রাত এলেই কুতুপালং বস্তিতে স্বজনহারা রোহিঙ্গাদের কান্না

8888.jpg

আরো ১৫ পরিবারের অনুপ্রবেশ : ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ
মুহাম্মদ হানিফ আজাদ, উখিয়া ॥
মিয়ানমার সেনা ও পুলিশের আগুন অভিযান একটু কমলেও থামেনি পৈচাশিকতা। তাদের বর্বরতা শিকার আরো ১৫ পরিবারের শতাধিক নারী শিশু গতকাল রবিবার ভোর রাতে অনুপ্রবেশ করে কুতুপালং বস্তিতে আশ্রয় নিয়েছে। বস্তিবাসীর দাবী এখানে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের অধিকাংশ মা-বাবা, ভাই বোন ও স্বামী- সন্তান হারা। রাত নামলেই এসব স্বজনহারাদের কান্নায় বস্তির পরিবেশ ভারী হয়ে উঠে।
মিয়ানমারের মংডু সিকদার পাড়া থেকে পালিয়ে এসে কুতুপালং বস্তির এ ব্লকের বাসিন্দা মোহাম্মদ আলমের ঝুঁপড়ি আশ্রিত স্বামী-সন্তান হারা বয়োবৃদ্ধ জুহুরা খাতুন (৬০) জানান, মগ সেনারা তাঁর ছেলে আবু তৈয়ব (২২) কে নিমর্ম নির্যাতন পরে গুলি করে হত্যা করেছে। চোখের সামনে তার মেয়ে রওশন বানু (৩০) ও বেগম বাহার (২৬) কে গণধর্ষণ শেষে নির্মম ভাবে হত্যা করে। যাওয়ার সময় তারা বসতবাড়ীটি আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়। এ নিমর্ম পৈচাশিকতার বর্ণনা দিয়ে জুহুরা খাতুন বার বার কেঁেদ উঠছিল। সে জানায়, দিনের বেলায় কোন রকম সময় কাটালেও রাতে সে ভয়াবহ দৃশ্য চোখে ভেসে উঠে। যে কারণে কান্না থামাতে পারি না।
মংডু পোয়াখালী ছালিপাড়া থেকে আসা ইলিয়াছ (৩৫) জানায়, সেখানকার সেনাবাহিনী ও পুলিশ তার পিতা আব্দুস শুক্কুর কে জবাই করে হত্যা করেছে। এসময় তার স্ত্রী রহিমা (২৫) কে লক্ষ্য করে গুলি করলে ভাগ্যক্রমে সে বেচেঁ যায়। গুলিবিদ্ধ স্ত্রীকে নিয়ে অনেক কষ্টে এপারে চলে এসেছি। সে আরো জানায়, তার পাশের বাড়ীতে থাকা বোন, তার স্বামী ও ছেলে মেয়েসহ ৫জনকে সেনাবাহিনী ও পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে। তারা বেঁেচ আছে কিনা জানি না।
শফিউল আলম (৩৫), স্ত্রী নুর বেগম(২৮) ও ৪ ছেলে মেয়েকে নিয়ে এসেছেন মংডুর পোয়াখালী গ্রাম থেকে। সে জানায়, সেনা সদস্যরা আসতে দেখে সে পার্শ্ববর্তী জঙ্গলে লুকিয়ে পড়ে। তারা চলে যাওয়ার পর বাড়ী এসে দেখি বড় ভাই নুর মোহাম্মদের লাশ মাটিতে পড়ে আছে। পাশের বাড়ীর আলী হোছন (৬০), আবুল বশর (২৮), লালু (৪০)সহ সেনাবাহিনী ধরে নিয়ে গেছে। পরে শুনেছি তাদেরকে নির্মম নির্যাতন করে জবাই করে হত্যা করা হয়েছে।
কুতুপালং বস্তি ম্যানেজম্যান্ট কমিটির সভাপতি আবু ছিদ্দিকসহ একাধিক বস্তিবাসী জানান, রাত নামলে বস্তিতে আশ্রয় নেয়া স্বজনহারা রোহিঙ্গাদের কান্নায় অন্যান্য বস্তিবাসীরা ঘুমাতে পারে না। তিনি বলেন, বস্তিতে যেসব রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে তারা কেউ না কেউ আত্মীয় পরিজনকে হারিয়েছে। সহায় সম্বলহীন এসব রোহিঙ্গারা একদিকে যেমন স্বজন হারানোর ব্যাথা ভুলতে পারছে না, অন্যদিকে আশ্রয়হীন অবস্থায় অনাহারে অর্ধাহারে দিন কাটাতে হচ্ছে। যে কারণে রাত নামলেই নারী শিশুর কান্নায় বস্তি এলাকায় এক হৃদয় বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়।
