দুই বিচারপতির স্বাক্ষর জাল করে জামিনে মুক্ত ১৮ হাজার ইয়াবা নিয়ে গ্রেফতার সাবরাংয়ের শাকের

hi-court.jpg

টেকনাফ টুডে ডটকম :
স্বর্ণের মামলায় নেয়া হয় স্থগিতাদেশ * কার্যতালিকায় ওঠেনি, শুনানি হয়নি * পিয়ন বই ও রেজিস্টারেও তথ্য নেই * শাহবাগ থানায় দুই মামলা
সুপ্রিমকোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের দুই বিচারপতির স্বাক্ষর জাল করে জামিনে বেরিয়ে গেছে ১৮ হাজার পিস ইয়াবা মামলার এক আসামি। প্রায় সাড়ে ২৯ কেজি স্বর্ণ চোরাচালানের মামলায় নেয়া হয়েছে স্থগিতাদেশ। জাল নথি অনুযায়ী দুটি আদেশই নেয়া হয় গত ২৮ আগস্ট। কিন্তু ওই দিন মামলা দুটি আদালতের কার্যতালিকায় ছিল না। পিয়ন বই বা রেজিস্টারেও মামলা দুটির নম্বর উল্লেখ নেই। ওইদিন আদালতে শুনানিও হয়নি। বিচারপতি একেএম আসাদুজ্জামান ও বিচারপতি জাফর আহমেদ নিজেদের জাল স্বাক্ষর দেখে বিস্মিত হয়েছেন। প্রথমে তারাও বিষয়টি বুঝতে পারেননি। নথিপত্র ঘেঁটে স্বাক্ষর জালের ঘটনার প্রমাণ পাওয়া গেছে। পরে আদেশ দুটি প্রত্যাহার করে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্টের ওই বেঞ্চ।

জানা গেছে, নিখুঁতভাবে এ জালিয়াতি সম্পন্ন হয়েছে। সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট সেকশন থেকে জাল আদেশের কপি দুটি নিন্ম আদালতেও পৌঁছায়। এ অবস্থায় বিষয় দুটি সংশ্লিষ্ট বেঞ্চের নজরে আসে। এরপরই আদেশ দুটি প্রত্যাহারের নির্দেশ দেয়া হয়। স্বর্ণ পাচারের মামলায় জাল আদেশ প্রত্যাহারের নির্দেশে বিচারপতিরা লিখেছেন, ‘বিশাল একটি চক্র বড় ধরনের জালিয়াতির ঘটনা ঘটিয়েছে। যা তদন্তের প্রয়োজন। পাশাপাশি জড়িতদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।’ আদালত সুপ্রিমকোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলকে এ ব্যাপারে ফৌজদারি মামলা দায়েরের নির্দেশ দেন। সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য বাংলাদেশ বার কাউন্সিলেও প্রয়োজনীয় নথি পাঠানোর আদেশ দেন আদালত।

রাষ্ট্রের আইন কর্মকর্তা ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ফরহাদ আহমেদ বলেন, ‘একদিন আদালতের কার্যক্রম শেষে নেমে যাওয়ার সময় বিচারপতিরা আমাকে বলেন- আমাদের স্বাক্ষর জাল করে আদেশ নিয়ে গেছে। ওই আদেশে আমাদের (বিচারপতির) নাম আছে, স্বাক্ষর আছে। আপনাদের নামও আছে। আদেশের কপিতে স্বাক্ষর দেখে মনে হয় আমাদেরই স্বাক্ষর। কিন্তু মামলা দুটি কখনও এ কোর্টের লিস্টেও ছিল না, শুনানিও হয়নি।’

তিনি বলেন, ‘আমি আদালতকে বলেছি, যদি আপনাদের স্বাক্ষরই হয় তাহলে এটা সেকশনে যাওয়ার পথ আপনাদের স্টাফরা। আপনাদের সামনে ফাইল ধরে স্বাক্ষর নিতে পারে। কারণ এত চাপের মধ্যে সব সময় তো বিচারপতিদের ফাইল দেখে স্বাক্ষর করা সম্ভব হয় না। এ ক্ষেত্রে অনেকটা বিশ্বাসের ব্যাপারও থাকে।’ ওই বেঞ্চের রাষ্ট্রপক্ষের এ আইন কর্মকর্তা আরও বলেন, পরে স্টাফরা বিচারপতিদের বুঝিয়েছেন, এটা তাদের স্বাক্ষর না। পরে বিচারপতিরাও জালিয়াতির বিষয়টি বুঝতে পারেন। এর সঙ্গে কারা জড়িত তা তদন্ত ছাড়া

বের করা সম্ভব নয়। ওই স্বাক্ষরগুলো বিশেষজ্ঞদের কাছে পাঠালেই প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে।

হাইকোর্ট বিভাগের অতিরিক্ত রেজিস্ট্রার (বিচার ও প্রশাসন) সাব্বির ফয়েজ যুগান্তরকে বলেন, ‘এ জালিয়াতির ঘটনায় দুটি মামলা হয়েছে ও বিভাগীয় তদন্ত চলছে। তদন্তে তথ্য-প্রমাণ পেলে যারাই জড়িত তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

