রাখাইন রাজ্যে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী চায় রোহিঙ্গারা

Teknaf-pic_04.12.jpg

নুরুল করিম রাসেল, টেকনাফ :
রাখাইন রাজ্যে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনী মোতায়েন চায় রোহিঙ্গারা। রাখাইনে রোহিঙ্গাদের উপর মিয়ানমার সেনা ও বিজিবির অব্যাহত হত্যা, ধর্ষন ও নির্যাতনের প্রেক্ষিতে দেশ ছেড়ে আসা শিক্ষিত ও সচেতন রোহিঙ্গাদের সাথে কথা বললে তারা জানায়, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনী মোতায়েন ছাড়া রোহিঙ্গাদের পক্ষে সেদেশে বসবাস করা অসম্ভব। এছাড়া নিজের ভিটেবাড়ী ছেড়ে আসা রোহিঙ্গারা পূনরায় স্বদেশে ফিরতে চায়। দেশ ছেড়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের মাঝে অনেকে রয়েছেন বিত্তশালী ও স্বচ্ছল। তারা এদেশে বাধ্য হয়ে পালিয়ে এসে উদ্বাস্তু জীবন যাপন করলেও পুনরায় রাখাইনে ফিরতে চান।
teknaf-pic2_4-12
তাদেরই একজন রাখাইন রাজ্যের মংডু কেয়ারী প্রাং এলাকার বাসিন্দা মৃত ইউছুপ আলীর ছেলে নুর বশর প্রকাশ হাসু মিয়া (৫৮)। হাসু মিয়া ৪ বছর কেয়ারী প্রাং গ্রামের হুক্কাডা (গ্রাম চেয়ারম্যান) ছিলেন। গ্রামে রয়েছে তার ৩০ বিঘার উপর চাষাবাদের জমি। স্ত্রী ও ৩ ছেলে ৭ মেয়ে।
গত অক্টোবরে বিজিবি ক্যাম্পে হামলার পর মিয়ানমার সেনাবাহিনী তার বাড়ি ঘর জ্বালিয়ে দিয়ে বাড়ির গরু-মহিষ নিয়ে যায়। এরপর নির্যাতনের ভয়ে তিনি পরিবারের সবাইকে নিয়ে চলে আসেন বাংলাদেশে। আশ্রয় নেন টেকনাফের লেদা আনরেজিস্টার্ড রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বি ব্লকে এক দুর সম্পর্কের এক আত্মীয় কলিম উল্লাহর ঘরে। তার ছেলেরা সেখানে ব্যবসা করতো।
রবিবার তার সাথে কথা হয় লেদা ক্যাম্পে।
এসময় তিনি সেখানে মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও বর্ডার পুলিশের নির্যাতনের বর্ণনা দেন। তিনি জানান, হুক্কাডা (গ্রাম চেয়ারম্যান) হিসাবে দায়িত্ব পালন করার কারণে অতীতে মিয়ানমার সরকারী বাহিনীর সাথে তার সুসম্পর্ক ছিল। কখনও নির্যাতনের শিকার হননি। কিন্তু মিয়ানমার বাহিনীর এবারের অভিযান ছিল সম্পূর্ন ব্যক্তিক্রমধর্মী। গ্রামের বাড়িঘরে নির্বিচারে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। তার হিসাব মতে কেয়ারীপ্রাং গ্রামে ২২শ মতো বাড়ি ছিল। সেনাবাহিনী গ্রামের অন্তত দুই হাজার বাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে। এই গ্রামের প্রায় ১০ হাজারের মতো মানুষ আশ্রয়হীন হয়েছে বলে জানান তিনি।
রাখাইনে কিভাবে শান্তি প্রতিষ্ঠা হতে পারে প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান, রাখাইন রাজ্যে জাতিসংঘ শান্তি রক্ষী বাহিনী নিয়োগ করা হলে রোহিঙ্গারা শান্তিতে বসবাস করতে পারবে বলে মনে করেন তিনি। এ জন্য তিনি বিশ্ব সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষন করেছেন।
কথা হয় একি গ্রামের অপর এক পল্লী চিকিৎসক ফজল আহমদের সাথে। ফজল আহমদ গ্রামে পল্লী চিকিৎসা করে ভালই থাকতেন। সমাজে বেশ সুনাম ছিল। গ্রামের মানুষ তাকে সহীহ করে চলতো। আর্থিক অবস্থা ছিল স্বচ্ছল।
কিন্তু ১৩ অক্টোবর তাদের গ্রামে চলে অভিযান। সেনাবাহিনীর ভাষায় বাগী অর্থাৎ বিদ্রোহী খুঁজার নামে চলে বাড়িতে বাড়িতে অগ্নিসংযোগ, লুটপাত, ধর্ষন ও হত্যা।
অভিযানে কেয়ারীপ্রাং গ্রামের দুই শতাধিক মানুষকে হত্যা করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
সেই গ্রামের অন্যদের সাথে পালানো সময় হেলিকপ্টার থেকে রকেট লাঞ্চার নিক্ষেপে তিনি নিজেও আহত হয়েছেন।
রকেট লাঞ্চারের স্লিপার এসে লাগে তার পায়ে। এখন ও চিকিৎসা করাচ্ছেন তিনি। বুধবার তিনি স্বপরিবারে বাংলাদেশে পালিয়ে আসেন তিনি।
টেকনাফের লেদা রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আলাপকালে তিনি জানান, এখানে খুব কষ্ট করে দিন কাটছে। একটা ঘরে স্বপরিবারে গাধাগাধি করে বসবাস করছেন। তিনি বাংলাদেশে থাকতে চান না। রাখাইন রাজ্যে নিজ বসত ভিটায় ফিরতে চান।
কিন্তু এ অবস্থায় ফিরলে নিশ্চিত মৃত্যু বলে স্বীকার করেন তিনি। তারও অভিমত রাখাইনে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনী মোতায়েন করলে রোহিঙ্গারা নিজ ভূমিতে ফিরে যাবে। এছাড়া মিয়ানমার যদি রোহিঙ্গাদের সেদেশের নাগরিক হিসাবে স্বীকৃতি দেয় তাহলে এ সমস্যা সমাধান হতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
এছাড়া গৌজিবিল এলাকার মাষ্টার রশিদ, আইয়ুব, কুয়ারবিলের শামসুসহ অনেকের সাথে কথা বলে জানা গেছে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা স্বদেশে ফিরতে চায়। নিজ মাতৃভূমিতে শান্তিতে বসবাস করতে গেলে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষি ছাড়া এ মুহুর্তে তারা আর কোন পথ দেখছেন না।