সরেজমিন কুতুপালং বস্তি ঘুরে জানা যায়, গতকাল রোববার আরো ১৫ পরিবারের শতাধিক রোহিঙ্গা নারী-শিশু অনুপ্রবেশ করে বস্তিতে আশ্রয় নিয়েছে। এদের মধ্যে একজন মংডুর খেয়ারীপ্রাং থেকে আসা ৯ সদস্যের পরিবারের নুরুল আমিন (৪৫) জানায়, তারা কুমিরখালী থেকে লম্বাবিল হয়ে দেড় লক্ষ (কিয়াত) দালালকে দিয়ে বস্তিতে এসেছে। তাদের সাথে ছিল খেয়ারীপ্রাং গ্রামের আরো ১৫ পরিবারের শতাধিক নারী-পুরুষ-শিশু।
উখিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ মোঃ আবুল খায়ের জানান, অনুপ্রবেশের সত্যতা স্বীকার করে বলেন, দালালের মাধ্যমে এসব রোহিঙ্গারা অনুপ্রবেশ করতে সক্ষম হচ্ছে।
কুতুপালং বস্তিতে ঢালাও ত্রাণ সামগ্রী বিতরণঃ
স্থানীয় প্রশাসনের বিধি নিষেধ উপেক্ষা করে কুতুপালং বস্তি এলাকায় আশ্রিত রোহিঙ্গাদের ঢালাও ভাবে ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এনজিও সংস্থা আইওএম আশ্রিত ৩শ পরিবারের মধ্যে খাবার তৈরি সরঞ্জামাদি সরবরাহের কথা স্বীকার করলেও বিভিন্ন এনজিও সংস্থা বস্তি সংলগ্ন পাহাড় জঙ্গলে ত্রাণ বিতরণ করছে। সচেতন মহল মনে করছেন ঢালাও ভাবে ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করা হলে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ আরো বৃদ্ধি পেতে পারে। তাই ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়েছে।
গতকাল রোববার বেলা ১১ টার দিকে বস্তি এলাকা ঘুরে দেখা যায়, বস্তি সংলগ্ন জঙ্গলার্কীণ পাহাড়ে কে বা কারা ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করছে। জানতে চাওয়া হলে, ইনানী রয়েল রির্সোট লিঃ এর লোকজন দাবী করে তারা ব্যক্তি উদ্যোগে আশ্রিতা রোহিঙ্গাদের ত্রাণ সামগ্রী বিতরণের সত্যতা স্বীকার করেন। এর আগের রাতে বস্তির পাহাড়ে বিপুল পরিমাণ শীত বস্ত্র বিতরণ করা হয়েছে বলে নিবন্ধিত নেতা ফয়সাল আনোয়ার জানিয়েছেন। এনজিও সংস্থা আইওএম’র প্রোগ্রাম ম্যানেজার সৈকত বিশ্বাস জানান, তারা সদ্য আশ্রিত ৩শ পরিবারকে খাবার তৈরির সরঞ্জামাদি সরবরাহ করেছে।
উখিয়া রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক অধ্যক্ষ হামিদুল হক চৌধুরী জানান, অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের বিজিবি সদস্যরা আটক করে মিয়ানমারে ফেরত পাঠাচ্ছে। অনুপ্রবেশ প্রতিরোধে তারা সীমান্তে রাতদিন পরিশ্রম করছে। এমতাবস্থায় আশ্রিত রোহিঙ্গাদের ঢালাও ভাবে ত্রাণ বিতরণ করা হলে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশে উৎসাহিত করার শামিল বলে তিনি দাবী করেন।