জানা গেছে, দুটি মামলার যেসব ক্ষেত্রে জালিয়াতি হয়েছে আদালতের প্রত্যাহার আদেশে তা তুলে ধরা হয়েছে। আদালত বলেছেন, নথিপত্র অনুযায়ী মোশন আবেদনের ওপর প্রিজাইডিং জাজ (জ্যেষ্ঠ বিচারপতি) কর্তৃক সিরিয়াল নম্বর প্রদান, আবেদনের ওপর প্রিজাইডিং জাজের ইনিশিয়াল প্রদান, আদেশে দুই বিচারপতির স্বাক্ষর দেয়ার ক্ষেত্রে জালিয়াতি হয়েছে। এ ছাড়া আদালতের মোশন লিস্ট অথবা আদালতের দৈনন্দিন কার্যতালিকায় ওই মামলা দুটি ছিল না। এটা আদালতের সামনে উপস্থাপন হয়নি এবং শুনানিও হয়নি। এ আদেশে ওই স্বর্ণ চোরাচালান মামলায় জালিয়াতির মাধ্যমে নেয়া স্থগিতাদেশ ও জারিকৃত রুলটি প্রত্যাহার করে নেয়া হয়। একইভাবে জালিয়াতির মাধ্যমে ইয়াবা মামলার আসামি মো. সাকেরের নেয়া জামিন ১৭ নভেম্বর প্রত্যাহার করেছেন উপরোক্ত বেঞ্চ। এ ক্ষেত্রেও বড় ধরনের জালিয়াতি হয়েছে উল্লেখ করে রেজিস্ট্রার জেনারেলকে ব্যবস্থা নিতে বলেন আদালত।

সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সম্পাদক ও বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ফিন্যান্স কমিটির চেয়ারম্যান শ ম রেজাউল করিম বলেন, বিচার বিভাগের স্বচ্ছতার প্রশ্নে এ ঘটনায় জড়িতদের খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। যাতে ভবিষ্যতে এ জাতীয় ঘটনা ঘটানোর দুঃসাহস কেউ না দেখায়। আইনজীবীদের জড়িত থাকার বিষয়টি বার কাউন্সিলে পাঠানো হলে সেটাও দেখা হবে বলে জানান তিনি।

জাল আদেশ : প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, মো. সাকেরকে তার বেডরুম থেকে ১৮ হাজার পিস ইয়াবাসহ হাতেনাতে গ্রেফতার করে পুলিশ। এ ঘটনায় ২০১৫ সালের ৩০ মে টেকনাফ থানায় মামলা দায়ের হয়। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের ৯(খ) ও ১৯(১) ধারায় দায়েরকৃত এ মামলাটি বর্তমানে কক্সবাজারের অতিরিক্ত দায়রা জজ আদালতে বিচারাধীন। বিশেষ ট্রাইব্যুনালের মামলা নম্বর ১৮৩৩/২০১৫। আইনজীবীরা জানান, বিপুলসংখ্যক ইয়াবার মামলায় কোনোভাবেই হাইকোর্ট জামিন দেন না। সাধারণত ৫০ থেকে ১০০ পিস ইয়াবার মামলায় জামিন দিয়ে থাকেন। আর এ কারণে চক্রটি জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছে। জালিয়াতি করে নেয়া ওই আদেশে দেখা যায়, গত ২৮ আগস্ট হাইকোর্টের বিচারপতি একেএম আসাদুজ্জামান ও বিচারপতি জাফর আহমেদের বেঞ্চ এ মামলার আসামি মো. সাকেরকে ৬ মাসের জামিন দিয়েছেন। একই সঙ্গে এ মামলায় কেন তাকে জামিন দেয়া হবে না তা জানতে চেয়ে আদালত রুল জারি করেছেন। ওই আদেশে মো. সাকেরের পক্ষে মো. সফিকুল আলম নামে একজন আইনজীবী আবেদনকারী হিসেবে রয়েছেন। আদেশের কপিতে বিবাদী পক্ষে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ফরহাদ আহমেদ ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল কাজী মো. মাহমুদুল করিমের (রতন) নাম উল্লেখ রয়েছে।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী আসামি মো. সাকেরের বাবা আবুল কালাম আজাদ। তার বাড়ি কক্সবাজারের টেকনাফের খয়রাতিপাড়া গ্রামে। কারাগারে আটক থাকাবস্থায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ করে একটি জামিনের আবেদন প্রস্তুত করে গত ২৪ আগস্ট বিকাল ৩টা ৪০ মিনিটে হাইকোর্ট বিভাগে এফিডেভিট করান। যার ফাইল নম্বর ১৪৪৩৭/১৬। ২৪ আগস্ট থেকে ৩১ আগস্টের মধ্যে যে কোনো সময় বিচারপতি একেএম আসাদুজ্জামান ও বিচারপতি জাফর আহমেদের স্বাক্ষর জাল করে একটি জামিন আদেশ প্রস্তুত করে প্রতারণামূলকভাবে হাইকোর্ট বিভাগের ফৌজদারি মিস শাখায় ৩১ আগস্ট পাঠানো হয়। ফৌজদারি মিস ২৯২২৬/১৬ মামলার নথি তৈরি করে ওই জাল জামিনের আদেশ বিচারিক আদালতে পাঠানো হয়। এই ফৌজদারি মামলায় মো. সাকেরের আইনজীবী শফিকুল আলম সুপ্রিমকোর্টের ২ নম্বর হলরুমে বসেন। এই আইনজীবীর আইডি নম্বর ১৫৬৭। এ ছাড়া এ মামলায় তদবিরকারক ছিলেন জহিরুল ইসলাম। সে চট্টগ্রামের কোতোয়ালি থানার রহমতগঞ্জের আবদুস সাত্তার রোডের ২৫৯ নম্বর বাসার আবদুল মজিদের ছেলে বলে ওই জাল আদেশে উল্লেখ রয়েছে।