টেকনাফের দুই ক্যাম্পে ১০ হাজারের উপরে রোহিঙ্গা
টেকনাফের লেদা আনরেজিস্টার্ড ও নয়াপাড়া রেজিস্ট্রার্ড শরণার্থী ক্যাম্পে দশ হাজারের বেশী রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে বলে বিশ্বস্থ্য সূত্রে জানা গেছে।
লেদা আনরেজিস্ট্রার্ড ক্যাম্পে আশ্রয় নেওয়া ৪ হাজারের বেশী রোহিঙ্গাকে শনাক্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ক্যাম্পের রোহিঙ্গাদের চেয়ারম্যান দুদু মিয়া। তবে ক্যাম্প ও আশেপাশে আরও কয়েক হাজার হিসাবের মধ্যে নেই বলে জানান তিনি।
এছাড়া নয়াপাড়া শরণার্থী ক্যাম্পে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের এখনও পর্যন্ত শনাক্তের কোন উদ্যোগ গ্রহন করেনি ক্যাম্প কর্তৃপক্ষ। তবে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে এ ক্যাম্পে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গার সংখ্যা ৫ হাজারের কম হবে না।

কফি আনানের সফরের পর নির্যাতন আরো বেড়েছে : টেকনাফে পালিয়ে আসা একাধিক রোহিঙ্গার সাথে কথা বলে জানা গেছে, কফি আনানের সফরের পর নির্যাতনের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে মিয়ানমার সেনারা।
সেনারা রাখাইন রাজ্যের জাম্বনিয়া, কেয়ারীপ্রাং, গৌজিবিলসহ কয়েকটি গ্রাম থেকে ৫ শতাধিক লোককে আটক করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে গেছে বলে মুঠোফোনের মাধ্যমে তারা জানতে পেরেছেন।

অনুপ্রবেশ কমেছে : সীমান্ত দিয়ে অনুপ্রবেশের সময় গত কয়েক সপ্তাহ ধরে নিয়মিত রোহিঙ্গা বোঝাই নৌকা ফেরত দিয়ে আসছিল বিজিবি। কিন্তু শনিবার রাত থেকে রবিবার সকাল পর্যন্ত কোন নৌকা অনুপ্রবেশের চেষ্টা করেনি বলে জানান টেকনাফস্থ ২ বিজিবি ব্যাটেলিয়ন অধিনায়ক লে. কর্ণেল আবুজার আল জাহিদ।
তিনি জানান, রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশের চেষ্টা কমেছে।

বিজিবি পোস্টে সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধি : এছাড়া মিয়ানমারের কুয়ার বিল, শীলখালী এলাকায় একাধিক ব্যক্তির সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করে জানা গেছে, বিজিপি তাদের সীমান্ত পোষ্ট গুলোতে সদস্য সংখ্যা বাড়িয়েছে। কুয়ার বিল থেকে শুক্কুর মুঠোফোনে জানান, আগে যেখানে বিজিবি পোষ্ট গুলোতে ৬ জন করে নিয়োজিত ছিল সেখানে এখন ১৫ জন বিজিবি সদস্য নিয়োজিত করা হয়েছে। একারনে সীমান্ত পাড়ি দিতে অনেক রোহিঙ্গা ওই এলাকা থেকে বাংলাদেশে আসতে না পেরে পুনরায় তাদের গ্রামে ফিরে যাচ্ছে।