চলে যাচ্ছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক রোহিঙ্গা জানান, কুতুপালং বস্তি ম্যানেজম্যান্ট কমিটি সভাপতির দাপট দেখিয়ে আবু ছিদ্দিক নামের এক রোহিঙ্গা গণহারে চাঁদা আদায় করছে। চাঁদা দিতে না পারলে রোহিঙ্গাদের গাছ তলায় পড়ে থাকতে হচ্ছে। তার সহযোগী নিবন্ধিত রোহিঙ্গা নেতা নামধারী একটি সিন্ডিকেট সাইফুল ইসলাম মোহাম্মদ নুর, ডাক্তার জয়নাল, মৌলভী জানে আলম, মৌলভী জুবাইর ও মৌলভী হামিদ সিন্ডিকেট বাস্তহারা রোহিঙ্গাদের সরবরাহের নামে কোটি কোটি টাকার ত্রাণ সামগ্রী লুটপাট করছে। তাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে সহযোগীতা করছে স্থানীয় এক প্রভাবশালী জনপ্রতিনিধি। উখিয়া উপজেলা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসান ও সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক অধ্যক্ষ হামিদুল হক চৌধুরী জানান, রোহিঙ্গারা সড়ক পথে বিভিন্ন স্থানে চলে যাওয়ার বিষয়টি দেশের জন্য নিরাপদ নয়। তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখা প্রশাসনের দায়িত্ব ও কর্তব্য। উখিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ মোঃ আবুল খায়ের জানান, বস্তি ত্যাগে রোহিঙ্গাদের প্রতিরোধ করতে পুলিশি পাহারা জোরদার করা হয়েছে।