আতংকিত জনপদে বিপন্ন মানবতা!

saiful-islam.jpg

সাইফুল ইসলাম:: মিয়ানমার নামক রাষ্ট্রটি এশিয়া মহাদেশের বিপন্ন মানবতার আতংকিত ও ভয়ংকর জনপদের নাম। মূলত: এই মিয়ানমারের পশ্চিমাঞ্চলীয় রাখাইন রাজ্যে প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গা মুসলিম সম্প্রদায়ের বাস। তবে যুগযুগ ধরে তাঁরা তাদের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত ও অবহেলিত। বিশেষ করে মুসলমান সম্প্রদায়ের জন্য এক ভয়ংকর জনপদ হলো এই আরাকান রাজ্যটি । যেখানে মানবতা সামরিক জান্তাদের পায়ে পদদলিত । যেখানে তোহাইদের মতো দশ মাসের শিশুকে বাঁচতে গিয়ে কাদামাটিতে নিথর প্রাণে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকতে হয়। যেখানে তোহাইদের মতো আরো শত শত অবুঝ শিশুকে আগুনে পুড়িয়ে ও গলা কেটে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত রোহিঙ্গা মুসলমানদের জন্মই যেন এখানে আজন্ম পাপ। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাদের নাগরিকত্ব নিয়ে কাঠখড় পোহাতে হয়েছে সামরিক সরকারের শাসনামলে। ২০১৫ সালের নভেম্বরের নির্বাচনের মাধ্যমে অং সান সুচির নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসি সরকার গঠন করে। তখন নির্যাতিত মুসলমান জনগোষ্ঠী নাগরিক অধিকার ফিরে পাওয়ার আশায় স্বপ্ন দেখছিল। তাদের সেই অসম্ভব আশা আস্তে আস্তে নিস্ফল হতে লাগল। বহুল আলোচিত নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় থাকা সত্ত্বেও দেশটির মুসলিমরা নির্যাতনের শিকার
হচ্ছে দেশটিতে প্রতিনিয়ত ।
সুচির সরকার এখনো দেশটিতেমুসলিম রোহিঙ্গাদের নির্যাতন রোধে কার্যকরী কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। উল্টো দেশটির সেনাবাহিনীর নির্মমতাকে রীতিমত উৎসাহ প্রদান করে যােচ্ছ সুচি নিজেই এবং তাঁর দল। সম্প্রতি সিঙ্গাপুর সফরকালে সুচি রোহিঙ্গাদের নিয়ে আর্ন্তজাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনকে অতি বাড়াবাড়ি বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। সুচির মতে,দেশের সেনাবাহিনী দেশের সার্বভৌম রক্ষার্থে কাজ চালিয়ে যােচ্ছ। বিভিন্ন সূত্র মতে,৯ অক্টোবরের পরে এই পর্যন্ত তিনশো’র অধিক রোহিঙ্গা মুসলিমকে হত্যা করা হয়েছে। মিয়ানমারে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের হামলায় ৯ পুলিশ সদস্য নিহত হয়। যার জের ধরে দেশটির সেনাবাহিনী,পুলিশ বাহিনী,নৌ- বাহিনী একযোগে নিরীহ রোহিঙ্গাদের উপর নির্যাতন শুরু করে হত্যা করে যােচ্ছ । ওই ঘটনার সূত্র ধরে মিয়ানমার সেনারা মংডু শহর ঘিরে রেখেছে।। মানুষকে পালানোর সুযোগটুকুও দিচ্ছে না। মূলত মংডু শহরটি মিয়ানমারের রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকা। মংডুতে প্রায় শত শত নিরাপরাধ মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করা হচ্ছে। তবে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই সংখ্যা আরো বেশি হবে বলে দাবি করলেও এখনো পর্যন্ত এসব জঘন্যতম হত্যাকান্ডের ব্যাপারে তত বেশী তাঁরা সোচ্চার নয়। সর্বশেষ হামলায় প্রায় ৩০ হাজার গ্রামবাসীর ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে বলেও মানবাধিকার সংস্থাগুলো উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। মিয়ানমারের সরকার এখনও পর্যন্ত সংঘাতপূর্ণ এলাকায় কোন গণমাধ্যম কর্মীকে প্রবেশ করতে দেয়নি। প্রকৃতপক্ষে রাখাইনে রাজ্যে কি হচ্ছে তা এখনো সঠিকভাবে জানা নেই। মিয়ানমার সরকার রাখাইন রাজ্য থেকে রোহিঙ্গা মুসলিম নিধনে নেমেছে।মিয়ানমার সেনাবাহিনী
সশস্ত্র বিদ্রোহ দমনের নামে নির্বিচারে মানুষ হত্যা,নারী ধর্ষণ,শিশু হত্যা,ঘরবাড়ীতে আগুন দেয়া,নাগরিক অধিকার কেড়ে নেওয়ার খেলায় মত্ত। তবে পশ্চিমা বিশ্ব মানবিক দিক বিবেচনা করে বাংলাদেশ সরকারকে সীমান্ত খুলে দেয়ার কথা বলে নিজেদের দায় ও দায়িত্ব এড়ানোর চেষ্টা চালিয়ে যােচ্ছ। তবে কি বাংলাদেশের সীমান্ত খুলে দিলে রোহিঙ্গা সমস্যার স্হায়ী সমাধান হয়ে যাবে? বিভিন্ন ভুক্তভোগী প্রত্যাক্ষদর্শী ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে
বিশেষ করে বেসামরিক পুরুষদের উপর ব্যাপক নির্যাতন করছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। রোহিঙ্গা নির্যাতনের রিরুদ্ধে মালয়শিয়া সরকার ও সেদেশের জনগন এককাতারে। মালয়শিয়ায় প্রতিদিনই রোহিঙ্গা মুসলমানের নির্যাতনের বিরুদ্ধে মিছিল, সমাবেশ ও আন্দোলন হচ্ছে। বাংলাদেশেও বিভিন্ন ইসলামী দলগুলোর পাশাপাশি বিশ্বের অন্যান্য দেশও মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলমানদের হত্যা,ধর্ষণের বিরুদ্ধে মিছিল,মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচী পালন করে যােচ্ছ। তবে কি শুধু এসব আন্দোলন ও বিভিন্ন কর্মসূচীর মাধ্যমে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা গণহত্যা থামানো যাবে? প্রয়োজন জাতিসংঘসহ বিশ্বের ক্ষমতাদ্বর রাষ্ট্রগুলোর জরুরী ভিত্তিতে উদ্যোগ গ্রহন। অান্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার আওতায় এনে মিয়ানমার নামক রাষ্ট্রটিকে কঠোর হস্তে দমন করা এখন সময়ের দাবী।

লেখক- সাইফুল ইসলাম,সাংবাদিক ও উন্নয়ন কর্মী