একইভাবে গত ২৫ জানুয়ারি চট্টগ্রামের কোতোয়ালি থানার রিয়াজুদ্দিন বাজারের দুটি জুতার গুদাম থেকে ২৫০টি সোনার বার (সাড়ে ২৯ কেজি) উদ্ধার হয়। গত ২৬ জানুয়ারি চট্টগ্রাম কোতোয়ালি থানায় ওই গুদামের মালিক আবু আহমেদকে আসামি করে মামলা করা হয়। বিশেষ ক্ষমতা আইনের ২৫(বি) ধারায় দায়েরকৃত এ মামলাটির নম্বর ৫১/১৬। বর্তমানে মামলাটি চট্টগ্রামের মুখ্য মহানগর হাকিমের আদালতে বিচারাধীন। জাল আদেশের তথ্য থেকে জানা যায়, গত ২৮ আগস্ট হাইকোর্টের বেঞ্চ মামলাটির কার্যক্রম ৬ মাসের জন্য স্থগিত করে একটি রুল জারি করেছেন। এতে বাদী হিসেবে রয়েছে আবু আহমেদ নামের ওই আসামি। তার পক্ষে আইনজীবী মো. আবদুল হক। আদেশের কপিতে বিবাদী পক্ষে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ফরহাদ আহমেদ ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল কাজী মো. মাহমুদুল করিমের (রতন) নাম উল্লেখ রয়েছে।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, আসামি আবু আহমেদ চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির জাহানপুর গ্রামের হাজী ফয়েজ আহমেদ সওদাগরের ছেলে। এ মামলাটির কার্যক্রম স্থগিতের জন্য অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের যোগসাজশে একটি ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৬১(এ) ধারায় আবেদন প্রস্তুত করে গত ২৪ আগস্ট বিকাল ৩টা ২০ মিনিটে এফিডেভিট শাখায় ফাইল করা হয়। পরে ২৪ আগস্ট থেকে ৬ সেপ্টেম্বরের মধ্যে যে কোনো সময় বিচারকদ্বয়ের স্বাক্ষর জাল করে একটি জাল স্থগিতাদেশ প্রস্তুত করে প্রতারণামূলকভাবে ৬ সেপ্টেম্বর হাইকোর্টের ফৌজদারি মিস শাখায় পাঠানো হয়। ফৌজদারি মিস ২৯৭৭০/১৬ নম্বর মামলার নথি তৈরি করে ওই জাল স্থগিতাদেশ বিচারিক আদালতে পাঠানো হয়। এ মামলার আইনজীবী আবদুল হকও সুপ্রিমকোর্টের দুই নম্বর হলরুমে বসেন এবং মামলাটির পক্ষে একই ব্যক্তি মো. জহিরুল ইসলাম তদবিরকারক বলে ওই ফৌজদারি মামলায় উল্লেখ রয়েছে। পরে এ ঘটনায় গত ২০ নভেম্বর শাহবাগ থানায় দুটি মামলা করে সুপ্রিমকোর্ট প্রশাসন। পাশাপাশি বিচারপতিদের স্বাক্ষর জাল-আদেশ প্রস্তুতের সঙ্গে আদালতের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী জড়িত কিনা এবং ফৌজদারি মামলা দুটি কীভাবে ফৌজদারি মিস শাখায় গ্রহণ করা হয়েছে সে ব্যাপারে বিস্তারিত তদন্তের জন্য একজন তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ দেয় সুপ্রিমকোর্ট প্রশাসন।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে স্বর্ণের মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা শাহবাগ থানার এসআই মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, তদন্তে অগ্রগতি হয়েছে। অতি শিগগির প্রকৃত ঘটনা জানা যাবে। আগামী ১৫ ডিসেম্বর কোর্টে অবকাশ শুরু হচ্ছে। এর আগেই সব জেনে যাবেন। আর ইয়াবার মামলার তদন্ত করছেন এসআই সুব্রত গোলদার। তিনি বলেন, জামিনে বের হওয়া আসামি মো. সাকের এখনও গ্রেফতার হয়নি।